শিশু বড় করে তোলা সহজ কাজ নয়। সন্তানকে সঠিকভাবে বেড়ে উঠতে সাহায্য করতে গিয়ে প্রায়ই এমন কিছু আচরণের মুখোমুখি হন বাবা-মা, যা তাদের দুশ্চিন্তা ও বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তবে শিশু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রেই এসব আচরণ অস্বাভাবিক নয়; বরং শিশুর স্বাভাবিক মানসিক ও শারীরিক বিকাশেরই একটি অংশ। তাই আতঙ্কিত না হয়ে ধৈর্য ধরে শিশুর আচরণ বোঝার চেষ্টা করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
শিশুদের বেড়ে ওঠার প্রতিটি ধাপেই নতুন নতুন আচরণ দেখা যায়। তারা নিজেদের মতো করে পৃথিবীকে জানতে, বুঝতে এবং নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করে। এই শেখার প্রক্রিয়ায় অনেক আচরণ বড়দের কাছে বিরক্তিকর মনে হলেও সেগুলো শিশুদের বিকাশের স্বাভাবিক লক্ষণ।
কেন সবকিছুতেই ‘না’ বলে শিশু?
অনেক শিশুই দুই থেকে তিন বছর বয়সে প্রায় সবকিছুতেই ‘না’ বলতে শুরু করে। এতে অনেক বাবা-মা মনে করেন সন্তান হয়তো অবাধ্য হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শিশুর স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ইচ্ছার প্রকাশ।
এই সময় শিশুরা নিজের পছন্দ-অপছন্দ জানাতে শেখে। তাই সব বিষয়ে আপত্তি জানানো বা ‘না’ বলা তাদের আত্মপরিচয় গড়ে ওঠার একটি স্বাভাবিক ধাপ।
খাবার নিয়ে বায়না কেন?
খাবারের সময় অনেক শিশু খাবার খেতে চায় না, খাবার ছুড়ে ফেলে দেয় বা দীর্ঘ সময় ধরে খাওয়ার চেষ্টা করে। এতে বাবা-মা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন পরিবেশ, নতুন স্বাদ কিংবা চারপাশের জিনিস সম্পর্কে কৌতূহল শিশুদের মনোযোগ খাবার থেকে সরিয়ে দেয়। তাই জোর না করে খাবারের ধরন, পরিবেশন বা সময় পরিবর্তন করলে অনেক সময় ইতিবাচক ফল পাওয়া যায়।
অল্পতেই কান্না করার কারণ
শিশুরা চাওয়া অনুযায়ী কিছু না পেলেই কান্না শুরু করে। অনেক সময় সেই কান্না থামানোও কঠিন হয়ে পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, ছোট শিশুরা এখনও নিজেদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে শেখেনি। তাই হতাশা, রাগ বা কষ্ট প্রকাশের সবচেয়ে সহজ মাধ্যম হয়ে ওঠে কান্না। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা ধীরে ধীরে আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে।
একই কাজ বারবার করতে চায় কেন?
একই গল্প শুনতে চাওয়া, একই খেলনা নিয়ে খেলা বা একই রুটিন অনুসরণ করার প্রবণতা শিশুদের মধ্যে খুবই সাধারণ।
শিশু বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিচিত রুটিন শিশুদের নিরাপত্তাবোধ তৈরি করে। একই কাজ বারবার করার মাধ্যমে তারা আত্মবিশ্বাসও অর্জন করে এবং নতুন দক্ষতা অনুশীলনের সুযোগ পায়।
খেলনা বা জিনিস ভাগ করে দিতে না চাওয়া
অনেক শিশু অন্য কারও সঙ্গে নিজের খেলনা বা প্রিয় জিনিস ভাগ করে নিতে চায় না। এ কারণে অনেক বাবা-মা বিব্রত হন।
বিশেষজ্ঞরা জানান, তিন থেকে চার বছর বয়স পর্যন্ত এই আচরণ অনেকটাই স্বাভাবিক। ধৈর্য ধরে বারবার বোঝানো, নিজের আচরণ দিয়ে উদাহরণ তৈরি করা এবং ধীরে ধীরে ভাগাভাগির অভ্যাস গড়ে তুললে শিশুরা বিষয়টি শিখে যায়।
বাবা-মায়ের জন্য করণীয়
শিশুর স্বাভাবিক বিকাশে সহায়ক হতে বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেন—
- শিশুর আচরণে অযথা আতঙ্কিত না হয়ে ধৈর্য ধরুন।
- চিৎকার বা শাস্তির বদলে শান্তভাবে বুঝিয়ে বলুন।
- শিশুর বয়স অনুযায়ী স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দিন।
- খাবারে বৈচিত্র্য আনুন এবং জোর করে খাওয়ানো এড়িয়ে চলুন।
- ভালো আচরণের প্রশংসা করুন এবং ইতিবাচক উৎসাহ দিন।
- নিয়মিত রুটিন বজায় রাখুন, যাতে শিশু নিরাপদ অনুভব করে।
- ভাগাভাগি করার অভ্যাস ধীরে ধীরে শেখান, চাপ সৃষ্টি করবেন না।
শিশুর প্রতিটি আচরণের পেছনেই কোনো না কোনো শেখার প্রক্রিয়া কাজ করে। তাই বাবা-মায়ের ধৈর্য, ভালোবাসা এবং সঠিক দিকনির্দেশনাই শিশুর সুস্থ মানসিক বিকাশের সবচেয়ে বড় ভিত্তি। বিশেষজ্ঞদের মতে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এসব আচরণ সময়ের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে পরিবর্তিত হয়ে যায়। তবে আচরণ যদি বয়সের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে দীর্ঘস্থায়ী হয় বা শিশুর দৈনন্দিন জীবনকে ব্যাহত করে, তাহলে শিশু বিশেষজ্ঞ বা শিশুমনোবিজ্ঞানীর পরামর্শ নেওয়া উচিত।



























