জেব্রা ফিঞ্চ ভাষা নিয়ে বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের গবেষণায় এসেছে এক গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সহায়তায় ছোট্ট এই গানের পাখির যোগাযোগব্যবস্থা বিশ্লেষণ করে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের গবেষক ড. জুলি এলি। তাঁর গবেষণা শুধু প্রাণীদের ভাষা বোঝার ক্ষেত্রেই নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেনি, বরং ভবিষ্যতে মানুষ ও প্রাণীর মধ্যে অর্থবহ যোগাযোগ গড়ে তোলার পথও কিছুটা উন্মুক্ত করেছে।
প্রায় ১৫ বছরের গবেষণায় ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলির গবেষক ড. জুলি এলি হাজার হাজার জেব্রা ফিঞ্চের ডাক সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করেন। মেশিন লার্নিং প্রযুক্তির সাহায্যে তিনি পাখিগুলোর ১১টি মৌলিক ডাক শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন। গবেষণায় দেখা যায়, প্রতিটি ডাকের আলাদা উদ্দেশ্য রয়েছে। কোনো ডাক নিজের পরিচয় প্রকাশ করে, কোনোটি চলমান কাজের তথ্য জানায়, আবার কিছু ডাক অন্য পাখিকে চিনতে সাহায্য করে।
সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো, প্রতিটি জেব্রা ফিঞ্চের নিজস্ব স্বরচিহ্ন রয়েছে। মানুষের কণ্ঠস্বর যেমন একজনকে অন্যজনের থেকে আলাদা করে, তেমনি এই পাখিরাও স্বরের মাধ্যমে নিজেদের পরিচয় বহন করে। ফলে একই ধরনের বার্তা দিলেও কোন পাখি ডাকছে, সেটি শনাক্ত করা সম্ভব হয়। বিজ্ঞানীদের মতে, এটি প্রাণীদের যোগাযোগব্যবস্থার জটিলতা সম্পর্কে নতুন ধারণা দিচ্ছে।
এই যুগান্তকারী গবেষণার স্বীকৃতি হিসেবে ড. জুলি এলি পেয়েছেন ২০২৬ সালের কোলার-ডুলিটল পুরস্কার ফর টু-ওয়ে ইন্টারস্পিসিজ কমিউনিকেশন। এ পুরস্কারের অর্থমূল্য এক লাখ মার্কিন ডলার। পুরস্কার গ্রহণের পর তিনি বলেন, এই স্বীকৃতি তাঁর গবেষণাকে আরও এগিয়ে নিতে অনুপ্রেরণা দেবে। ভবিষ্যতে মানুষ ও প্রাণীর মধ্যে আরও কার্যকর যোগাযোগ স্থাপনে এই গবেষণা সহায়ক হবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
২০২৪ সালে চালু হওয়া এই আন্তর্জাতিক পুরস্কারের লক্ষ্য হলো প্রাণীদের ভাষা ও যোগাযোগব্যবস্থা নিয়ে গবেষণাকে উৎসাহ দেওয়া। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে মানুষ ও প্রাণীর মধ্যে কার্যকর দ্বিমুখী যোগাযোগ স্থাপন করতে সক্ষম গবেষকদের জন্য ঘোষণা করা হয়েছে এক কোটি মার্কিন ডলারের বিশেষ পুরস্কার। ফলে এ খাতে বিশ্বজুড়ে গবেষণার আগ্রহও দ্রুত বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন প্রাণীদের শব্দ ও আচরণ বিশ্লেষণে নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। আগে যে কাজ করতে গবেষকদের বছরের পর বছর সময় লাগত, এখন উন্নত অ্যালগরিদম কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনের মধ্যেই বিপুল পরিমাণ শব্দ বিশ্লেষণ করে মিল ও ধারা শনাক্ত করতে পারছে। এ কারণে প্রাণীদের যোগাযোগ নিয়ে গবেষণা আরও দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে।
লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের অধ্যাপক জনাথন বার্চ এই গবেষণাকে অসাধারণ বৈজ্ঞানিক অর্জন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বিচারক প্যানেলের প্রধান ইয়োসি ইয়োভেলও মনে করেন, এটি এ ক্ষেত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। তবে তাঁদের মতে, মানুষ ও প্রাণীর মধ্যে স্বাভাবিক কথোপকথন গড়ে তুলতে এখনো অনেক গবেষণা প্রয়োজন।
অন্যদিকে পুরস্কারের প্রতিষ্ঠাতা জেরেমি কোলার আশাবাদী যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত উন্নতির ফলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই প্রাণীদের যোগাযোগের আরও অনেক অজানা রহস্য উন্মোচিত হবে। যদিও গবেষকেরা সতর্ক করে বলছেন, মানুষ এখনো সরাসরি পাখি বা অন্য প্রাণীর সঙ্গে কথোপকথন করার প্রযুক্তি থেকে অনেক দূরে রয়েছে।
তবে একটি বিষয় এখন স্পষ্ট—জেব্রা ফিঞ্চ ভাষা নিয়ে এই গবেষণা দেখিয়ে দিয়েছে, প্রাণীদের যোগাযোগ মানুষের ধারণার তুলনায় অনেক বেশি জটিল, সুসংগঠিত এবং অর্থবহ। বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের গবেষণা শুধু প্রাণীজগত নয়, ভাষাবিজ্ঞান ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণাকেও নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।



























