কোলেস্টেরল বাড়ছে কি না, তা সবসময় শরীর আগে থেকে জানান দেয় না। তাই অনেকেই স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে করতেই রক্তে LDL বা ‘খারাপ’ কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়িয়ে ফেলেন। মাত্রা বেশি হলে ধমনিতে প্লাক জমার ঝুঁকি বাড়তে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। বয়স ও বংশগত কারণ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, তবে প্রতিদিনের খাবার ও জীবনযাপনের কিছু অভ্যাসও এখানে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে নিয়মিত অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়া, দীর্ঘ সময় বসে থাকা এবং ধূমপানের মতো অভ্যাসকে অবহেলা করা ঠিক নয়। তাই কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে প্রথম পদক্ষেপ হতে পারে নিজের দৈনন্দিন রুটিনের দিকে একটু নজর দেওয়া।
সকালের নাস্তায় পরোটা, ভাজাপোড়া, মাখন, চর্বিযুক্ত মাংস, সসেজ বা অতিরিক্ত পনির নিয়মিত রাখলে শরীরে স্যাচুরেটেড ফ্যাটের পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে। অতিরিক্ত স্যাচুরেটেড ফ্যাট LDL কোলেস্টেরল বাড়াতে পারে বলে জানিয়েছে আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন। আবার বাদাম, বীজ বা স্বাস্থ্যকর তেল উপকারী হলেও সেগুলোও প্রয়োজনের তুলনায় বেশি খাওয়া ঠিক নয়। আসল বিষয় হলো পুরো খাদ্যাভ্যাস। ২০২৬ সালের AHA নির্দেশনায় শাকসবজি, ফল, হোলগ্রেইন, ডাল, বাদাম ও স্বাস্থ্যকর প্রোটিনের উৎসকে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি স্যাচুরেটেড ফ্যাট, অতিরিক্ত চিনি ও অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার কমানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো দিনের বেশিরভাগ সময় বসে থাকা। অফিসের ডেস্ক, গাড়ি, পড়াশোনা কিংবা ঘরে সোফায় দীর্ঘ সময় বসে থাকার ফলে শরীর প্রয়োজনীয় মাত্রায় নড়াচড়া থেকে বঞ্চিত হয়। শুধু সপ্তাহে কয়েকদিন ব্যায়াম করলেই যে সারাদিনের নিষ্ক্রিয়তা পুরোপুরি পুষিয়ে যাবে, এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়। দ্রুত হাঁটা, সাইকেল চালানো, সাঁতার কিংবা সিঁড়ি ব্যবহার—ছোট ছোট পরিবর্তনও দৈনন্দিন শারীরিক কার্যকলাপ বাড়াতে পারে। CDC-এর নির্দেশনা অনুযায়ী প্রাপ্তবয়স্কদের সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কার্যকলাপ এবং সপ্তাহে অন্তত দুই দিন পেশি শক্তিশালী করার ব্যায়াম করার লক্ষ্য রাখা উচিত।
কোলেস্টেরলের ঝুঁকি বাড়াতে পারে এমন আরেকটি অভ্যাস হলো নিয়মিত চিনিযুক্ত পানীয় পান করা। কোমল পানীয়, অতিরিক্ত চিনি দেওয়া চা-কফি, মিষ্টি পানীয় বা কিছু প্যাকেটজাত পানীয় শরীরে বাড়তি চিনি ও ক্যালোরি যোগ করতে পারে। চিনি সরাসরি কোলেস্টেরল নয়, তবে অতিরিক্ত চিনি ও নিম্নমানের খাদ্যাভ্যাস ওজন বৃদ্ধি এবং হৃদযন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর খাদ্যপ্যাটার্নের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। তাই তৃষ্ণা মেটাতে পানি, চিনি ছাড়া পানীয় বা কম মিষ্টিযুক্ত বিকল্প বেছে নেওয়া ভালো। একই সঙ্গে বিস্কুট, কেক, পেস্ট্রি, চিপস ও অন্যান্য অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়ার অভ্যাসও কমানো দরকার। AHA-র ২০২৬ সালের খাদ্য নির্দেশনাতেও added sugar ও ultraprocessed food কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ধূমপানও হৃদযন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর একটি অভ্যাস। ধূমপান রক্তনালীর ক্ষতি করতে পারে এবং হৃদরোগের সামগ্রিক ঝুঁকি বাড়ায়। তাই কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণের কথা ভাবলে শুধু খাবারের দিকে তাকালেই হবে না; ধূমপান ও তামাকের অভ্যাস থাকলে সেটিও পরিবর্তনের চেষ্টা করতে হবে। পাশাপাশি অতিরিক্ত ওজন থাকলে ধীরে ধীরে স্বাস্থ্যকর ওজনের দিকে আসা, পর্যাপ্ত শারীরিক কার্যকলাপ করা এবং সুষম খাবার খাওয়ার অভ্যাস তৈরি করা জরুরি। স্বাস্থ্যকর চর্বির উৎসকে স্যাচুরেটেড ফ্যাটের বিকল্প হিসেবে বেছে নেওয়াও উপকারী হতে পারে।
সবশেষে মনে রাখা দরকার, কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ মানে কোনো একটি খাবার বাদ দেওয়া নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন গড়ে তোলা। প্রতিদিনের প্লেটে বেশি শাকসবজি, ফল, ডাল, হোলগ্রেইন ও স্বাস্থ্যকর প্রোটিন রাখার পাশাপাশি অতিরিক্ত চর্বি, চিনি ও অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার কমানো যেতে পারে। নিয়মিত হাঁটা, দীর্ঘ সময় বসে থাকার মাঝে বিরতি নেওয়া এবং ধূমপান এড়িয়ে চলাও গুরুত্বপূর্ণ। তবে নিজের কোলেস্টেরলের মাত্রা না জেনে শুধু উপসর্গ দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে লিপিড প্রোফাইল পরীক্ষা করানো এবং রিপোর্ট অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়াই নিরাপদ।




























