গ্যাস সংকট এখন রাজধানীর উত্তরাঞ্চলের সিএনজি চালকদের জন্য প্রতিদিনের বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভোর হওয়ার আগেই গাড়ি নিয়ে পাম্পে পৌঁছালেও অনেক চালককে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। উত্তরা, আব্দুল্লাহপুর, বিমানবন্দর, খিলক্ষেত ও আশপাশের এলাকায় পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ছে। সোমবার (১৭ আগস্ট) এসব এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, পাম্পের সামনে দীর্ঘ সারি থাকায় চালকদের স্বাভাবিক কর্মদিবস শুরু হচ্ছে অপেক্ষা দিয়ে। ফলে যাত্রী পরিবহনে সময় কমে যাচ্ছে, আর একই সঙ্গে কমছে দৈনিক আয়ও।
গ্যাসের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে চালকদের আয়ে। একজন চালককে প্রতিদিন গাড়ির মালিককে নির্দিষ্ট পরিমাণ জমা দিতে হয়। এর সঙ্গে রয়েছে জ্বালানি, খাবার ও অন্যান্য দৈনিক খরচ। কিন্তু দিনের একটি বড় সময় যদি পাম্পের লাইনে কেটে যায়, তাহলে যাত্রী পরিবহনের সুযোগ কমে যায়। অনেক চালকের অভিযোগ, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে গাড়ি নিয়ে বের হয়েও কাঙ্ক্ষিত আয় করা সম্ভব হচ্ছে না। সংসারের খরচ, বাসাভাড়া এবং গাড়ির জমা—সবকিছু সামলাতে গিয়ে তারা বাড়তি চাপের মধ্যে পড়েছেন।
সিএনজি চালক মনা জানান, ভোর ৪টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও তিনি দীর্ঘ সময় গ্যাস পাননি। গাড়ির মালিকের জমা পরিশোধ এবং পরিবারের খরচ নিয়ে তাই তাকে দুশ্চিন্তায় পড়তে হচ্ছে। আরেক চালক জাহাঙ্গীর জানান, প্রতিদিন মহাজনকে ১ হাজার ২০০ টাকা জমা দিতে হয়। গ্যাসের পেছনে প্রায় ৫০০ টাকা এবং নিজের অন্যান্য খরচ মিলিয়ে প্রতিদিন ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় আয়-রোজগার প্রায় বন্ধ হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
পাম্প কর্তৃপক্ষের বক্তব্যেও সংকটের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এম এ মাসুদ ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার কামাল জানান, কয়েক দিন আগেও স্টেশনে তুলনামূলকভাবে পর্যাপ্ত গ্যাস পাওয়া যাচ্ছিল। এরপর কয়েক দিন সরবরাহ একেবারে কমে যায়। কিছুটা সরবরাহ ফিরে এলেও আবার চাপ কমে গেছে। তার মতে, পর্যাপ্ত চাপ না থাকলে স্টেশনের ভালভ স্বাভাবিকভাবে খোলা সম্ভব হয় না। ফলে যেসব স্টেশনের ভালভ কম চাপেও চালু করা যায়, সেসব পাম্প তুলনামূলকভাবে কিছুটা গ্যাস সরবরাহ করতে পারছে। এতে একেক এলাকায় পরিস্থিতির পার্থক্যও দেখা যাচ্ছে।
চালকদের দুর্ভোগ শুধু তাদের ব্যক্তিগত আয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; এর প্রভাব পড়ছে নগর পরিবহন ব্যবস্থাতেও। পাম্পে দীর্ঘ সময় আটকে থাকায় অনেক গাড়ি নির্ধারিত সময়ে রাস্তায় নামতে পারছে না। ফলে যাত্রীরাও গাড়ি পেতে দেরি করছেন এবং স্বাভাবিক যাতায়াতে বাড়তি সময় লাগছে। দিনের কর্মঘণ্টা কমে যাওয়ায় চালক ও যাত্রী—দুই পক্ষের ওপরই চাপ তৈরি হচ্ছে। পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে দীর্ঘ অপেক্ষা, কম আয় এবং পরিবহন সংকট আরও বড় সমস্যায় রূপ নিতে পারে। গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের তথ্য ও অভিযোগ ব্যবস্থাও নজরে রাখা জরুরি।
বর্তমানে রাতের দিকে কিছুটা গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে বলে পাম্প কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। বিকালের পর চাপ কিছুটা বাড়ার কথাও জানা গেছে। তবে দিনের ব্যস্ত সময়ে পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় চালকদের ভোগান্তি পুরোপুরি কমছে না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর নজরদারি, সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা এবং পাম্পভিত্তিক ব্যবস্থাপনা জোরদার করা গেলে এই দুর্ভোগ অনেকটাই কমানো সম্ভব। গ্যাস সংকটের কারণে যারা প্রতিদিন জীবিকা চালান, তাদের জন্য দ্রুত সমাধানই এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা। গ্যাস সরবরাহ-সংক্রান্ত তথ্য ও সেবার জন্য তিতাস গ্যাসের অনলাইন সেবা দেখা যেতে পারে। মূল প্রতিবেদনের প্রেক্ষাপট হিসেবে যুগান্তরের প্রতিবেদন-ও পাঠকরা দেখতে পারেন।



























