মার্কিন অবরোধে কিউবা আবারও তীব্র জ্বালানি সংকটের মুখে পড়েছে। জ্বালানি মজুদ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় সোমবার দেশজুড়ে বড় ধরনের বিদ্যুৎ বিপর্যয় দেখা দেয়। এর ফলে রাজধানী হাভানাসহ বিভিন্ন শহর ও জনপদ দীর্ঘ সময় অন্ধকারে ডুবে থাকে। বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিবহন, শিল্প উৎপাদন, হাসপাতাল এবং দৈনন্দিন জনজীবনেও ব্যাপক প্রভাব পড়েছে।
তবে এমন জাতীয় ব্ল্যাকআউট কিউবার জন্য নতুন নয়। চলতি বছরেই একাধিকবার পুরো দেশে বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটেছে। গত মার্চ মাসে মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে অন্তত দুইবার জাতীয় গ্রিড ভেঙে পড়ে, যার কারণে পুরো দেশ অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়। কিউবার সরকার বারবার দাবি করে আসছে, দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক অবরোধ এবং সাম্প্রতিক জ্বালানি নিষেধাজ্ঞাই এই পরিস্থিতির মূল কারণ।
বিশ্লেষকদের মতে, কিউবার জ্বালানি সংকট আরও তীব্র হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন পদক্ষেপের কারণে। দীর্ঘদিন ধরে দেশটি ভেনিজুয়েলা ও মেক্সিকোর মতো মিত্র রাষ্ট্র থেকে জ্বালানি তেল সংগ্রহ করত। বিশেষ করে ভেনিজুয়েলা ভর্তুকি মূল্যে কিউবাকে তেল সরবরাহ করত। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা এবং বিভিন্ন কূটনৈতিক চাপের ফলে সেই সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। একই সঙ্গে বাড়তি শুল্ক আরোপের সম্ভাবনার কারণে অনেক দেশ কিউবার সঙ্গে জ্বালানি বাণিজ্যে আগ্রহ হারিয়েছে।
মার্কিন অবরোধে কিউবা আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার সুবিধাও স্বাভাবিকভাবে ব্যবহার করতে পারছে না। ফলে তৃতীয় কোনো দেশ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারদরে জ্বালানি কেনাও কঠিন হয়ে পড়েছে। অর্থ লেনদেন, জাহাজ পরিবহন এবং বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা—সব মিলিয়ে দেশটি নজিরবিহীন জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। এর প্রভাব বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে শুরু করে খাদ্য সরবরাহ, পরিবহন এবং শিল্প খাত পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ছে।
১৯৫৯ সালের বিপ্লবের মাধ্যমে সমাজতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার পর থেকেই কিউবা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে রয়েছে। কয়েক দশক ধরে এই অবরোধ দেশটির অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেললেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জ্বালানি সরবরাহে নতুন সীমাবদ্ধতা সংকটকে আরও গভীর করেছে। কিউবার অভিযোগ, সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্যে ওয়াশিংটন ধারাবাহিকভাবে অর্থনৈতিক চাপ বাড়িয়ে চলেছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান হলো, তাদের নিষেধাজ্ঞা কিউবার সরকারের বিরুদ্ধে নেওয়া নীতিগত পদক্ষেপ এবং গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রশ্নের সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে কিউবার সরকার এবং অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক মনে করেন, এসব নিষেধাজ্ঞার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর। বিদ্যুৎ সংকট, জ্বালানির ঘাটতি, খাদ্য সরবরাহে বিঘ্ন এবং মূল্যস্ফীতির কারণে দেশটির জনগণ প্রতিদিন নতুন নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন।
সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও উদ্বেগ বাড়ছে। জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে কিউবায় আরও দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ বিপর্যয় এবং অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাই মার্কিন অবরোধে কিউবা ইস্যু এখন শুধু দুই দেশের রাজনৈতিক বিরোধ নয়, বরং মানবিক ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক আলোচনারও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হয়ে উঠেছে।




























