ইরান যুদ্ধে তেলের চাহিদা কমতে পারে বলে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ)। সংস্থাটির সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি ২০২৬ সালে বিশ্বব্যাপী দৈনিক প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল তেলের চাহিদা কমে যেতে পারে। এই পূর্বাভাস বাস্তব হলে ২০২০ সালে করোনাভাইরাস মহামারির পর এবারই প্রথম বৈশ্বিক তেলের চাহিদায় উল্লেখযোগ্য পতন দেখা যাবে।
আইইএ বলছে, মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সংঘাত বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। যুদ্ধের কারণে তেল উৎপাদন, পরিবহন ও রপ্তানি ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ায় সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ বেড়েছে। এর প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জ্বালানি বাজারেও পড়তে শুরু করেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, চলতি বছরের চাহিদা কমে যাওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে হরমুজ প্রণালির অস্থিতিশীল পরিস্থিতি। পারস্য উপসাগর থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল রপ্তানি হয়, তার বড় অংশই এই নৌপথ ব্যবহার করে। কিন্তু সংঘাতের কারণে কয়েক দফা জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়েছে। ফলে তেল সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে এবং বাজারে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
তবে পরিস্থিতি পুরোপুরি হতাশাজনক নয়। আইইএ মনে করছে, যদি যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকে এবং ধীরে ধীরে হরমুজ প্রণালি আবার স্বাভাবিকভাবে চালু করা যায়, তাহলে বছরের শেষ দিকে তেলের সরবরাহ বাড়তে পারে। এতে উৎপাদনকারী দেশগুলো আবার পূর্ণ সক্ষমতায় তেল উত্তোলন শুরু করতে পারবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহের ভারসাম্য কিছুটা ফিরে আসবে। তবে সংস্থাটি একই সঙ্গে সতর্ক করে বলেছে, নতুন করে সংঘাত তীব্র হলে এই পূর্বাভাস বদলে যেতে পারে।
আইইএর তেলবাজারবিষয়ক প্রধান টরিল বোসোনি জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত অনিশ্চিত। তাঁর মতে, যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কম হলেও বিশ্বের অন্যান্য তেল উৎপাদনকারী দেশ উৎপাদন বাড়াচ্ছে। পাশাপাশি যুদ্ধ শুরুর আগে যে পরিমাণ তেলের চাহিদা থাকবে বলে ধারণা করা হয়েছিল, এখন সেই চাহিদাও কিছুটা কমেছে। ফলে বছরের শেষ দিকে এবং আগামী বছরে বাজারে আবারও তেলের সরবরাহ চাহিদার চেয়ে বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারেও তেলের দামে কিছুটা পরিবর্তন দেখা গেছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে সরবরাহযোগ্য ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭৬.২৫ ডলার। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দাম রয়েছে ৭২.৯০ ডলার প্রতি ব্যারেলে। যদিও দাম এখনো তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে, তবে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে বাজারে বড় ধরনের ওঠানামা দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।
এরই মধ্যে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সামরিক উত্তেজনা অব্যাহত থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে কারিগরি পর্যায়ে আলোচনা চালিয়ে যেতে আগ্রহী। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। এতে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠা নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যুদ্ধে তেলের চাহিদা কমে যাওয়ার এই পূর্বাভাস শুধু জ্বালানি বাজারের জন্য নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তেলের দাম, সরবরাহ ও চাহিদার পরিবর্তনের প্রভাব পরিবহন, শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ, খাদ্যপণ্য এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যসহ প্রায় সব খাতেই পড়ে। তাই মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি কোন দিকে এগোয়, সেটিই এখন বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

























