ঢাকা মেডিকেল হাসপাতাল দেশের স্বাস্থ্যসেবার অন্যতম প্রধান ভরসার জায়গা বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ঢাকা মেডিকেল কলেজের ৮১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, এই প্রতিষ্ঠান শুধু চিকিৎসা নয়, দেশের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোরও নীরব সাক্ষী।
তিনি বলেন, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০ সালের গণআন্দোলন এবং ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনসহ দেশের নানা গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তাই এটি শুধু একটি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান নয়, বরং জাতীয় ইতিহাসেরও অংশ।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঢাকা মেডিকেল হাসপাতাল প্রতিদিন হাজারো মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। এখানে প্রতিনিয়ত নতুন জীবনের সূচনা যেমন হয়, তেমনি অনেক মানুষের শেষ যাত্রারও সাক্ষী থাকে হাসপাতালটি। চিকিৎসক ও রোগীর মধ্যকার বিশ্বাসকে তিনি স্বাস্থ্যসেবার সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন।
চিকিৎসকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, রোগীর সঙ্গে মানবিক আচরণ ও আন্তরিকতা চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একজন চিকিৎসকের ব্যবহার অনেক সময় ওষুধের মতোই কার্যকর হতে পারে। তাই পেশাগত দক্ষতার পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধও সমানভাবে প্রয়োজন।
স্বাস্থ্যসেবা আরও সহজলভ্য করতে সরকার একাধিক নতুন উদ্যোগ নিয়েছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। এর মধ্যে রয়েছে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ৫ হাজার নতুন এমবিবিএস চিকিৎসক নিয়োগ, চিকিৎসক, নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, ফার্মাসিস্ট ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর শূন্যপদ দ্রুত পূরণ এবং উপজেলা হাসপাতালের নিরাপত্তা জোরদার করা।
তিনি জানান, প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১০ জন করে আনসার সদস্য মোতায়েনের পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে চিকিৎসক ও রোগীরা নিরাপদ পরিবেশে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করতে পারেন।
প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবাকে গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোগ হওয়ার পর চিকিৎসার চেয়ে আগে থেকেই সচেতন হওয়া বেশি কার্যকর। এজন্য সরকার দেশজুড়ে ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের কার্যক্রম শুরু করেছে। এর মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ নারী স্বাস্থ্যকর্মী থাকবেন, যারা পরিবারভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেবেন।
তিনি আরও বলেন, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, টিকাদান, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য, পুষ্টি, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি রোগ, হৃদরোগ ও ক্যানসারের মতো অসংক্রামক রোগ সম্পর্কে আগাম সচেতনতা বাড়াতে হবে। এতে দীর্ঘমেয়াদে রোগের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে।
স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির বিষয়েও প্রধানমন্ত্রী গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরেন। তিনি জানান, চলতি অর্থবছরে স্বাস্থ্যখাতে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে অন্যতম সর্বোচ্চ। আগামী পাঁচ বছরে এই বরাদ্দ ধাপে ধাপে জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
চিকিৎসা ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে সরকার হার্টের স্টেন্ট, পেসমেকার, ডায়ালাইসিস ফিল্টার, ক্যানসার চিকিৎসার কিছু কাঁচামাল, চোখের লেন্সসহ বিভিন্ন চিকিৎসা সরঞ্জামের ওপর ভ্যাট ও কর কমিয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ কর প্রত্যাহারও করা হয়েছে।
গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নের অংশ হিসেবে বর্তমানে ৩১ ও ৫১ শয্যার উপজেলা হাসপাতালগুলোকে পর্যায়ক্রমে ১০১ শয্যায় উন্নীত করার পরিকল্পনার কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি হাসপাতালের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শিশুস্বাস্থ্যের উন্নয়নে সরকার বরিশাল ও রাজশাহীতে নির্মিত ২০০ শয্যার শিশু হাসপাতালসহ মোট পাঁচটি শিশু হাসপাতাল দ্রুত চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। এতে রাজধানীর বাইরে বিশেষায়িত শিশু চিকিৎসাসেবা আরও সহজলভ্য হবে।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রতিও গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য পরিচ্ছন্ন হাসপাতাল ও বৈজ্ঞানিকভাবে মেডিকেল বর্জ্য অপসারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে চিকিৎসক, শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান।
সবশেষে প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, বর্তমান মেডিকেল শিক্ষার্থী ও ইন্টার্ন চিকিৎসকদের হাত ধরেই ভবিষ্যতে দেশের মানুষ চিকিৎসার জন্য বিদেশমুখী হওয়ার প্রয়োজন কমে আসবে। দক্ষ, মানবিক ও আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাস্থ্যখাতে আরও এগিয়ে যাবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।




























