আজ মহান মে দিবস, শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের ঐতিহাসিক দিন। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হচ্ছে।
শ্রমিকদের অবদান স্মরণ এবং তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে দিনটি উদযাপিত হয়। এ উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী পৃথক বাণী প্রদান করেছেন। এ বছরের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘সুস্থ শ্রমিক, কর্মঠ হাত, আসবে এবার নব প্রভাত’। এই প্রতিপাদ্যের মাধ্যমে শ্রমিকদের সুস্বাস্থ্য ও উৎপাদনশীলতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শ্রমিকদের উন্নয়ন ছাড়া দেশের সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব নয় বলে মনে করা হচ্ছে। তাই তাদের কল্যাণ নিশ্চিত করাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন শ্রমজীবী মানুষদের আন্তরিক শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় শ্রমিকদের অবদান অপরিসীম। শিল্প, কৃষি ও নির্মাণসহ সব খাতেই তাদের নিরলস পরিশ্রম দৃশ্যমান। এই অবদান দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তিনি আরও বলেন, একটি সমৃদ্ধ দেশ গড়তে শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন তিনি। মালিক ও শ্রমিকের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন। এতে একটি স্থিতিশীল ও উন্নয়নমুখী পরিবেশ তৈরি হবে বলে তিনি মনে করেন।
রাষ্ট্রপতি বিশ্বাস প্রকাশ করেন, শ্রমিকবান্ধব নীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশ এগিয়ে যাবে। শ্রমিকদের পেশাগত স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা হলে উৎপাদনশীলতা বাড়বে। একটি মানবিক ও ন্যায়নিষ্ঠ রাষ্ট্র গঠনে এটি সহায়ক হবে। এভাবে আন্তর্জাতিক পরিসরেও দেশের অবস্থান শক্তিশালী হবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও শ্রমিকদের উন্নয়নে সরকারের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নিয়মিত মজুরি পর্যালোচনার মাধ্যমে ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার কথা জানান তিনি। নারী ও পুরুষ শ্রমিকদের সমান মজুরি নিশ্চিত করতেও সরকার কাজ করছে।
তিনি আরও বলেন, প্রবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর মাধ্যমে তাদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে বিদেশে কর্মরত শ্রমিকরা বিভিন্ন সুবিধা সহজে পেতে পারবেন। এই উদ্যোগ তাদের জীবনমান উন্নয়নে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে। মে দিবস উপলক্ষে রাজধানীতে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। শ্রমিক সংগঠনগুলো সমাবেশ, শোভাযাত্রা ও আলোচনা সভার আয়োজন করেছে। বিশেষ করে একটি বড় শ্রমিক সমাবেশে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে। এটি শ্রমিকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ঐতিহাসিকভাবে মে দিবসের সূচনা হয়েছিল ১৮৮৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে। শিকাগো শহরের হে মার্কেটে শ্রমিকরা কাজের সময় আট ঘণ্টা নির্ধারণের দাবিতে আন্দোলন করেন। তারা উন্নত কর্মপরিবেশ ও মজুরি বৃদ্ধির দাবিও উত্থাপন করেছিলেন। এই আন্দোলন শ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। সেদিন আন্দোলন দমনে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল। পুলিশের গুলিতে অনেক শ্রমিক প্রাণ হারান। এই আত্মত্যাগ বিশ্বব্যাপী শ্রমিক আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। এরই ধারাবাহিকতায় মে দিবস আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পায়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মে দিবসের মূল চেতনা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। শ্রমিকদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশ্বের অনেক দেশে শ্রমিকরা ন্যায্য মজুরি ও নিরাপদ পরিবেশ থেকে বঞ্চিত। এই বাস্তবতায় মে দিবস নতুন করে গুরুত্ব বহন করছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শ্রমিকদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের শিল্প ও কৃষি খাতের অগ্রগতিতে তাদের ভূমিকা অপরিসীম। তাদের উন্নয়ন নিশ্চিত করা গেলে অর্থনীতিও আরও শক্তিশালী হবে। এটি টেকসই উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য বলে মনে করা হচ্ছে।
সবশেষে বলা যায়, মে দিবস কেবল একটি দিবস নয়, এটি একটি চেতনা। শ্রমিকদের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য এই চেতনা কাজ করে। সঠিক নীতি ও উদ্যোগের মাধ্যমে তাদের জীবনমান উন্নয়ন সম্ভব। এতে একটি সমৃদ্ধ ও মানবিক সমাজ গড়ে তোলা যাবে।


























