দেশে বর্তমানে বৈধভাবে নিবন্ধিত মোবাইল সিমের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩২ কোটি ৮২ লাখ, যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় দ্বিগুণ। জাতীয় সংসদে দেওয়া এক লিখিত উত্তরে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম এ তথ্য জানিয়েছেন। সর্বশেষ জনশুমারি অনুযায়ী দেশের জনসংখ্যা যেখানে প্রায় ১৭ কোটি, সেখানে নিবন্ধিত সিমের সংখ্যা ৩২ কোটিরও বেশি হওয়ায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
মঙ্গলবার (৯ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় বা বাজেট অধিবেশনে এ সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করা হয়। সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনি তারকা চিহ্নিত লিখিত প্রশ্নের মাধ্যমে দেশে মোবাইল অপারেটরের সংখ্যা এবং নিবন্ধিত সিমের পরিসংখ্যান জানতে চান।
প্রশ্নের জবাবে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী জানান, বর্তমানে দেশে চারটি মোবাইল ফোন অপারেটর সেবা প্রদান করছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অধীনেই দেশের সব বৈধ মোবাইল সংযোগ পরিচালিত হচ্ছে এবং নিবন্ধিত সিম ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করা হচ্ছে।
দেশে বর্তমানে কার্যক্রম পরিচালনাকারী চারটি মোবাইল অপারেটর হলো টেলিটক বাংলাদেশ লিমিটেড, গ্রামীণফোন লিমিটেড, রবি আজিয়াটা পিএলসি এবং বাংলালিংক ডিজিটাল কমিউনিকেশনস লিমিটেড। এই চার প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত নিবন্ধিত সিমের সংখ্যা ৩২ কোটি ৮২ লাখে পৌঁছেছে।
সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই সিমগুলো বৈধভাবে নিবন্ধিত এবং জাতীয় পরিচয়পত্রসহ নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করে নিবন্ধন সম্পন্ন করা হয়েছে। ফলে দেশের মোবাইল গ্রাহক ব্যবস্থাপনা এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অধিক তথ্যভিত্তিক ও নিয়ন্ত্রিত।
বিশ্লেষকদের মতে, নিবন্ধিত সিমের সংখ্যা জনসংখ্যার তুলনায় অনেক বেশি হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। দেশের বিপুলসংখ্যক ব্যবহারকারী ব্যক্তিগত ও পেশাগত প্রয়োজনের জন্য একাধিক সিম ব্যবহার করে থাকেন। ফলে একজন ব্যক্তির নামে একাধিক সিম নিবন্ধিত থাকা এখন সাধারণ বিষয়।
মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারের বিস্তারও সিমের সংখ্যা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। অনেক ব্যবহারকারী কেবল ডেটা ব্যবহারের জন্য আলাদা সিম ব্যবহার করেন। আবার কল, ইন্টারনেট ও বিভিন্ন অফারের সুবিধা নিতে ভিন্ন ভিন্ন অপারেটরের সিমও ব্যবহার করা হয়।
ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, করপোরেট অফিস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থার নামেও বিপুলসংখ্যক সিম নিবন্ধিত রয়েছে। এসব সংযোগ দেশের মোট নিবন্ধিত সিমের সংখ্যাকে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছে।
এছাড়া মোবাইল ব্যাংকিং, ডিজিটাল সেবা, অনলাইন নিবন্ধন এবং বিভিন্ন সরকারি সেবার সঙ্গে মোবাইল নম্বর যুক্ত থাকায় সিমের চাহিদা ক্রমাগত বেড়েছে। একটি পরিবারেও একাধিক সদস্যের নামে একাধিক সিম ব্যবহারের প্রবণতা দেখা যায়।
অন্যদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ জনশুমারির তথ্য দেশের জনসংখ্যার একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরেছে। ২০২৩ সালের ২৮ নভেম্বর প্রকাশিত চূড়ান্ত প্রতিবেদনে দেশের মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৯৮ লাখ ২৮ হাজার ৯১১ জন বলে উল্লেখ করা হয়।
এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশের মোট জনসংখ্যার তুলনায় নিবন্ধিত সিমের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ। বিষয়টি দেশের ডিজিটাল সংযোগ সম্প্রসারণ এবং মোবাইল নির্ভর জীবনযাত্রার বাস্তব চিত্রও তুলে ধরে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিমের সংখ্যা বেশি মানেই সক্রিয় গ্রাহকের সংখ্যা সমান নয়। অনেক সিম দীর্ঘদিন ব্যবহার না হলেও নিবন্ধিত অবস্থায় থাকতে পারে। আবার বিভিন্ন প্রচারণা বা অফারের কারণে গ্রাহকরা নতুন সিম কিনে থাকেন।
টেলিযোগাযোগ খাতের দ্রুত সম্প্রসারণের ফলে গত এক দশকে মোবাইল ব্যবহারকারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও মোবাইল নেটওয়ার্ক পৌঁছে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।
বর্তমানে মোবাইল ফোন শুধু কথা বলার মাধ্যম নয়, বরং শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসা-বাণিজ্য, ব্যাংকিং এবং সরকারি সেবা গ্রহণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে। ফলে সিমের ব্যবহারও বহুমাত্রিক আকার ধারণ করেছে।
মোবাইল অপারেটরগুলোও গ্রাহক আকর্ষণে নিয়মিত নতুন প্যাকেজ ও সেবা চালু করছে। ইন্টারনেটভিত্তিক সেবা বৃদ্ধি পাওয়ায় ডেটা ব্যবহারের জন্য অতিরিক্ত সিম গ্রহণের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ উদ্যোগ এবং প্রযুক্তিনির্ভর সেবা সম্প্রসারণের কারণে মোবাইল সংযোগের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। বর্তমানে অধিকাংশ ডিজিটাল সেবার সঙ্গে মোবাইল নম্বর বাধ্যতামূলকভাবে যুক্ত থাকছে।
জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত এই তথ্য দেশের টেলিযোগাযোগ খাতের ব্যাপক বিস্তারের একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে এটি দেখাচ্ছে যে, মোবাইল প্রযুক্তি এখন দেশের অর্থনীতি ও দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে ফাইভজি প্রযুক্তি, স্মার্ট ডিভাইসের বিস্তার এবং ডিজিটাল সেবার সম্প্রসারণের ফলে মোবাইল সংযোগের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। ফলে নিবন্ধিত সিমের সংখ্যা ও জনসংখ্যার ব্যবধান আরও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।




























