ঢাকা ০৬:০৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ০২ অগাস্ট ২০২৬, ১৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রথম ম্যাচে ড্র, তবু বিশ্বকাপ জিতেছিল যারা—স্বস্তি পাবে ব্রাজিল

ব্রাজিল-মরক্কোর ম্যাচের দৃশ্য

বিশ্বকাপ ২০২৬-এ নিজেদের অভিযান শুরু করেছে ব্রাজিল। তবে প্রত্যাশিত জয় দিয়ে নয়, মরক্কোর বিপক্ষে ১-১ গোলের ড্র দিয়ে টুর্নামেন্ট শুরু করতে হয়েছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের। এতে সমর্থকদের মধ্যে কিছুটা উদ্বেগ তৈরি হলেও ইতিহাস বলছে, প্রথম ম্যাচে পয়েন্ট হারানো কোনো দলের শিরোপা স্বপ্ন শেষ করে দেয় না।

ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে উদ্বোধনী ম্যাচ সব সময়ই বিশেষ চাপের। নতুন পরিবেশ, প্রত্যাশার ভার এবং ফলাফলের গুরুত্ব অনেক সময় বড় দলগুলোকেও নিজেদের সেরা খেলাটা খেলতে বাধা দেয়। ফলে প্রথম ম্যাচে হোঁচট খাওয়া বিশ্বকাপ ইতিহাসে মোটেও বিরল কোনো ঘটনা নয়।

বরং অতীতের দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রথম ম্যাচে ড্র কিংবা হার দিয়ে শুরু করেও শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ ট্রফি জয়ের অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। এসব ঘটনাই এখন ব্রাজিলকে নতুন করে আশাবাদী হওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে।

এমন উদাহরণের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য একটি হলো ১৯৬৬ সালের ইংল্যান্ড। নিজেদের মাটিতে আয়োজিত সেই বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে উরুগুয়ের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র করেছিল থ্রি লায়ন্সরা। ঘরের মাঠে শুরুটা হতাশাজনক হলেও তারা ধীরে ধীরে নিজেদের ছন্দ খুঁজে পায়।

গ্রুপ পর্ব পার হওয়ার পর নকআউট পর্বে দুর্দান্ত ফুটবল উপহার দেয় ইংল্যান্ড। স্যার আলফ রামসের নেতৃত্বে দলটি একের পর এক বাধা অতিক্রম করে ফাইনালে পৌঁছে যায়। সেখানে পশ্চিম জার্মানিকে ৪-২ গোলে হারিয়ে নিজেদের ইতিহাসের একমাত্র বিশ্বকাপ শিরোপা জেতে ইংল্যান্ড।

প্রথম ম্যাচে ড্র করে বিশ্বকাপ জয়ের আরেকটি অবিশ্বাস্য গল্প ইতালির। ১৯৮২ সালের স্পেন বিশ্বকাপে আজ্জুরিরা টুর্নামেন্ট শুরু করেছিল পোল্যান্ডের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র দিয়ে। এরপরও পরিস্থিতি খুব একটা বদলায়নি।

গ্রুপ পর্বে পেরুর সঙ্গে ১-১ এবং ক্যামেরুনের সঙ্গে ১-১ ড্র করে কোনো ম্যাচ না জিতেই পরের রাউন্ডে উঠেছিল ইতালি। অনেকেই তখন দলটিকে শিরোপা লড়াই থেকে ছিটকে পড়া দল হিসেবে ধরে নিয়েছিলেন। কিন্তু নকআউট পর্বে যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ইতালিকে দেখা যায়।

পরের ধাপে তারা প্রথমে আর্জেন্টিনাকে হারায়। এরপর দুর্দান্ত ছন্দে থাকা ব্রাজিলকে বিদায় করে ফুটবল বিশ্বকে চমকে দেয়। ফাইনালে পশ্চিম জার্মানিকে ৩-১ গোলে হারিয়ে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়নের মুকুট পরে ইতালি।

বিশ্বকাপ ইতিহাস আরও বড় কিছু উদাহরণ তুলে ধরে। ২০১০ সালে স্পেন নিজেদের প্রথম ম্যাচে সুইজারল্যান্ডের কাছে ১-০ গোলে হেরে যায়। সেই পরাজয়ের পর অনেকেই স্পেনের শিরোপা সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন।

কিন্তু ভিসেন্তে দেল বস্কের দল দ্রুত ঘুরে দাঁড়ায়। ধারাবাহিক জয়ে তারা ফাইনালে পৌঁছে নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ ট্রফি জেতে। প্রথম ম্যাচে হার দিয়েও যে চ্যাম্পিয়ন হওয়া সম্ভব, স্পেন তার অন্যতম বড় উদাহরণ।

একই ধরনের ঘটনা দেখা গেছে ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে। টুর্নামেন্ট শুরুর আগে অন্যতম ফেভারিট ছিল আর্জেন্টিনা। কিন্তু প্রথম ম্যাচেই সৌদি আরবের কাছে ২-১ গোলে হেরে যায় লিওনেল মেসির দল।

সেই অপ্রত্যাশিত পরাজয়ের পর অনেকেই আর্জেন্টিনাকে নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু দলটি দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে একের পর এক ম্যাচ জিতে ফাইনালে পৌঁছে যায়। শেষ পর্যন্ত ফ্রান্সকে হারিয়ে তৃতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা জিতে নেয় আলবিসেলেস্তেরা।

এই উদাহরণগুলো ব্রাজিলের জন্য বড় অনুপ্রেরণা হতে পারে। মরক্কোর বিপক্ষে ড্র করে তারা হয়তো আদর্শ সূচনা পায়নি, তবে ইতিহাস বলছে, বিশ্বকাপের ভাগ্য প্রথম ম্যাচেই নির্ধারিত হয়ে যায় না।

বিশ্লেষকদের মতে, টুর্নামেন্টের শুরুতে ভুল করা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া। দল কত দ্রুত নিজেদের গুছিয়ে নিতে পারে, সেটিই শেষ পর্যন্ত বড় পার্থক্য গড়ে দেয়।

সামনে এখনও দীর্ঘ পথ বাকি ব্রাজিলের। যদি কার্লো আনচেলত্তির দল নিজেদের দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারে এবং প্রত্যাশিত ছন্দে ফিরতে পারে, তাহলে হেক্সা জয়ের স্বপ্ন এখনও পুরোপুরি জীবন্ত। ইতিহাস অন্তত সেটাই বলছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

প্রথম ম্যাচে ড্র, তবু বিশ্বকাপ জিতেছিল যারা—স্বস্তি পাবে ব্রাজিল

Update Time : ০৮:১৯:২৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬

বিশ্বকাপ ২০২৬-এ নিজেদের অভিযান শুরু করেছে ব্রাজিল। তবে প্রত্যাশিত জয় দিয়ে নয়, মরক্কোর বিপক্ষে ১-১ গোলের ড্র দিয়ে টুর্নামেন্ট শুরু করতে হয়েছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের। এতে সমর্থকদের মধ্যে কিছুটা উদ্বেগ তৈরি হলেও ইতিহাস বলছে, প্রথম ম্যাচে পয়েন্ট হারানো কোনো দলের শিরোপা স্বপ্ন শেষ করে দেয় না।

ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে উদ্বোধনী ম্যাচ সব সময়ই বিশেষ চাপের। নতুন পরিবেশ, প্রত্যাশার ভার এবং ফলাফলের গুরুত্ব অনেক সময় বড় দলগুলোকেও নিজেদের সেরা খেলাটা খেলতে বাধা দেয়। ফলে প্রথম ম্যাচে হোঁচট খাওয়া বিশ্বকাপ ইতিহাসে মোটেও বিরল কোনো ঘটনা নয়।

বরং অতীতের দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রথম ম্যাচে ড্র কিংবা হার দিয়ে শুরু করেও শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ ট্রফি জয়ের অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। এসব ঘটনাই এখন ব্রাজিলকে নতুন করে আশাবাদী হওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে।

এমন উদাহরণের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য একটি হলো ১৯৬৬ সালের ইংল্যান্ড। নিজেদের মাটিতে আয়োজিত সেই বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে উরুগুয়ের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র করেছিল থ্রি লায়ন্সরা। ঘরের মাঠে শুরুটা হতাশাজনক হলেও তারা ধীরে ধীরে নিজেদের ছন্দ খুঁজে পায়।

আরও পড়ুন  ৮৮ বছরের রেকর্ড ধরে রাখতে মরক্কোর বিপক্ষে ব্রাজিল

গ্রুপ পর্ব পার হওয়ার পর নকআউট পর্বে দুর্দান্ত ফুটবল উপহার দেয় ইংল্যান্ড। স্যার আলফ রামসের নেতৃত্বে দলটি একের পর এক বাধা অতিক্রম করে ফাইনালে পৌঁছে যায়। সেখানে পশ্চিম জার্মানিকে ৪-২ গোলে হারিয়ে নিজেদের ইতিহাসের একমাত্র বিশ্বকাপ শিরোপা জেতে ইংল্যান্ড।

প্রথম ম্যাচে ড্র করে বিশ্বকাপ জয়ের আরেকটি অবিশ্বাস্য গল্প ইতালির। ১৯৮২ সালের স্পেন বিশ্বকাপে আজ্জুরিরা টুর্নামেন্ট শুরু করেছিল পোল্যান্ডের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র দিয়ে। এরপরও পরিস্থিতি খুব একটা বদলায়নি।

গ্রুপ পর্বে পেরুর সঙ্গে ১-১ এবং ক্যামেরুনের সঙ্গে ১-১ ড্র করে কোনো ম্যাচ না জিতেই পরের রাউন্ডে উঠেছিল ইতালি। অনেকেই তখন দলটিকে শিরোপা লড়াই থেকে ছিটকে পড়া দল হিসেবে ধরে নিয়েছিলেন। কিন্তু নকআউট পর্বে যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ইতালিকে দেখা যায়।

আরও পড়ুন  নেইমার কি খেলবেন ব্রাজিলের প্রথম ম্যাচে? জানালেন আনচেলত্তি

পরের ধাপে তারা প্রথমে আর্জেন্টিনাকে হারায়। এরপর দুর্দান্ত ছন্দে থাকা ব্রাজিলকে বিদায় করে ফুটবল বিশ্বকে চমকে দেয়। ফাইনালে পশ্চিম জার্মানিকে ৩-১ গোলে হারিয়ে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়নের মুকুট পরে ইতালি।

বিশ্বকাপ ইতিহাস আরও বড় কিছু উদাহরণ তুলে ধরে। ২০১০ সালে স্পেন নিজেদের প্রথম ম্যাচে সুইজারল্যান্ডের কাছে ১-০ গোলে হেরে যায়। সেই পরাজয়ের পর অনেকেই স্পেনের শিরোপা সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন।

কিন্তু ভিসেন্তে দেল বস্কের দল দ্রুত ঘুরে দাঁড়ায়। ধারাবাহিক জয়ে তারা ফাইনালে পৌঁছে নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ ট্রফি জেতে। প্রথম ম্যাচে হার দিয়েও যে চ্যাম্পিয়ন হওয়া সম্ভব, স্পেন তার অন্যতম বড় উদাহরণ।

একই ধরনের ঘটনা দেখা গেছে ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে। টুর্নামেন্ট শুরুর আগে অন্যতম ফেভারিট ছিল আর্জেন্টিনা। কিন্তু প্রথম ম্যাচেই সৌদি আরবের কাছে ২-১ গোলে হেরে যায় লিওনেল মেসির দল।

আরও পড়ুন  প্যারাগুয়ের কাছে তুরস্কের হার, ১০ জন নিয়েও জয়

সেই অপ্রত্যাশিত পরাজয়ের পর অনেকেই আর্জেন্টিনাকে নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু দলটি দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে একের পর এক ম্যাচ জিতে ফাইনালে পৌঁছে যায়। শেষ পর্যন্ত ফ্রান্সকে হারিয়ে তৃতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা জিতে নেয় আলবিসেলেস্তেরা।

এই উদাহরণগুলো ব্রাজিলের জন্য বড় অনুপ্রেরণা হতে পারে। মরক্কোর বিপক্ষে ড্র করে তারা হয়তো আদর্শ সূচনা পায়নি, তবে ইতিহাস বলছে, বিশ্বকাপের ভাগ্য প্রথম ম্যাচেই নির্ধারিত হয়ে যায় না।

বিশ্লেষকদের মতে, টুর্নামেন্টের শুরুতে ভুল করা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া। দল কত দ্রুত নিজেদের গুছিয়ে নিতে পারে, সেটিই শেষ পর্যন্ত বড় পার্থক্য গড়ে দেয়।

সামনে এখনও দীর্ঘ পথ বাকি ব্রাজিলের। যদি কার্লো আনচেলত্তির দল নিজেদের দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারে এবং প্রত্যাশিত ছন্দে ফিরতে পারে, তাহলে হেক্সা জয়ের স্বপ্ন এখনও পুরোপুরি জীবন্ত। ইতিহাস অন্তত সেটাই বলছে।