গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম অঙ্গীকার বলে জানিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। তিনি বলেছেন, অতীতে স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থায় রাষ্ট্র গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করত এবং সংবাদমাধ্যমের প্রতি ভীতিপ্রদর্শনমূলক আচরণ করত। তবে বর্তমান সরকার সেই ধারা থেকে সরে এসে সাংবাদিক ও গণমাধ্যমের সমস্যা সমাধানে সহযোগী অংশীদার হিসেবে কাজ করতে চায়।
মঙ্গলবার রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে আয়োজিত ‘সংবাদপত্রের কালো দিবস’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন এবং ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের যৌথ উদ্যোগে এই আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, সংবাদপত্রের কালো দিবস শুধু ইতিহাস স্মরণের একটি উপলক্ষ নয়, বরং বর্তমান সময়ের গণমাধ্যমের সংকট ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ নিয়ে ভাবারও একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। তার মতে, সাংবাদিকতা পেশা বর্তমানে নানা ধরনের চাপে রয়েছে এবং সেই বাস্তবতা মোকাবিলায় নতুন চিন্তা ও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
মন্ত্রী বলেন, কেবল অতীতের ঘটনাগুলো নিয়ে আলোচনা করলেই হবে না। বর্তমান বিশ্বের দ্রুত পরিবর্তিত তথ্যপ্রযুক্তি পরিবেশ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার এবং ডিজিটাল যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রভাব গভীরভাবে অনুধাবন করতে হবে। একই সঙ্গে এসব পরিবর্তনের ফলে তৈরি হওয়া নতুন সমস্যার বাস্তবসম্মত সমাধানও বের করতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে খুব সহজেই তথ্য তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। এর ফলে সত্য ও বিভ্রান্তিকর তথ্য একইসঙ্গে মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের কারণে এসব তথ্য মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে, যা গণমাধ্যমের জন্য নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে।
জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে সাংবাদিকতার দায়িত্ব আরও বেড়েছে। সংবাদ যাচাই, তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করা এবং জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি মনে করেন, প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে গণমাধ্যম, রাষ্ট্র এবং সমাজকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। ইতিহাসের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ১৯৭৫ সালে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশে একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সেই সময় শাসকগোষ্ঠী জনগণের কণ্ঠস্বর দমনের উদ্দেশ্যে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সীমিত করেছিল। তার ভাষায়, সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধের মধ্য দিয়ে জনগণের মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকেও সংকুচিত করা হয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, অতীতের স্বৈরাচারী মানসিকতা থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি। গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে হলে সমাজের প্রতিটি স্তরে স্বাধীন মতপ্রকাশ ও সমালোচনার পরিবেশ বজায় রাখতে হবে। ইতিহাসের ভুলগুলো বিশ্লেষণ করলে ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা পাওয়া সম্ভব বলে তিনি মন্তব্য করেন। বর্তমান সময়ে নাগরিক সাংবাদিকতার প্রসঙ্গও তুলে ধরেন তথ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, সাধারণ মানুষ এখন বিভিন্ন ডিজিটাল মাধ্যমে তথ্য প্রচার করছেন। এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বরং নাগরিক সাংবাদিকতাকে একটি সুশৃঙ্খল কাঠামোর মধ্যে আনার জন্য প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়ন করা দরকার।
তিনি জানান, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যে এ বিষয়ে আইনগত পদক্ষেপ নিয়েছে। অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন উদ্যোগের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশকেও সময়োপযোগী নীতিমালা তৈরির দিকে এগিয়ে যেতে হবে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, শুধু সরকারের সদিচ্ছা থাকলেই হবে না। সংবাদমাধ্যমের মালিকপক্ষকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। সাংবাদিকদের যথাযথ বেতন-ভাতা, পেশাগত নিরাপত্তা এবং মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত না হলে প্রকৃত স্বাধীন সাংবাদিকতা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো সাংবাদিকদের আর্থিক নিরাপত্তা এবং সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করা। একইসঙ্গে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোকেও শ্রম আইন ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিধান মেনে পরিচালিত হতে হবে। কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও মালিকপক্ষের দায়িত্ব রয়েছে। মন্ত্রী জানান, যেসব গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান নিজেদের শিল্পপ্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালনা করবে, তাদের অবশ্যই দেশের প্রচলিত আইন অনুসরণ করতে হবে। অন্যদিকে জনকল্যাণমূলক উদ্দেশ্যে পরিচালিত গণমাধ্যমগুলোর জন্য বিশেষ সহায়তা ও প্রণোদনার বিষয়টিও সরকার বিবেচনা করছে।
গণমাধ্যম খাতের সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকার ইতোমধ্যে সম্পাদক পরিষদ, টেলিভিশন সংশ্লিষ্ট সংগঠন এবং বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করেছে। এসব মতামতের ভিত্তিতে একটি শক্তিশালী গণমাধ্যম কমিশন গঠনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তার দাবি, নতুন এই কমিশন আধা-বিচারিক ক্ষমতা নিয়ে কাজ করবে এবং গণমাধ্যম খাতে জবাবদিহি, স্বচ্ছতা ও পেশাগত মানোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এটি সাংবাদিকদের বিভিন্ন অভিযোগ ও পেশাগত সমস্যার সমাধানেও কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
জহির উদ্দিন স্বপন আরও বলেন, রাষ্ট্র ও সরকারের কার্যক্রমের ওপর গণমাধ্যমের নজরদারি গণতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম রাষ্ট্রকে নিয়মিত প্রশ্নের মুখোমুখি রাখে, যা সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সহায়ক ভূমিকা পালন করে। তিনি মনে করেন, গণমাধ্যম যদি নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্ব বজায় রেখে দায়িত্ব পালন করে, তাহলে রাষ্ট্রের ভুলত্রুটি দ্রুত চিহ্নিত হবে এবং সংশোধনের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এর মাধ্যমে দেশ আরও সঠিক পথে এগিয়ে যেতে পারবে।
আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এছাড়া জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি কবি হাসান হাফিজ, টেলিভিশন সম্পাদক পরিষদের আহ্বায়ক ড. আবদুল হাই সিদ্দিক, প্রতিদিনের বাংলাদেশ পত্রিকার সম্পাদক মারুফ কামাল খান সোহেলসহ গণমাধ্যম অঙ্গনের বিভিন্ন ব্যক্তিত্ব বক্তব্য রাখেন। সব মিলিয়ে আলোচনা সভায় বক্তারা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তিনির্ভর নতুন যুগে গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
একই সঙ্গে সাংবাদিকতার মানোন্নয়ন এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ শক্তিশালী করতে সরকার, গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ও সাংবাদিকদের সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরা হয়।




























