বাংলাদেশের স্বর্ণবাজারে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে স্বর্ণের মূল্য। ১৭ জুন ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি (বাজুস) নির্ধারিত সর্বশেষ দর অনুযায়ী দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম উচ্চ অবস্থানে রয়েছে। নতুন এই মূল্য তালিকা প্রকাশের পর স্বর্ণ ক্রেতা, বিক্রেতা এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ দেখা গেছে। বিশেষ করে যারা স্বর্ণ কেনার পরিকল্পনা করছেন, তাদের জন্য সর্বশেষ বাজারদর জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সর্বশেষ নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম রাখা হয়েছে ২ লাখ ৩০ হাজার ৪২২ টাকা। দেশের বাজারে ২২ ক্যারেট স্বর্ণকে সবচেয়ে বেশি বিশুদ্ধ এবং জনপ্রিয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিয়ে, বাগদান, পারিবারিক অনুষ্ঠান এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অধিকাংশ মানুষ এই মানের স্বর্ণকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকেন।
অন্যদিকে ২১ ক্যারেট স্বর্ণের প্রতি ভরির দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ১৯ হাজার ৯৮৩ টাকা। বিশুদ্ধতার দিক থেকে এটি ২২ ক্যারেটের তুলনায় কিছুটা কম হলেও গহনা তৈরিতে এর ব্যবহার ব্যাপক। তুলনামূলকভাবে কম দামের কারণে অনেক ক্রেতা এই ক্যাটাগরির স্বর্ণের প্রতি আগ্রহ দেখান।
১৮ ক্যারেট স্বর্ণের বর্তমান দাম প্রতি ভরি ১ লাখ ৮৮ হাজার ৫৪৯ টাকা। আধুনিক ও নান্দনিক ডিজাইনের গহনা তৈরিতে ১৮ ক্যারেট স্বর্ণের ব্যবহার বেশি দেখা যায়। বর্তমানে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই ধরনের গহনার চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে বাজারে ১৮ ক্যারেট স্বর্ণের বিক্রিও সন্তোষজনক অবস্থানে রয়েছে।
এদিকে সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি ভরি ১ লাখ ৫৩ হাজার ৫৫৭ টাকা। তুলনামূলকভাবে কম বিশুদ্ধতার কারণে এই শ্রেণির স্বর্ণের দামও কম। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এখনও সনাতন পদ্ধতির গহনা ব্যবহার করা হয় এবং নির্দিষ্ট একটি ক্রেতাশ্রেণির কাছে এর চাহিদা বজায় রয়েছে।
স্বর্ণের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বৈশ্বিক বাজারে স্বর্ণের মূল্য বৃদ্ধি পেলে তার প্রভাব বাংলাদেশের বাজারেও পড়ে। এছাড়া ডলারের বিনিময় হার, আমদানি ব্যয়, পরিবহন খরচ এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও স্বর্ণের দামের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা দেখা দিলে বিনিয়োগকারীরা সাধারণত নিরাপদ সম্পদ হিসেবে স্বর্ণে বিনিয়োগ বাড়িয়ে দেন। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা বৃদ্ধি পায় এবং মূল্যও বাড়তে শুরু করে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও মুদ্রাস্ফীতির কারণে স্বর্ণের বাজারে ইতিবাচক প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
বাংলাদেশে স্বর্ণের বাজার দীর্ঘদিন ধরেই বিনিয়োগের একটি নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। অনেক পরিবার ভবিষ্যতের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে স্বর্ণ কিনে রাখেন। বিশেষ করে গ্রামীণ ও শহরাঞ্চল উভয় এলাকাতেই স্বর্ণকে মূল্যবান সম্পদ হিসেবে দেখা হয়।
জুয়েলারি ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, বিয়ের মৌসুম এবং বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসবের সময় স্বর্ণের চাহিদা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যায়। এই সময়ে গহনা বিক্রিও বৃদ্ধি পায়। ফলে বাজারে স্বর্ণের লেনদেন স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেশি হয়।
স্বর্ণ কেনার সময় শুধু নির্ধারিত বাজারদর বিবেচনা করলেই যথেষ্ট নয়। কারণ গহনার দোকানে স্বর্ণের মূল্যের সঙ্গে মেকিং চার্জ, ভ্যাট এবং অন্যান্য খরচ যুক্ত হয়। ফলে একজন ক্রেতাকে প্রকৃতপক্ষে আরও বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়। তাই কেনাকাটার আগে মোট খরচ সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নেওয়া জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় স্বর্ণের দাম নিকট ভবিষ্যতে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন না এলে মূল্য উচ্চ পর্যায়েই থাকতে পারে। তবে বিশ্ব অর্থনীতির পরিস্থিতি পরিবর্তিত হলে বাজারেও নতুন প্রভাব দেখা যেতে পারে।
বিনিয়োগ বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দীর্ঘমেয়াদে স্বর্ণ এখনও একটি নিরাপদ বিনিয়োগ মাধ্যম। শেয়ারবাজার বা অন্যান্য বিনিয়োগ খাতের তুলনায় স্বর্ণের মূল্য সাধারণত স্থিতিশীল থাকে। ফলে অনেক বিনিয়োগকারী তাদের সম্পদের একটি অংশ স্বর্ণে রাখাকে নিরাপদ মনে করেন।
বর্তমানে দেশের বাজারে স্বর্ণের উচ্চ মূল্য সাধারণ ক্রেতাদের জন্য কিছুটা চাপের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য বিয়ে বা বিশেষ অনুষ্ঠানে স্বর্ণ কেনা আগের তুলনায় আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। তবুও সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কারণে স্বর্ণের চাহিদা কমেনি।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্বর্ণের দাম নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দেশের বাজারেও নতুন দর নির্ধারণ হতে পারে। যারা স্বর্ণ কেনার পরিকল্পনা করছেন, তাদের সর্বশেষ মূল্য যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
সব মিলিয়ে ১৭ জুন ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশের স্বর্ণবাজারে ২২ ক্যারেট স্বর্ণের প্রতি ভরির দাম ২ লাখ ৩০ হাজার ৪২২ টাকা, ২১ ক্যারেট স্বর্ণের দাম ২ লাখ ১৯ হাজার ৯৮৩ টাকা, ১৮ ক্যারেট স্বর্ণের দাম ১ লাখ ৮৮ হাজার ৫৪৯ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণের দাম ১ লাখ ৫৩ হাজার ৫৫৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। স্বর্ণের এই হালনাগাদ মূল্য দেশের বাজারে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে এবং ক্রেতা ও বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।




























