সীমান্তে আটকে ১২ জন নারী, পুরুষ ও শিশু গত তিন দিন ধরে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার প্রাগপুর সীমান্তের শূন্যরেখায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন। প্রচণ্ড গরম, খাদ্য ও চিকিৎসা সংকট এবং অনিশ্চয়তায় কাটছে তাদের প্রতিটি মুহূর্ত। সীমান্তের এই সংকটময় পরিস্থিতিতে তাদের অসহায় আর্তনাদ এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।
‘আমাদের জীবনডা বাঁচান’—এমন আকুতি জানিয়ে ভিডিও বার্তায় সাহায্যের আবেদন করেছেন শূন্যরেখায় আটকে থাকা ব্যক্তিদের একজন। তার কণ্ঠে ছিল হতাশা, ক্ষোভ এবং বেঁচে থাকার আকুতি।
প্রচণ্ড গরমে অসহায় শিশু ও পরিবার
রোববার দুপুরে ধারণ করা একটি ভিডিওতে দেখা যায়, সীমান্তের শূন্যরেখায় একটি নীল পলিথিনের ওপর গাদাগাদি করে বসে আছেন কয়েকজন নারী-পুরুষ ও শিশু। তীব্র রোদে তাদের অবস্থা ছিল অত্যন্ত করুণ।
ভিডিওতে দেখা যায়, দুটি শিশু ঘুমিয়ে আছে। একটি শিশুকে তার মা কোলে নিয়ে বসে আছেন। অন্য শিশুটি পাশে শুয়ে আছে। আরেকটি শিশুকে বেশ অসুস্থ ও দুর্বল দেখাচ্ছিল। শিশুদের এই অবস্থা উপস্থিত সবার মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
পরিবারগুলোর অভিযোগ, কয়েকদিন ধরে খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করতে গিয়ে শিশু ও বয়স্করা অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। পর্যাপ্ত চিকিৎসা, বিশুদ্ধ পানি ও আশ্রয়ের অভাবে তাদের দুর্ভোগ আরও বেড়ে যাচ্ছে।
‘আমাদের জন্য একটা ব্যবস্থা করেন’
ভিডিওতে অসহায় এক ব্যক্তি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন,
‘খুবই গরমের ভেতর বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে আমরা টিকতে পারছি না। আপনারা আমাদের একটা ব্যবস্থা করেন। নয়তো আমাদের যা করবেন, আপনারা করেন। জীবনে আর সহ্য হচ্ছে না। বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে আমরা খুবই অসহায়ের মধ্যে আছি।’
তার এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকেই মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দ্রুত সমাধানের দাবি জানিয়েছেন।
নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন
আটকে থাকা ব্যক্তিরা দাবি করেছেন, তাদের কাছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র রয়েছে। তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তাদের পরিচয় যাচাই করার অনুরোধ জানিয়েছেন।
ভিডিওতে ওই ব্যক্তি বলেন,
‘আমাদের কাছে ডকুমেন্ট সব আছে। আপনারা দেখেন আমরা কী, এদের নাগরিক না রোহিঙ্গা। আপনারা তদন্ত করে দেখেন।’
তাদের এই দাবি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। কারণ নাগরিকত্ব ও পরিচয় যাচাইয়ের বিষয়টি এখন পুরো ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
কীভাবে শুরু হয় এই ঘটনা?
সীমান্তে আটকে ১২ জন মানুষের এই সংকটের সূত্রপাত ঘটে গত শুক্রবার ভোররাতে।
স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার প্রাগপুর সীমান্ত দিয়ে ওই ১২ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়। পরে তারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে হাসিব মার্কেট এলাকায় পৌঁছালে স্থানীয়রা বিষয়টি লক্ষ্য করেন।
পরবর্তীতে স্থানীয় বাসিন্দারা বিজিবিকে খবর দেন। এরপর বিজিবি ও স্থানীয়দের উদ্যোগে ওই ব্যক্তিদের আবার সীমান্তের শূন্যরেখায় ফিরিয়ে নেওয়া হয়।
এরপর থেকেই তারা সীমান্তের মাঝামাঝি এলাকায় অবস্থান করছেন।
তিন দিন ধরে শূন্যরেখায়
ঘটনার পর তিন দিন পেরিয়ে গেলেও এখনো কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি।
শূন্যরেখার কাছে মাথাভাঙ্গা নদীর তীরবর্তী একটি পাটক্ষেতের আইলে দিন-রাত কাটাচ্ছেন তারা। দিনের বেলা তপ্ত রোদ আর রাতের বেলা অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতা তাদের নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে।
স্থানীয় কিছু মানবিক মানুষ মাঝেমধ্যে বাঁশের সাঁকো পার হয়ে তাদের কাছে খাবার ও পানি পৌঁছে দিচ্ছেন। তবে সেটি প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল বলে জানা গেছে।
বিজিবি-বিএসএফ বৈঠকেও মেলেনি সমাধান
এই ঘটনার পর শনিবার সকালে বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে একটি পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হলেও তাৎক্ষণিক কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি। ফলে সীমান্তে আটকে থাকা পরিবারগুলোর দুর্ভোগ অব্যাহত রয়েছে।
বিজিবি-৪৭ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল রাশেদ কামাল রনি জানিয়েছেন, বিএসএফ বর্তমানে ওই ১২ জনের কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, যাচাই প্রক্রিয়া শেষ হলে বিএসএফ তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবে। তবে এখন পর্যন্ত বিষয়টি অমীমাংসিত অবস্থায় রয়েছে।
মানবিক সংকট আরও গভীর হচ্ছে
বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্তসংক্রান্ত বিরোধ বা নাগরিকত্ব যাচাইয়ের বিষয়গুলো প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাধান হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন নারী, শিশু ও সাধারণ মানুষ।
বর্তমান পরিস্থিতিতে আটকে থাকা শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। তীব্র গরম, বিশুদ্ধ পানির অভাব এবং খোলা আকাশের নিচে অবস্থানের কারণে তারা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এছাড়া মানসিক চাপও তাদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
স্থানীয়দের মানবিক সহায়তা
যদিও প্রশাসনিক সমাধান এখনো আসেনি, তবে স্থানীয় বাসিন্দারা মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন।
খাবার, পানি ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দিয়ে তারা পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন। তবে দীর্ঘমেয়াদে এভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব নয় বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
তাদের মতে, দ্রুত প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক উদ্যোগ প্রয়োজন।
এখন সবার অপেক্ষা সমাধানের
সীমান্তে আটকে ১২ জন মানুষের জীবন এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে ঝুলে আছে। তারা জানেন না শেষ পর্যন্ত কোথায় তাদের ঠাঁই হবে। শিশুদের ভবিষ্যৎ, পরিবারের নিরাপত্তা এবং নাগরিকত্বের প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত।
তাদের একটাই আবেদন—দ্রুত একটি মানবিক সমাধান।
প্রচণ্ড গরম, অসুস্থ শিশু এবং সীমাহীন অনিশ্চয়তার মধ্যে কাটানো প্রতিটি ঘণ্টা তাদের জন্য আরও কষ্টের হয়ে উঠছে। তাই সীমান্তের এই মানবিক সংকট দ্রুত সমাধান হবে—এমন প্রত্যাশাই এখন সবার।

























