ব্রাজিলের বিপক্ষে বিশ্বকাপের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে শুরু থেকেই চমক দেখিয়েছিল মরক্কো। কিক-অফের কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তারা ইচ্ছাকৃতভাবে বল মাঠের বাইরে পাঠিয়ে দেয়। প্রথম দেখায় এটি ভুল মনে হলেও বাস্তবে ছিল একটি পরিকল্পিত কৌশলের অংশ।
মরক্কোর এই পরিকল্পনার লক্ষ্য ছিল ম্যাচের শুরুতেই ব্রাজিলকে নিজেদের অর্ধে বল নিয়ে খেলতে বাধ্য করা। এরপর দ্রুত প্রেসিংয়ের মাধ্যমে তাদের ওপর চাপ তৈরি করা। ইউরোপের বেশ কয়েকটি শীর্ষ ক্লাব বর্তমানে এই কৌশল ব্যবহার করে থাকে।
আধুনিক ফুটবলে হাই প্রেসিং এখন অত্যন্ত কার্যকর একটি অস্ত্র হিসেবে বিবেচিত হয়। বিশেষ করে যেসব দল প্রতিপক্ষের ডিফেন্সের কাছাকাছি বল পুনরুদ্ধার করতে চায়, তারা এই পদ্ধতিকে গুরুত্ব দেয়। মরক্কোও সেই পথেই হাঁটার চেষ্টা করেছিল।
ব্রাজিলের মতো বল দখলে দক্ষ দলের বিপক্ষে সরাসরি রক্ষণাত্মক অবস্থানে না গিয়ে মরক্কো শুরুতেই আগ্রাসী মনোভাব দেখায়। তারা চেয়েছিল ব্রাজিলের ডিফেন্ডারদের ভুল করতে বাধ্য করতে। সেই সুযোগ থেকে দ্রুত আক্রমণে যাওয়ার পরিকল্পনাও ছিল তাদের।
গ্রুপো গ্লোবোর বিশ্লেষক ও ধারাভাষ্যকার রদ্রিগো কুতিনিও ম্যাচ চলাকালীন এই কৌশলের ব্যাখ্যা দেন। তাঁর মতে, এটি আধুনিক ফুটবলে ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠা একটি কৌশলগত পদ্ধতি। অনেক কোচ এখন পরিকল্পিতভাবে ম্যাচের শুরুতে এমন পরিস্থিতি তৈরি করেন।
কুতিনিও বলেন, প্রতিপক্ষ যদি খুব সংগঠিত রক্ষণ নিয়ে খেলে, তাহলে তাদের বক্সের সামনে সুযোগ তৈরি করা কঠিন হয়ে যায়। কারণ তখন ২৫ থেকে ৩০ মিটারের ভেতরে প্রায় পুরো দল অবস্থান করে। সেই জায়গায় আক্রমণভাগের জন্য ফাঁকা স্পেস খুঁজে পাওয়া সহজ নয়।
এই কারণেই কিছু দল ইচ্ছাকৃতভাবে বল ছেড়ে দিয়ে প্রতিপক্ষকে সামনে আসতে উৎসাহিত করে। এরপর উচ্চচাপে প্রেসিং চালিয়ে দ্রুত বল কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এতে ম্যাচের গতি ও অবস্থান বদলে যায়।
ইউরোপের শীর্ষ ক্লাবগুলোর মধ্যে বিশেষ করে পিএসজি এবং আর্সেনাল বিভিন্ন ম্যাচে এই কৌশল ব্যবহার করেছে। তারা প্রতিপক্ষের বিল্ড-আপ ভেঙে দিয়ে দ্রুত আক্রমণে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করে। মরক্কোও ব্রাজিলের বিপক্ষে সেই একই ধারণা কাজে লাগাতে চেয়েছিল।
তবে পরিকল্পনা থাকলেও সেটি বাস্তবায়ন সবসময় সহজ হয় না। ব্রাজিলের অভিজ্ঞ খেলোয়াড়রা শুরুতেই পরিস্থিতি বুঝে দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখান। ফলে মরক্কোর তৈরি করা ফাঁদ পুরোপুরি কার্যকর হতে পারেনি।
কিক-অফের পর বল বাইরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ব্রাজিল দ্রুত থ্রো-ইন নেয়। ডিফেন্ডার রজার ইবানেজ এত দ্রুত বল খেলায় ফেরান যে মরক্কোর আক্রমণভাগের খেলোয়াড়রা প্রেসিংয়ের জন্য নির্ধারিত অবস্থানে পৌঁছাতে পারেননি।
পরিস্থিতি বুঝে অধিনায়ক মার্কিনিওসও সময় নষ্ট না করে বল সামনে এগিয়ে দেন। এর ফলে ব্রাজিল নিজেদের অর্ধে আটকে না থেকে দ্রুত চাপমুক্ত হতে সক্ষম হয়। মরক্কোর প্রথম প্রেসিং ট্র্যাপ সেখানেই ভেঙে যায়।
ম্যাচের ওই মুহূর্তটি ছোট হলেও কৌশলগত দিক থেকে ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মরক্কো শুরুতেই যে চাপ সৃষ্টি করতে চেয়েছিল, তা সফল হলে ম্যাচের ছন্দ ভিন্ন হতে পারত। ব্রাজিলের ডিফেন্ডাররা অবশ্য সেই সুযোগ দেয়নি।
আধুনিক ফুটবলে এমন পরিকল্পিত কৌশল এখন নিয়মিত দেখা যায়। শুধুমাত্র বল দখল নয়, কখন বল ছেড়ে দিতে হবে এবং কখন চাপ বাড়াতে হবে—এসব বিষয়ও ম্যাচের ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে।
মরক্কো শেষ পর্যন্ত তাদের প্রথম পরিকল্পনায় সফল না হলেও ম্যাচজুড়ে তারা শৃঙ্খলাপূর্ণ ফুটবল খেলেছে। ব্রাজিলের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে সাহসী কৌশল গ্রহণ করাও তাদের আত্মবিশ্বাসের প্রমাণ।
বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে এমন ট্যাকটিক্যাল লড়াই দর্শকদের জন্যও বাড়তি আকর্ষণ তৈরি করে। মরক্কোর পরিকল্পিত প্রেসিং এবং ব্রাজিলের দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে দিয়েছে, আধুনিক ফুটবলে একটি ছোট সিদ্ধান্তও ম্যাচের গতিপথ বদলে দিতে পারে।























