প্রাচীন মানুষের পদচিহ্ন বিশ্লেষণ করে ১৪ লাখ বছরেরও বেশি পুরোনো মানব আত্মীয়দের জীবনযাপন সম্পর্কে নতুন তথ্য পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। কেনিয়ার লেক টারকানার তীরে সংরক্ষিত এই জীবাশ্ম পদচিহ্নগুলো শুধু তাদের শারীরিক গঠনই নয়, বরং দলবদ্ধভাবে চলাফেরা এবং সামাজিক আচরণেরও গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ দিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও কেনিয়ার একদল গবেষকের যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, এই পদচিহ্নগুলো Paranthropus boisei নামের বিলুপ্ত মানব আত্মীয়ের। গবেষণার ফলাফল সম্প্রতি বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী Proceedings of the National Academy of Sciences (PNAS)-এ প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষকদের মতে, এই প্রাচীন মানুষের পদচিহ্ন প্রথম ১৯৭৮ সালে কেনিয়ার উত্তরাঞ্চলে আবিষ্কৃত হলেও পরবর্তী কয়েক দশকে আরও খননের মাধ্যমে একই স্থানে মোট ২১টি পদচিহ্ন শনাক্ত করা হয়েছে। এসব চিহ্ন অন্তত আটজন ব্যক্তির, যাদের বেশির ভাগই ছিল প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ।
লেক টারকানার আশপাশের আগ্নেয় ছাইয়ের স্তর বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হয়েছেন, পদচিহ্নগুলোর বয়স প্রায় ১৪ লাখ ৩০ হাজার বছর। সেই সময় এলাকাটি ছিল জলাভূমি ও হ্রদবেষ্টিত, যেখানে জলহস্তী, কুমির, হাতি, হরিণসহ নানা প্রাণীর পাশাপাশি দুটি প্রাচীন মানব প্রজাতি—Paranthropus boisei এবং Homo erectus—একই পরিবেশে বসবাস করত।
গবেষণায় আরও জানা গেছে, পদচিহ্নগুলোর আকার বিজ্ঞানীদের বিস্মিত করেছে। এতদিন ধারণা করা হতো, Paranthropus boisei আকারে Homo erectus-এর তুলনায় অনেক ছোট ছিল। কিন্তু নতুন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই প্রজাতির সদস্যদের উচ্চতা প্রায় ১.৮ মিটার (প্রায় ৬ ফুট) পর্যন্ত হতে পারত এবং ওজন ছিল প্রায় ৭৫ কেজি।
বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, একই সময়ে একই অঞ্চলে কাছাকাছি দেহের গঠনের দুটি ভিন্ন মানব প্রজাতির বসবাস মানব বিবর্তনের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যোগ করেছে। এটি দেখায় যে প্রাচীন মানব আত্মীয়দের জীবনযাপন সম্পর্কে প্রচলিত অনেক ধারণা নতুন করে মূল্যায়ন করার প্রয়োজন হতে পারে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে এই প্রাচীন মানুষের পদচিহ্ন থেকে। গবেষকদের মতে, আটজনের যে দলটি একসঙ্গে চলছিল, তাদের অধিকাংশই ছিল প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ। এতে ধারণা করা হচ্ছে, Paranthropus boisei-এর পুরুষ সদস্যরা কখনও কখনও দলবদ্ধভাবে চলাফেরা করত। গবেষকদের ভাষ্য, বিপজ্জনক পরিবেশে নিরাপত্তার জন্য তারা একে অপরের উপস্থিতি সহ্য করত, যদিও প্রজনন মৌসুমে প্রতিযোগিতাও থাকতে পারে।
গবেষকরা বলছেন, জীবাশ্ম হাড় বা দাঁত থেকে শারীরিক গঠন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া গেলেও পদচিহ্ন একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। এটি জানায়, তারা কীভাবে হাঁটত, কতজন একসঙ্গে চলত এবং কী ধরনের পরিবেশে বাস করত।
লেক টারকানার পূর্ব তীরে ইতোমধ্যে শত শত প্রাচীন পদচিহ্ন আবিষ্কৃত হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এক লক্ষ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন সময়ে এসব পদচিহ্ন কাদামাটিতে তৈরি হয়ে পরে প্রাকৃতিকভাবে সংরক্ষিত হয়েছে।
গবেষণা দলের সদস্যরা চলতি বছরের শেষ দিকে আবারও কেনিয়ায় ফিরবেন। তাদের আশা, নতুন খননের মাধ্যমে আরও প্রাচীন মানুষের পদচিহ্ন এবং জীবাশ্ম আবিষ্কার হবে, যা মানব বিবর্তনের ইতিহাস সম্পর্কে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আনবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেনিয়ার লেক টারকানা অঞ্চল বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৃতাত্ত্বিক গবেষণাক্ষেত্র। এখানে প্রতিটি নতুন আবিষ্কার মানবজাতির উৎপত্তি, বিবর্তন এবং প্রাচীন সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানকে আরও সমৃদ্ধ করছে।



























