ঢাকা ১২:৫১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২০ অগাস্ট ২০২৬, ৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মহাকাশের মিনি ফ্রিজে তৈরি হচ্ছে পদার্থের পঞ্চম অবস্থা

  • ডেস্ক নিউজ
  • Update Time : ১১:৫০:৩৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬
  • ৫০৫

পরম শূন্যের কাছাকাছি তাপমাত্রায় পরমাণুর বিশেষ আচরণ পর্যবেক্ষণ করছেন গবেষকরা। | ছবি: সংগৃহীত

মহাকাশে পদার্থের পঞ্চম অবস্থা নিয়ে নতুন দিগন্তের গবেষণা শুরু করেছে NASA। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে থাকা একটি মিনি-ফ্রিজ আকারের কোয়ান্টাম ল্যাব আপগ্রেড করার পর বিজ্ঞানীরা এখন এমন পরিবেশে পরমাণুর আচরণ পর্যবেক্ষণ করছেন, যা পৃথিবীতে তৈরি করা অত্যন্ত কঠিন।

NASA-র Cold Atom Laboratory নামের এই বিশেষ ল্যাবটি আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে ২০১৮ সাল থেকে কাজ করছে। সম্প্রতি এর চতুর্থ বড় আপগ্রেড সম্পন্ন হয়েছে। নতুন প্রযুক্তির সাহায্যে বিজ্ঞানীরা পরমাণুগুলোকে পরম শূন্যের কাছাকাছি তাপমাত্রায় নিয়ে গিয়ে তাদের অস্বাভাবিক কোয়ান্টাম আচরণ আরও স্পষ্টভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারছেন।

পরম শূন্য হলো প্রায় মাইনাস ২৭৩ দশমিক ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা। এটি এমন একটি সীমা, যেখানে পরমাণুর গতিশক্তি প্রায় সর্বনিম্ন পর্যায়ে চলে আসে। এই পরিস্থিতিতে সাধারণ পৃথিবীর পরিবেশে দেখা যায় না এমন নানা কোয়ান্টাম বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পেতে শুরু করে।

NASA জানিয়েছে, ল্যাবটিতে লেজার প্রযুক্তি ব্যবহার করে রুবিডিয়াম ও পটাশিয়ামের মতো গ্যাসকে অত্যন্ত কম তাপমাত্রায় ঠান্ডা করা হয়। তখন পরমাণুগুলো Bose-Einstein condensate নামে বিশেষ একটি অবস্থায় প্রবেশ করতে পারে। এই অবস্থায় বিপুলসংখ্যক পরমাণু অনেকটা একক তরঙ্গের মতো আচরণ করে।

এই কারণেই পদার্থের পঞ্চম অবস্থা নিয়ে গবেষণাটি এত গুরুত্বপূর্ণ। কঠিন, তরল, গ্যাস ও প্লাজমার বাইরে Bose-Einstein condensate-কে পদার্থের একটি বিশেষ পঞ্চম অবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এতে পরমাণুগুলোর কোয়ান্টাম বৈশিষ্ট্য তুলনামূলক বড় পরিসরে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়।

পৃথিবীর তুলনায় আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের কম মাধ্যাকর্ষণ এই গবেষণাকে আরও কার্যকর করে তুলেছে। মাধ্যাকর্ষণের প্রভাব কম থাকায় আল্ট্রাকোল্ড পরমাণুর তরঙ্গ দীর্ঘ সময় ধরে বিস্তৃত ও বিকশিত হতে পারে। ফলে বিজ্ঞানীরা অত্যন্ত সূক্ষ্ম কোয়ান্টাম পরিবর্তন পরিমাপের সুযোগ পাচ্ছেন।

NASA-র Cold Atom Laboratory-র সর্বশেষ আপগ্রেডে পরমাণুর মেঘ ধরে রাখার জন্য নতুন ধরনের ম্যাগনেটিক ট্র্যাপ, উন্নত পরমাণু উৎস এবং আরও ভালো পরিমাপের ব্যবস্থা যুক্ত করা হয়েছে। এসব পরিবর্তনের ফলে গবেষকরা আগের চেয়ে আরও নির্ভুলভাবে আল্ট্রাকোল্ড পদার্থের আচরণ বিশ্লেষণ করতে পারবেন।

এই গবেষণার লক্ষ্য শুধু পদার্থবিজ্ঞানের মৌলিক রহস্য বোঝা নয়। ভবিষ্যতের অত্যন্ত নির্ভুল নেভিগেশন, সময় নির্ধারণ ও মাধ্যাকর্ষণ পরিমাপের প্রযুক্তি তৈরিতেও এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকতে পারে। এমনকি ভবিষ্যতে চাঁদে GPS ছাড়াই নভোচারীদের অবস্থান নির্ধারণে এই প্রযুক্তি কাজে লাগতে পারে বলে NASA আশা করছে।

পৃথিবীর বাইরের পরিবেশে কোয়ান্টাম প্রযুক্তি পরীক্ষা করার আরেকটি বড় সুবিধা হলো দীর্ঘ সময় ধরে সূক্ষ্ম পরিমাপের সুযোগ। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এসব পরীক্ষা ভবিষ্যতে মহাকাশভিত্তিক কোয়ান্টাম সেন্সর এবং আরও উন্নত নেভিগেশন প্রযুক্তির পথ তৈরি করতে পারে।

NASA-র বিজ্ঞানীদের মতে, কোয়ান্টাম বিজ্ঞানের প্রথম বিপ্লব থেকেই লেজার, মোবাইল ফোন ও MRI-এর মতো প্রযুক্তির বিকাশ হয়েছে। এখন বড় আকারের কোয়ান্টাম অবস্থাকে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে দ্বিতীয় ধরনের কোয়ান্টাম বিপ্লবের দিকে এগোচ্ছে বিজ্ঞান।

নতুন আপগ্রেডের সরঞ্জামগুলো ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে পাঠানো হয়। এরপর সেগুলো স্থাপন ও চালু করা হয়েছে এবং ইতোমধ্যে উন্নতমানের পরিমাপও শুরু হয়েছে।

অর্থাৎ, পদার্থের পঞ্চম অবস্থা নিয়ে NASA-র এই গবেষণা শুধু মহাকাশে নতুন এক ধরনের পদার্থ পর্যবেক্ষণের চেষ্টা নয়। এর মাধ্যমে মহাবিশ্বের মৌলিক নিয়ম, কোয়ান্টাম পদার্থের আচরণ এবং ভবিষ্যতের অত্যন্ত নির্ভুল প্রযুক্তি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

মহাকাশের মিনি ফ্রিজে তৈরি হচ্ছে পদার্থের পঞ্চম অবস্থা

Update Time : ১১:৫০:৩৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬

মহাকাশে পদার্থের পঞ্চম অবস্থা নিয়ে নতুন দিগন্তের গবেষণা শুরু করেছে NASA। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে থাকা একটি মিনি-ফ্রিজ আকারের কোয়ান্টাম ল্যাব আপগ্রেড করার পর বিজ্ঞানীরা এখন এমন পরিবেশে পরমাণুর আচরণ পর্যবেক্ষণ করছেন, যা পৃথিবীতে তৈরি করা অত্যন্ত কঠিন।

NASA-র Cold Atom Laboratory নামের এই বিশেষ ল্যাবটি আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে ২০১৮ সাল থেকে কাজ করছে। সম্প্রতি এর চতুর্থ বড় আপগ্রেড সম্পন্ন হয়েছে। নতুন প্রযুক্তির সাহায্যে বিজ্ঞানীরা পরমাণুগুলোকে পরম শূন্যের কাছাকাছি তাপমাত্রায় নিয়ে গিয়ে তাদের অস্বাভাবিক কোয়ান্টাম আচরণ আরও স্পষ্টভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারছেন।

পরম শূন্য হলো প্রায় মাইনাস ২৭৩ দশমিক ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা। এটি এমন একটি সীমা, যেখানে পরমাণুর গতিশক্তি প্রায় সর্বনিম্ন পর্যায়ে চলে আসে। এই পরিস্থিতিতে সাধারণ পৃথিবীর পরিবেশে দেখা যায় না এমন নানা কোয়ান্টাম বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পেতে শুরু করে।

NASA জানিয়েছে, ল্যাবটিতে লেজার প্রযুক্তি ব্যবহার করে রুবিডিয়াম ও পটাশিয়ামের মতো গ্যাসকে অত্যন্ত কম তাপমাত্রায় ঠান্ডা করা হয়। তখন পরমাণুগুলো Bose-Einstein condensate নামে বিশেষ একটি অবস্থায় প্রবেশ করতে পারে। এই অবস্থায় বিপুলসংখ্যক পরমাণু অনেকটা একক তরঙ্গের মতো আচরণ করে।

এই কারণেই পদার্থের পঞ্চম অবস্থা নিয়ে গবেষণাটি এত গুরুত্বপূর্ণ। কঠিন, তরল, গ্যাস ও প্লাজমার বাইরে Bose-Einstein condensate-কে পদার্থের একটি বিশেষ পঞ্চম অবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এতে পরমাণুগুলোর কোয়ান্টাম বৈশিষ্ট্য তুলনামূলক বড় পরিসরে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়।

পৃথিবীর তুলনায় আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের কম মাধ্যাকর্ষণ এই গবেষণাকে আরও কার্যকর করে তুলেছে। মাধ্যাকর্ষণের প্রভাব কম থাকায় আল্ট্রাকোল্ড পরমাণুর তরঙ্গ দীর্ঘ সময় ধরে বিস্তৃত ও বিকশিত হতে পারে। ফলে বিজ্ঞানীরা অত্যন্ত সূক্ষ্ম কোয়ান্টাম পরিবর্তন পরিমাপের সুযোগ পাচ্ছেন।

NASA-র Cold Atom Laboratory-র সর্বশেষ আপগ্রেডে পরমাণুর মেঘ ধরে রাখার জন্য নতুন ধরনের ম্যাগনেটিক ট্র্যাপ, উন্নত পরমাণু উৎস এবং আরও ভালো পরিমাপের ব্যবস্থা যুক্ত করা হয়েছে। এসব পরিবর্তনের ফলে গবেষকরা আগের চেয়ে আরও নির্ভুলভাবে আল্ট্রাকোল্ড পদার্থের আচরণ বিশ্লেষণ করতে পারবেন।

এই গবেষণার লক্ষ্য শুধু পদার্থবিজ্ঞানের মৌলিক রহস্য বোঝা নয়। ভবিষ্যতের অত্যন্ত নির্ভুল নেভিগেশন, সময় নির্ধারণ ও মাধ্যাকর্ষণ পরিমাপের প্রযুক্তি তৈরিতেও এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকতে পারে। এমনকি ভবিষ্যতে চাঁদে GPS ছাড়াই নভোচারীদের অবস্থান নির্ধারণে এই প্রযুক্তি কাজে লাগতে পারে বলে NASA আশা করছে।

পৃথিবীর বাইরের পরিবেশে কোয়ান্টাম প্রযুক্তি পরীক্ষা করার আরেকটি বড় সুবিধা হলো দীর্ঘ সময় ধরে সূক্ষ্ম পরিমাপের সুযোগ। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এসব পরীক্ষা ভবিষ্যতে মহাকাশভিত্তিক কোয়ান্টাম সেন্সর এবং আরও উন্নত নেভিগেশন প্রযুক্তির পথ তৈরি করতে পারে।

NASA-র বিজ্ঞানীদের মতে, কোয়ান্টাম বিজ্ঞানের প্রথম বিপ্লব থেকেই লেজার, মোবাইল ফোন ও MRI-এর মতো প্রযুক্তির বিকাশ হয়েছে। এখন বড় আকারের কোয়ান্টাম অবস্থাকে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে দ্বিতীয় ধরনের কোয়ান্টাম বিপ্লবের দিকে এগোচ্ছে বিজ্ঞান।

নতুন আপগ্রেডের সরঞ্জামগুলো ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে পাঠানো হয়। এরপর সেগুলো স্থাপন ও চালু করা হয়েছে এবং ইতোমধ্যে উন্নতমানের পরিমাপও শুরু হয়েছে।

অর্থাৎ, পদার্থের পঞ্চম অবস্থা নিয়ে NASA-র এই গবেষণা শুধু মহাকাশে নতুন এক ধরনের পদার্থ পর্যবেক্ষণের চেষ্টা নয়। এর মাধ্যমে মহাবিশ্বের মৌলিক নিয়ম, কোয়ান্টাম পদার্থের আচরণ এবং ভবিষ্যতের অত্যন্ত নির্ভুল প্রযুক্তি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।