র্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ ২০২৬ সালের অন্যতম আলোচিত মহাজাগতিক ঘটনা হতে যাচ্ছে। আগামী ১২ আগস্ট চাঁদ পৃথিবী ও সূর্যের মাঝখানে এসে সূর্যের উজ্জ্বল অংশ সম্পূর্ণ ঢেকে দেবে। ফলে নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় দিনের আলো সাময়িকভাবে কমে গিয়ে কয়েক মিনিটের জন্য তৈরি হবে রাতের মতো এক অনন্য পরিবেশ। NASA-এর তথ্য অনুযায়ী, পূর্ণগ্রাসের মূল পথ গ্রিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড, উত্তর রাশিয়া, আটলান্টিক মহাসাগর, স্পেন এবং পর্তুগালের একটি ছোট অংশের ওপর দিয়ে যাবে।
এই গ্রহণের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো, সবাই পূর্ণগ্রাস দেখতে পারবেন না। পৃথিবীর যে সরু অঞ্চলের ওপর দিয়ে চাঁদের গাঢ় ছায়া বা ‘umbra’ যাবে, কেবল সেখানকার মানুষই সূর্যকে পুরোপুরি চাঁদের আড়ালে দেখতে পারবেন। অন্যদিকে ইউরোপ, উত্তর আফ্রিকা, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলসহ আরও বিস্তৃত এলাকায় আংশিক সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে।
পূর্ণগ্রাসের পথের মধ্যে রয়েছে গ্রিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড, উত্তর রাশিয়া, স্পেন ও পর্তুগালের একটি ছোট অংশ। NASA-এর হিসাবে স্পেনের বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় সময় সন্ধ্যার দিকে পূর্ণগ্রাস দেখা যাবে। আইসল্যান্ডের রাজধানী রেইকিয়াভিকে পূর্ণগ্রাস শুরু হবে স্থানীয় সময় বিকেল ৫টা ৪৮ মিনিটে। স্পেনের লিওনে পূর্ণগ্রাস শুরু হবে রাত ৮টা ২৮ মিনিটে।
আংশিক গ্রহণের দৃশ্যও কম আকর্ষণীয় হবে না। লন্ডনে সূর্যের প্রায় ৯১ শতাংশ, প্যারিসে ৯২ শতাংশ এবং বার্লিনে প্রায় ৮৫ শতাংশ অংশ চাঁদের আড়ালে চলে যাবে। উত্তর আফ্রিকার আলজিয়ার্সে প্রায় ৯৬ শতাংশ এবং কাসাব্লাঙ্কায় প্রায় ৮৭ শতাংশ সূর্য ঢাকা পড়বে। তবে এসব জায়গায় পূর্ণগ্রাস দেখা যাবে না।
উত্তর আমেরিকার কয়েকটি এলাকাতেও আংশিক সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে। কানাডার সেন্ট জনসে সূর্যের প্রায় ৫৩ শতাংশ অংশ ঢাকা পড়তে পারে। মন্ট্রিলে প্রায় ১৮ শতাংশ এবং টরন্টোতে প্রায় ৮ শতাংশ গ্রহণ দেখা যাবে। যুক্তরাষ্ট্রের কিছু উত্তরাঞ্চলেও আংশিক গ্রহণ দেখা যাবে।
বাংলাদেশের জন্য অবশ্য এই মহাজাগতিক ঘটনা সরাসরি দেখার সুযোগ নেই। পূর্ণগ্রাসের মূল পথ বাংলাদেশ থেকে অনেক দূরে। তাই দেশের আকাশে ১২ আগস্ট এই গ্রহণের পূর্ণগ্রাস পর্যায় দেখা যাবে না। তবে মহাকাশপ্রেমীরা NASA-এর অনলাইন সম্প্রচার বা বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ঘটনাটি অনুসরণ করতে পারবেন।
পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ কেন এত বিশেষ? এর মূল কারণ হলো চাঁদ যখন সূর্যের উজ্জ্বল চাকতি পুরোপুরি ঢেকে দেয়, তখন সূর্যের বাইরের বায়ুমণ্ডল বা করোনা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সাধারণ সময়ে সূর্যের প্রচণ্ড উজ্জ্বলতার কারণে করোনা সরাসরি দেখা কঠিন। কিন্তু পূর্ণগ্রাসের কয়েক মুহূর্তে এটি পর্যবেক্ষণের অসাধারণ সুযোগ তৈরি হয়। NASA জানিয়েছে, এই গ্রহণকে ঘিরে বিজ্ঞানীরা সূর্য ও পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের ওপরও গবেষণা চালাবেন।
এই গ্রহণের সর্বোচ্চ মোটগ্রাস সময় হবে ২ মিনিট ১৮ সেকেন্ড। অর্থাৎ পৃথিবীর কোনো নির্দিষ্ট স্থান থেকে সূর্য পুরোপুরি চাঁদের আড়ালে থাকার সময় খুবই অল্প। তবে এই কয়েক মিনিটই বিজ্ঞানী ও আকাশপ্রেমীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। NASA-এর গবেষকরা এমনকি উচ্চগতির WB-57 বিমানের সাহায্যে চাঁদের ছায়াকে অনুসরণ করে করোনা পর্যবেক্ষণের পরিকল্পনাও করেছেন।
তবে সূর্যগ্রহণ দেখার সময় নিরাপত্তা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আংশিক গ্রহণের সময় খালি চোখে সূর্যের দিকে তাকানো নিরাপদ নয়। সাধারণ সানগ্লাস ব্যবহার করেও সূর্য দেখা উচিত নয়। নিরাপদভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য অনুমোদিত solar viewing glasses বা উপযুক্ত সৌর ফিল্টার ব্যবহার করতে হবে। NASA-ও আংশিক গ্রহণের সময় নিরাপদ চোখের সুরক্ষা ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছে।
পূর্ণগ্রাসের সময় একটি বিশেষ ব্যতিক্রম রয়েছে। চাঁদ যখন সূর্যের উজ্জ্বল অংশ পুরোপুরি ঢেকে দেয়, কেবল সেই অতি সংক্ষিপ্ত মোটগ্রাস পর্যায়েই সরাসরি দেখা সম্ভব। কিন্তু তার আগে ও পরে যখন সূর্যের কোনো উজ্জ্বল অংশ দেখা যায়, তখন অবশ্যই নিরাপদ সৌরচশমা ব্যবহার করতে হবে।
এই মহাজাগতিক ঘটনাকে ঘিরে শুধু সাধারণ মানুষের আগ্রহ নয়, বিজ্ঞানীদেরও ব্যাপক প্রস্তুতি রয়েছে। NASA-এর গবেষণা দল উচ্চ-উচ্চতার বিমান ও বৈজ্ঞানিক বেলুন ব্যবহার করে গ্রহণের সময় সূর্যের করোনা এবং পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করবে। অর্থাৎ ১২ আগস্টের এই ঘটনা শুধু চোখ ধাঁধানো দৃশ্যই নয়, বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ একটি সুযোগ।
তাই পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ ২০২৬ নিয়ে বিশ্বজুড়ে এখন থেকেই তৈরি হয়েছে ব্যাপক আগ্রহ। গ্রিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড, স্পেন ও উত্তর রাশিয়ার নির্দিষ্ট অঞ্চলের মানুষ পাবেন পূর্ণগ্রাস দেখার সবচেয়ে বিশেষ সুযোগ। আর ইউরোপ, আফ্রিকা ও উত্তর আমেরিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষ দেখতে পারবেন আংশিক গ্রহণ। ১২ আগস্ট আকাশের দিকে তাকানোর আগে শুধু মনে রাখতে হবে, মহাজাগতিক দৃশ্য যতই সুন্দর হোক, চোখের নিরাপত্তার সঙ্গে কোনো আপস করা যাবে না।




























