ফ্রান্সের দাবানল নিয়ে এবার নতুন করে আলোচনায় এসেছে আগুনের উৎস ও দায় নির্ধারণের বিষয়টি। ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ইচ্ছাকৃতভাবে কিংবা দুর্ঘটনাবশত আগুন লাগানোর অভিযোগে এখন পর্যন্ত ৪২০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে ১৬৬ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক। বিপুলসংখ্যক গ্রেপ্তারের তথ্য প্রকাশের পর অবশ্য তদন্তের মান ও অভিযোগের ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আইনজীবী ও সংবাদমাধ্যমের একাংশ।
আইনজীবী মুরিয়েল গেস্তার মতে, এত বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করার বিষয়টি উদ্বেগ তৈরি করছে। তাঁর আশঙ্কা, তদন্ত শেষে অনেকের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত নাও হতে পারে। ফরাসি সংবাদপত্র লে মন্ডও প্রশ্ন তুলেছে, এত অল্প সময়ের মধ্যে পুলিশ প্রতিটি ঘটনার তদন্ত কতটা গভীরভাবে করতে পেরেছে। বিশেষ করে কোনো আগুন ইচ্ছাকৃতভাবে লাগানো হয়েছে, নাকি অসাবধানতাবশত আগুনের সূত্রপাত হয়েছে—এই পার্থক্য নির্ধারণের বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্ব পেয়েছে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
তবে বোর্দোর প্রসিকিউটর রেনো গোদেল কঠোর অবস্থানের পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, বর্তমান আবহাওয়ায় বনাঞ্চলে সামান্য অসতর্কতাও ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। শুকনো পরিবেশ, দীর্ঘস্থায়ী খরা ও তীব্র তাপমাত্রার মধ্যে ফেলে দেওয়া একটি সিগারেটের অবশিষ্টাংশ কিংবা বনাঞ্চলে করা বারবিকিউ থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। পরে বাতাসের কারণে সেই ছোট আগুন মুহূর্তেই বড় আকার নিতে পারে। তাই দুর্ঘটনাজনিত আগুনের ক্ষেত্রেও দায় নির্ধারণ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
ফ্রান্সের দাবানল কীভাবে শুরু হয়েছে, তা খুঁজে বের করাও তদন্তকারীদের জন্য বেশ কঠিন কাজ। আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর প্রথমে পুড়ে যাওয়া এলাকার সীমা নির্ধারণ করা হয়। এরপর আগুন যেদিক থেকে ছড়িয়েছে, তার বিপরীত দিকে এগিয়ে গিয়ে সম্ভাব্য উৎস চিহ্নিত করার চেষ্টা করেন তদন্তকারীরা। তদন্ত কর্মকর্তা এরিক ডুফায়ের মতে, বাতাসের গতি তুলনামূলক কম থাকলে আগুনে পুড়ে যাওয়া এলাকার আকৃতি অনেক সময় ইংরেজি ‘ভি’ অক্ষরের মতো দেখা যায়। সেই চিহ্ন অনুসরণ করেই আগুনের সম্ভাব্য শুরুর জায়গা নির্ধারণ করা হয়।
আগুন লাগানোর পেছনে উদ্দেশ্যও সব ক্ষেত্রে এক নয় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ মিশেল লেজুয়ের মতে, আগুনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের মোটামুটি তিন ভাগে দেখা যায়—অসতর্ক ব্যক্তি, আর্থিক বা অন্য কোনো সুবিধা পাওয়ার উদ্দেশ্যে আগুন লাগানো ব্যক্তি এবং পাইরোম্যানিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি। তবে পাইরোম্যানিয়া অত্যন্ত বিরল মানসিক সমস্যা এবং এটি শনাক্ত করাও সহজ নয়। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে দমকলকর্মীদের বিরুদ্ধেও ইচ্ছাকৃতভাবে আগুন লাগানোর অভিযোগ উঠেছে। আইনজীবী গেস্তার মতে, কেউ কেউ পরে উদ্ধারকারী হিসেবে পরিচিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকেও এমন কাজ করতে পারেন। স্বেচ্ছাসেবী দমকলকর্মীদের ক্ষেত্রে আর্থিক লাভও সম্ভাব্য উদ্দেশ্য হতে পারে বলে আলোচনা রয়েছে।
গ্রেপ্তার ও তদন্ত নিয়ে বিতর্ক চললেও ফ্রান্সের দাবানল ঝুঁকি এখনো কাটেনি। আবহাওয়ার পূর্বাভাস বলছে, কয়েক দিনের মধ্যেই দেশটিতে নতুন করে তাপপ্রবাহ আঘাত হানতে পারে। এতে শুষ্ক বনাঞ্চলে আগুন ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা আরও বাড়তে পারে। প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বলেছেন, এই মুহূর্তে সমালোচনার চেয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করাই বেশি জরুরি। ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে বন ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পুনর্গঠনের প্রয়োজন হবে। তবে দাবানলে বাড়িঘর, পরিবেশ, পর্যটন, স্থানীয় ব্যবসা ও বায়ুর মান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আগুনের উৎস, প্রতিরোধব্যবস্থা এবং সরকারের প্রস্তুতি নিয়ে ফরাসি জনগণের প্রশ্ন আরও জোরালো হচ্ছে।



























