ঢাকা ১২:৩৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬, ২৩ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
Logo বুধবার দুই জেলার এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত Logo মেসির পেনাল্টি মিসে পিছিয়ে থেকে বিরতিতে গেল আর্জেন্টিনা Logo ছয় মাসে সমুদ্রপথে ইতালি পৌঁছেছেন ৪ হাজারের বেশি বাংলাদেশি Logo বিশ্বকাপে পেনাল্টি মিসের নতুন রেকর্ড মেসির Logo তুরস্কের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ঘোষণা ট্রাম্পের Logo টানা বৃষ্টিতে মিরসরাইয়ের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত, পানিবন্দি শতশত পরিবার Logo ১৬৮ কন্টেইনার পণ্য অনলাইন নিলামে তুলছে চট্টগ্রাম কাস্টমস Logo প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে ৫ বছরের কারাদণ্ড | নতুন আইন পাস Logo সাজেক ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় সব পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ Logo হঠাৎ তীব্র জ্বর? যেসব লক্ষণে বুঝবেন এটি সাধারণ ভাইরাল ফ্লু নাকি ডেঙ্গু

তুরস্কের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ঘোষণা ট্রাম্পের

যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্কের সম্পর্ক নতুন মোড়ে। ছবি: সংগৃহীত

কেন যুক্তরাষ্ট্র তুরস্কের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল?

২০২০ সালে তুরস্ক রাশিয়ার কাছ থেকে এস-৪০০ ট্রায়াম্ফ (S-400 Triumph) আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি ছিল, একই দেশে এস-৪০০ এবং এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান থাকলে এফ-৩৫-এর গোপন প্রযুক্তিগত তথ্য রাশিয়ার হাতে পৌঁছানোর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্র তুরস্ককে এফ-৩৫ কর্মসূচি থেকে বাদ দেয় এবং CAATSA (Countering America’s Adversaries Through Sanctions Act) আইনের আওতায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।

CAATSA কী?

CAATSA হলো ২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রে পাস হওয়া একটি আইন, যার উদ্দেশ্য রাশিয়া, ইরান ও উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে বড় ধরনের প্রতিরক্ষা বা গোয়েন্দা লেনদেনকারী ব্যক্তি বা দেশের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা। এই আইনের আওতায় তুরস্ক প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র ন্যাটো সদস্য, যার ওপর এমন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়েছিল।

এফ-৩৫ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

এফ-৩৫ লাইটনিং–২ বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক পঞ্চম প্রজন্মের স্টিলথ যুদ্ধবিমানগুলোর একটি। এর প্রধান বৈশিষ্ট্য—

  1. রাডারে সহজে ধরা পড়ে না (Stealth Technology)
  2. উন্নত সেন্সর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক যুদ্ধব্যবস্থা
  3. একই সঙ্গে আকাশ, স্থল ও সমুদ্র লক্ষ্যবস্তুতে হামলার সক্ষমতা
  4. ন্যাটো সদস্য দেশগুলোর যৌথ সামরিক অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা

তুরস্কের ভূমিকা

তুরস্ক শুরু থেকেই এফ-৩৫ কর্মসূচির অংশীদার ছিল। দেশটির বিভিন্ন প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান এফ-৩৫-এর শত শত যন্ত্রাংশ তৈরি করত। নিষেধাজ্ঞার পর যুক্তরাষ্ট্র এসব উৎপাদন অন্য দেশে স্থানান্তর করে।

কেন এখন অবস্থান বদলাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র?

বিশ্লেষকদের মতে, কয়েকটি কারণে ওয়াশিংটন-আঙ্কারা সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা চলছে—

  1. ন্যাটোর ভেতরে ঐক্য জোরদার করা।
  2. ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে তুরস্কের কৌশলগত গুরুত্ব বৃদ্ধি।
  3. মধ্যপ্রাচ্য ও কৃষ্ণসাগর অঞ্চলে নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানো।
  4. প্রতিরক্ষা বাণিজ্য সম্প্রসারণ।
  5. চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলায় মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক শক্তিশালী করা।

কংগ্রেসের বাধা

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সমর্থন দিলেও এফ-৩৫ বিক্রি চূড়ান্ত করতে মার্কিন কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন হতে পারে। কংগ্রেসের অনেক সদস্য এখনও তুরস্কের এস-৪০০ ইস্যু, মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং আঞ্চলিক নীতির বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন।

তুরস্ক কী চায়?

আঙ্কারা দীর্ঘদিন ধরে—

  1. CAATSA নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার,
  2. এফ-৩৫ কর্মসূচিতে পুনরায় অন্তর্ভুক্তি,
  3. অথবা ক্ষতিপূরণ হিসেবে বিকল্প যুদ্ধবিমান ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা

দাবি করে আসছে।

ন্যাটোর জন্য এর গুরুত্ব

তুরস্ক ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম স্থলবাহিনীর অধিকারী। দেশটির ভৌগোলিক অবস্থান ইউরোপ, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের সংযোগস্থলে হওয়ায় জোটের নিরাপত্তা কৌশলে তুরস্কের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অর্থনৈতিক প্রভাব

নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হলে—

  1. যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্কের প্রতিরক্ষা বাণিজ্য বাড়তে পারে।
  2. তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্প নতুন বিনিয়োগ পেতে পারে।
  3. যৌথ প্রযুক্তি ও উৎপাদন প্রকল্প পুনরায় চালুর সম্ভাবনা তৈরি হবে।
  4. দুই দেশের সামগ্রিক বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হতে পারে।

ভবিষ্যৎ কী হতে পারে?

বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্পের ঘোষণায় ইতিবাচক বার্তা মিললেও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও এফ-৩৫ বিক্রি বাস্তবায়নের আগে আইনি, কূটনৈতিক এবং রাজনৈতিক কয়েকটি ধাপ অতিক্রম করতে হবে। বিশেষ করে এস-৪০০ ইস্যুর স্থায়ী সমাধান, কংগ্রেসের অনুমোদন এবং যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগ দূর করা—এই তিনটি বিষয়ই ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

তুরস্ক–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের পটভূমি

যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্ক দীর্ঘদিনের ন্যাটো মিত্র হলেও গত এক দশকে সিরিয়া, রাশিয়া, কুর্দি ইস্যু এবং প্রতিরক্ষা নীতিকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্কে একাধিকবার টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছে। এস-৪০০ কেনার সিদ্ধান্ত সেই উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

এস-৪০০ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তি

ওয়াশিংটনের আশঙ্কা, রাশিয়ার তৈরি এস-৪০০ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একই সঙ্গে এফ-৩৫ পরিচালিত হলে যুদ্ধবিমানটির স্টিলথ প্রযুক্তি, রাডার সিগনেচার এবং অন্যান্য সংবেদনশীল তথ্য বিশ্লেষণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। যদিও তুরস্ক বারবার বলেছে, এস-৪০০ ও এফ-৩৫ আলাদা ব্যবস্থায় পরিচালিত হবে এবং এতে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হবে না।

তুরস্কের প্রতিরক্ষা কৌশল

তুরস্ক সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিদেশি অস্ত্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তোলার ওপর জোর দিচ্ছে। দেশটি ইতোমধ্যে—

  1. KAAN নামে নিজস্ব পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান প্রকল্প চালু করেছে।
  2. Bayraktar TB2 ও Akıncı-এর মতো ড্রোন আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করছে।
  3. নিজস্ব যুদ্ধজাহাজ, সাঁজোয়া যান ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনও বাড়িয়েছে।

তবে আধুনিক স্টিলথ যুদ্ধবিমানের সক্ষমতা বাড়াতে এফ-৩৫ এখনও তুরস্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়।

এফ-৩৫ কর্মসূচিতে তুরস্কের অবদান

নিষেধাজ্ঞার আগে তুরস্ক শুধু ক্রেতাই ছিল না, বরং এফ-৩৫ প্রকল্পের শিল্প অংশীদারও ছিল। দেশটির কয়েকটি প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান বিমানটির ফিউজেলাজ, ল্যান্ডিং গিয়ার এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ তৈরি করত। তুরস্ককে কর্মসূচি থেকে বাদ দেওয়ার পর এসব উৎপাদন অন্য দেশগুলোতে স্থানান্তর করা হয়।

ন্যাটোর সামরিক ভারসাম্যে প্রভাব

যদি তুরস্ক আবার এফ-৩৫ পায়, তাহলে ন্যাটোর দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে জোটের বিমান সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হতে পারে। বিশেষ করে কৃষ্ণসাগর, পূর্ব ভূমধ্যসাগর এবং মধ্যপ্রাচ্যে ন্যাটোর সামরিক উপস্থিতি জোরদার হবে।

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে প্রভাব

তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কয়েকটি কৌশলগত কারণে গুরুত্বপূর্ণ—

  1. সিরিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি।
  2. কৃষ্ণসাগর অঞ্চলে রাশিয়ার প্রভাব মোকাবিলা।
  3. ইউক্রেন যুদ্ধের কূটনৈতিক উদ্যোগে তুরস্কের ভূমিকা।
  4. জ্বালানি পরিবহন করিডোরের নিরাপত্তা।
  5. ন্যাটোর অভ্যন্তরীণ ঐক্য বজায় রাখা।

কংগ্রেসের সম্ভাব্য শর্ত

মার্কিন কংগ্রেসের কিছু সদস্য মনে করেন, এফ-৩৫ বিক্রির আগে তুরস্ককে—

  1. এস-৪০০ ব্যবস্থা নিষ্ক্রিয় বা সরিয়ে ফেলতে হতে পারে।
  2. ন্যাটোর নিরাপত্তা মানদণ্ড মেনে চলার নিশ্চয়তা দিতে হতে পারে।
  3. প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

অর্থনৈতিক দিক

নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হলে শুধু প্রতিরক্ষা নয়, দুই দেশের মধ্যে—

  1. বিমান ও মহাকাশ শিল্পে বিনিয়োগ,
  2. প্রযুক্তি সহযোগিতা,
  3. প্রতিরক্ষা উৎপাদন,
  4. বাণিজ্যিক সম্পর্ক

আরও সম্প্রসারিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে—

  1. রাশিয়া বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে, কারণ এস-৪০০ চুক্তি মস্কো-আঙ্কারা সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
  2. ন্যাটো মিত্ররা তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদারের সম্ভাবনা বিবেচনা করবে।
  3. গ্রিসসহ পূর্ব ভূমধ্যসাগরের কিছু দেশ আঞ্চলিক সামরিক ভারসাম্যের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করতে পারে।

সামনে কী হতে পারে?

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের ঘোষণা দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার একটি রাজনৈতিক বার্তা। তবে নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি প্রত্যাহার, এফ-৩৫ বিক্রি চূড়ান্ত করা এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা পুনরায় শুরু করতে এখনও কূটনৈতিক আলোচনা, আইনি প্রক্রিয়া এবং মার্কিন কংগ্রেসের অনুমোদনসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ বাকি রয়েছে। তাই তাৎক্ষণিক পরিবর্তনের পরিবর্তে এটি ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

জনপ্রিয় সংবাদ

বুধবার দুই জেলার এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত

তুরস্কের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ঘোষণা ট্রাম্পের

Update Time : ১০:৫৯:৪৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ জুলাই ২০২৬

কেন যুক্তরাষ্ট্র তুরস্কের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল?

২০২০ সালে তুরস্ক রাশিয়ার কাছ থেকে এস-৪০০ ট্রায়াম্ফ (S-400 Triumph) আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি ছিল, একই দেশে এস-৪০০ এবং এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান থাকলে এফ-৩৫-এর গোপন প্রযুক্তিগত তথ্য রাশিয়ার হাতে পৌঁছানোর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্র তুরস্ককে এফ-৩৫ কর্মসূচি থেকে বাদ দেয় এবং CAATSA (Countering America’s Adversaries Through Sanctions Act) আইনের আওতায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।

CAATSA কী?

CAATSA হলো ২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রে পাস হওয়া একটি আইন, যার উদ্দেশ্য রাশিয়া, ইরান ও উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে বড় ধরনের প্রতিরক্ষা বা গোয়েন্দা লেনদেনকারী ব্যক্তি বা দেশের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা। এই আইনের আওতায় তুরস্ক প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র ন্যাটো সদস্য, যার ওপর এমন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়েছিল।

এফ-৩৫ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

এফ-৩৫ লাইটনিং–২ বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক পঞ্চম প্রজন্মের স্টিলথ যুদ্ধবিমানগুলোর একটি। এর প্রধান বৈশিষ্ট্য—

  1. রাডারে সহজে ধরা পড়ে না (Stealth Technology)
  2. উন্নত সেন্সর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক যুদ্ধব্যবস্থা
  3. একই সঙ্গে আকাশ, স্থল ও সমুদ্র লক্ষ্যবস্তুতে হামলার সক্ষমতা
  4. ন্যাটো সদস্য দেশগুলোর যৌথ সামরিক অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা

তুরস্কের ভূমিকা

তুরস্ক শুরু থেকেই এফ-৩৫ কর্মসূচির অংশীদার ছিল। দেশটির বিভিন্ন প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান এফ-৩৫-এর শত শত যন্ত্রাংশ তৈরি করত। নিষেধাজ্ঞার পর যুক্তরাষ্ট্র এসব উৎপাদন অন্য দেশে স্থানান্তর করে।

কেন এখন অবস্থান বদলাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র?

বিশ্লেষকদের মতে, কয়েকটি কারণে ওয়াশিংটন-আঙ্কারা সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা চলছে—

  1. ন্যাটোর ভেতরে ঐক্য জোরদার করা।
  2. ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে তুরস্কের কৌশলগত গুরুত্ব বৃদ্ধি।
  3. মধ্যপ্রাচ্য ও কৃষ্ণসাগর অঞ্চলে নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানো।
  4. প্রতিরক্ষা বাণিজ্য সম্প্রসারণ।
  5. চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলায় মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক শক্তিশালী করা।

কংগ্রেসের বাধা

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সমর্থন দিলেও এফ-৩৫ বিক্রি চূড়ান্ত করতে মার্কিন কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন হতে পারে। কংগ্রেসের অনেক সদস্য এখনও তুরস্কের এস-৪০০ ইস্যু, মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং আঞ্চলিক নীতির বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন।

তুরস্ক কী চায়?

আঙ্কারা দীর্ঘদিন ধরে—

  1. CAATSA নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার,
  2. এফ-৩৫ কর্মসূচিতে পুনরায় অন্তর্ভুক্তি,
  3. অথবা ক্ষতিপূরণ হিসেবে বিকল্প যুদ্ধবিমান ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা

দাবি করে আসছে।

ন্যাটোর জন্য এর গুরুত্ব

তুরস্ক ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম স্থলবাহিনীর অধিকারী। দেশটির ভৌগোলিক অবস্থান ইউরোপ, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের সংযোগস্থলে হওয়ায় জোটের নিরাপত্তা কৌশলে তুরস্কের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অর্থনৈতিক প্রভাব

নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হলে—

  1. যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্কের প্রতিরক্ষা বাণিজ্য বাড়তে পারে।
  2. তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্প নতুন বিনিয়োগ পেতে পারে।
  3. যৌথ প্রযুক্তি ও উৎপাদন প্রকল্প পুনরায় চালুর সম্ভাবনা তৈরি হবে।
  4. দুই দেশের সামগ্রিক বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হতে পারে।

ভবিষ্যৎ কী হতে পারে?

বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্পের ঘোষণায় ইতিবাচক বার্তা মিললেও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও এফ-৩৫ বিক্রি বাস্তবায়নের আগে আইনি, কূটনৈতিক এবং রাজনৈতিক কয়েকটি ধাপ অতিক্রম করতে হবে। বিশেষ করে এস-৪০০ ইস্যুর স্থায়ী সমাধান, কংগ্রেসের অনুমোদন এবং যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগ দূর করা—এই তিনটি বিষয়ই ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

তুরস্ক–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের পটভূমি

যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্ক দীর্ঘদিনের ন্যাটো মিত্র হলেও গত এক দশকে সিরিয়া, রাশিয়া, কুর্দি ইস্যু এবং প্রতিরক্ষা নীতিকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্কে একাধিকবার টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছে। এস-৪০০ কেনার সিদ্ধান্ত সেই উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

এস-৪০০ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তি

ওয়াশিংটনের আশঙ্কা, রাশিয়ার তৈরি এস-৪০০ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একই সঙ্গে এফ-৩৫ পরিচালিত হলে যুদ্ধবিমানটির স্টিলথ প্রযুক্তি, রাডার সিগনেচার এবং অন্যান্য সংবেদনশীল তথ্য বিশ্লেষণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। যদিও তুরস্ক বারবার বলেছে, এস-৪০০ ও এফ-৩৫ আলাদা ব্যবস্থায় পরিচালিত হবে এবং এতে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হবে না।

তুরস্কের প্রতিরক্ষা কৌশল

তুরস্ক সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিদেশি অস্ত্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তোলার ওপর জোর দিচ্ছে। দেশটি ইতোমধ্যে—

  1. KAAN নামে নিজস্ব পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান প্রকল্প চালু করেছে।
  2. Bayraktar TB2 ও Akıncı-এর মতো ড্রোন আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করছে।
  3. নিজস্ব যুদ্ধজাহাজ, সাঁজোয়া যান ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনও বাড়িয়েছে।

তবে আধুনিক স্টিলথ যুদ্ধবিমানের সক্ষমতা বাড়াতে এফ-৩৫ এখনও তুরস্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়।

এফ-৩৫ কর্মসূচিতে তুরস্কের অবদান

নিষেধাজ্ঞার আগে তুরস্ক শুধু ক্রেতাই ছিল না, বরং এফ-৩৫ প্রকল্পের শিল্প অংশীদারও ছিল। দেশটির কয়েকটি প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান বিমানটির ফিউজেলাজ, ল্যান্ডিং গিয়ার এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ তৈরি করত। তুরস্ককে কর্মসূচি থেকে বাদ দেওয়ার পর এসব উৎপাদন অন্য দেশগুলোতে স্থানান্তর করা হয়।

ন্যাটোর সামরিক ভারসাম্যে প্রভাব

যদি তুরস্ক আবার এফ-৩৫ পায়, তাহলে ন্যাটোর দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে জোটের বিমান সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হতে পারে। বিশেষ করে কৃষ্ণসাগর, পূর্ব ভূমধ্যসাগর এবং মধ্যপ্রাচ্যে ন্যাটোর সামরিক উপস্থিতি জোরদার হবে।

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে প্রভাব

তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কয়েকটি কৌশলগত কারণে গুরুত্বপূর্ণ—

  1. সিরিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি।
  2. কৃষ্ণসাগর অঞ্চলে রাশিয়ার প্রভাব মোকাবিলা।
  3. ইউক্রেন যুদ্ধের কূটনৈতিক উদ্যোগে তুরস্কের ভূমিকা।
  4. জ্বালানি পরিবহন করিডোরের নিরাপত্তা।
  5. ন্যাটোর অভ্যন্তরীণ ঐক্য বজায় রাখা।

কংগ্রেসের সম্ভাব্য শর্ত

মার্কিন কংগ্রেসের কিছু সদস্য মনে করেন, এফ-৩৫ বিক্রির আগে তুরস্ককে—

  1. এস-৪০০ ব্যবস্থা নিষ্ক্রিয় বা সরিয়ে ফেলতে হতে পারে।
  2. ন্যাটোর নিরাপত্তা মানদণ্ড মেনে চলার নিশ্চয়তা দিতে হতে পারে।
  3. প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

অর্থনৈতিক দিক

নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হলে শুধু প্রতিরক্ষা নয়, দুই দেশের মধ্যে—

  1. বিমান ও মহাকাশ শিল্পে বিনিয়োগ,
  2. প্রযুক্তি সহযোগিতা,
  3. প্রতিরক্ষা উৎপাদন,
  4. বাণিজ্যিক সম্পর্ক

আরও সম্প্রসারিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে—

  1. রাশিয়া বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে, কারণ এস-৪০০ চুক্তি মস্কো-আঙ্কারা সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
  2. ন্যাটো মিত্ররা তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদারের সম্ভাবনা বিবেচনা করবে।
  3. গ্রিসসহ পূর্ব ভূমধ্যসাগরের কিছু দেশ আঞ্চলিক সামরিক ভারসাম্যের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করতে পারে।

সামনে কী হতে পারে?

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের ঘোষণা দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার একটি রাজনৈতিক বার্তা। তবে নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি প্রত্যাহার, এফ-৩৫ বিক্রি চূড়ান্ত করা এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা পুনরায় শুরু করতে এখনও কূটনৈতিক আলোচনা, আইনি প্রক্রিয়া এবং মার্কিন কংগ্রেসের অনুমোদনসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ বাকি রয়েছে। তাই তাৎক্ষণিক পরিবর্তনের পরিবর্তে এটি ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।