বাংলাদেশি অভিবাসী আবারও সমুদ্রপথে ইতালিতে পৌঁছানোর সংখ্যায় শীর্ষে উঠে এসেছে। ইতালির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৭ জুলাই পর্যন্ত ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে দেশটিতে পৌঁছেছেন ১৪ হাজার ৬২৩ জন অভিবাসী। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি, ৪ হাজার ৩১৪ জনই বাংলাদেশি। অর্থাৎ মোট আগত অভিবাসীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশই বাংলাদেশ থেকে গেছেন। যদিও সামগ্রিকভাবে ইতালিতে অভিবাসীর সংখ্যা আগের দুই বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
সোমবার প্রকাশিত হালনাগাদ পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বাংলাদেশি অভিবাসী সংখ্যার পর দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে সোমালিয়া, যেখান থেকে ১ হাজার ৭০২ জন ইতালিতে পৌঁছেছেন। এরপর রয়েছে সুদান (১,৩৭১), পাকিস্তান (১,১৮৫), আলজেরিয়া (১,১০৬), মিশর (৯৩৬), ইরিত্রিয়া (৬৬২), টিউনিশিয়া (৬২৬), মালি (৩১০), নাইজেরিয়া (২৯১), আইভরি কোস্ট (২১৬), ইথিওপিয়া (১৯৯), ইরান (১৮৩), দক্ষিণ সুদান (১৮০) এবং গিনি (১৭৯)। এছাড়া আরও ১ হাজার ১৬৩ জনের জাতীয়তা শনাক্তের প্রক্রিয়া চলছে।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৬ সালে সমুদ্রপথে ইতালিতে অভিবাসীর সংখ্যা আগের দুই বছরের তুলনায় অনেক কম। ২০২৫ সালের একই সময়ে ইতালিতে পৌঁছেছিলেন ৩১ হাজার ৪৩০ জন অভিবাসী, যা চলতি বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ জোরদার, মানবপাচারবিরোধী অভিযান এবং উত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সমন্বিত পদক্ষেপের কারণে এই সংখ্যা কমেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে বাংলাদেশি অভিবাসী এখনও সংখ্যার দিক থেকে শীর্ষে থাকায় বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নত কর্মসংস্থান, উচ্চ আয়ের প্রত্যাশা এবং ইউরোপে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগের আশায় অনেক বাংলাদেশি ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথ বেছে নিচ্ছেন। সাধারণত তারা প্রথমে লিবিয়ায় পৌঁছে সেখান থেকে মানবপাচারকারী চক্রের মাধ্যমে ছোট নৌকায় ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালির ল্যাম্পেদুসা বা দক্ষিণ উপকূলে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। এই যাত্রা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং প্রতিবছর অনেক মানুষ দুর্ঘটনা, ডুবে যাওয়া বা নিখোঁজ হওয়ার শিকার হন।
বাংলাদেশি অভিবাসী প্রবাহ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অভিবাসন বিশ্লেষকেরা। তাদের মতে, নিরাপদ ও বৈধ অভিবাসনের সুযোগ বাড়ানো না গেলে অনিয়মিত অভিবাসনের প্রবণতা কমানো কঠিন হবে। একই সঙ্গে মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া এবং বিদেশে কর্মসংস্থান বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি। বাংলাদেশ সরকারও বিভিন্ন সময়ে বৈধ উপায়ে বিদেশে যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে আসছে এবং অবৈধ পথে যাত্রা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে।
ইতালি ইউরোপে বাংলাদেশিদের অন্যতম বড় গন্তব্য। দেশটিতে দীর্ঘদিন ধরে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশি বৈধভাবে বসবাস ও কাজ করছেন। তারা মূলত নির্মাণ, কৃষি, রেস্তোরাঁ, লজিস্টিকস, পরিচ্ছন্নতা, উৎপাদনশিল্প এবং ছোট ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। এই প্রতিষ্ঠিত প্রবাসী কমিউনিটির কারণেও নতুন অভিবাসীদের ইতালির প্রতি আগ্রহ বেশি থাকে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক অনিয়মিত অভিবাসী বৈধ ভিসা না পাওয়ায় বা দ্রুত ইউরোপে পৌঁছানোর আশায় মানবপাচারকারী চক্রের প্রলোভনে পড়েন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা প্রথমে বৈধ বা অবৈধভাবে উত্তর আফ্রিকার কোনো দেশে যান। এরপর সেখান থেকে ঝুঁকিপূর্ণ নৌকায় ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালিতে প্রবেশের চেষ্টা করেন।
ভূমধ্যসাগরের সেন্ট্রাল মেডিটেরেনিয়ান রুট বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক অভিবাসন পথগুলোর একটি। প্রতিবছর এই পথে নৌকাডুবি, নিখোঁজ ও প্রাণহানির বহু ঘটনা ঘটে। অতিরিক্ত যাত্রী, অনিরাপদ নৌযান এবং প্রতিকূল আবহাওয়া এ ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, মানবপাচারকারী চক্র প্রায়ই ইউরোপে উচ্চ বেতন, দ্রুত বৈধ কাগজপত্র এবং স্থায়ী বসবাসের প্রতিশ্রুতি দিয়ে মানুষকে প্রলুব্ধ করে। বাস্তবে অনেক অভিবাসী পথে প্রতারণা, নির্যাতন, মুক্তিপণ দাবি এবং দীর্ঘ সময় আটকে থাকার মতো ঝুঁকির মুখে পড়েন।
সর্বশেষ পরিসংখ্যান একদিকে ইতালিতে সামগ্রিক অভিবাসীর সংখ্যা কমার ইঙ্গিত দিলেও অন্যদিকে বাংলাদেশি অভিবাসী সংখ্যার শীর্ষ অবস্থান নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং বৈধ অভিবাসনের পথ সহজ করা গেলে ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথে ইউরোপমুখী মানুষের সংখ্যা কমানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়িয়ে মানবপাচার চক্র দমনে আরও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।


























