বর্ষাকালে হঠাৎ জ্বর এলেই সেটিকে সাধারণ ভাইরাল ফ্লু ভেবে অবহেলা করা উচিত নয় বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ এই সময়েই ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়ে যায় এবং শুরুতে ডেঙ্গু ও ভাইরাল জ্বরের লক্ষণ অনেকটাই একরকম হওয়ায় রোগ শনাক্তে দেরি হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু নির্দিষ্ট উপসর্গের মাধ্যমে ডেঙ্গুর ঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব। তাই জ্বরের সঙ্গে অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো জরুরি।
বর্ষা মৌসুমে একদিকে যেমন সর্দি-কাশি ও ভাইরাল সংক্রমণ বেড়ে যায়, অন্যদিকে জমে থাকা পানিতে জন্ম নেওয়া এডিস মশার কারণে ডেঙ্গুর সংক্রমণও বাড়তে থাকে। ফলে জ্বর দেখা দিলে অনেকেই বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন—এটি কি সাধারণ ভাইরাল জ্বর, নাকি ডেঙ্গু?
ভারতের হিন্দুস্তান টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হেমাটোপ্যাথোলজিস্ট ডা. কুনাল সেহগাল বলেন, ডেঙ্গু এবং সাধারণ ভাইরাল জ্বরকে এক মনে করলে বিপদ বাড়তে পারে। কারণ ডেঙ্গু দ্রুত জটিল আকার ধারণ করতে পারে, তাই শুরু থেকেই লক্ষণ সম্পর্কে সচেতন থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ডেঙ্গু ও ভাইরাল জ্বরের মিল থাকা লক্ষণ
শুরুর দিকে দুই ধরনের জ্বরেই কিছু সাধারণ উপসর্গ দেখা যায়। যেমন—
- হঠাৎ জ্বর আসা
- শরীর দুর্বল লাগা
- প্রচণ্ড ক্লান্তি
- শরীর ব্যথা
- অবসাদ অনুভব করা
এই লক্ষণগুলো থাকলেই যে ডেঙ্গু হয়েছে, এমন নয়। আবার এগুলোকে সাধারণ ভাইরাল ভেবে অবহেলা করাও ঠিক হবে না।
যেসব লক্ষণ ডেঙ্গুর দিকে ইঙ্গিত দেয়
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গুর উপসর্গ সাধারণ ভাইরাল জ্বরের তুলনায় অনেক বেশি তীব্র হয়ে থাকে। নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে—
- ১০২ থেকে ১০৪ ডিগ্রি পর্যন্ত তীব্র জ্বর
- প্রচণ্ড মাথাব্যথা
- চোখের পেছনে ব্যথা
- তীব্র পেশি ও অস্থিসন্ধিতে ব্যথা
- বমি বমি ভাব বা বারবার বমি
- শরীরে লালচে র্যাশ বা দাগ
যেসব লক্ষণ দেখা দিলে দেরি করা যাবে না
ডা. কুনাল সেহগালের মতে, কিছু ক্ষেত্রে ডেঙ্গু গুরুতর রূপ নিতে পারে। তখন নিচের উপসর্গগুলো দেখা দিতে পারে—
- মাড়ি থেকে রক্ত পড়া
- নাক দিয়ে রক্ত বের হওয়া
- শরীরে কালচে দাগ বা রক্তক্ষরণের চিহ্ন
- তীব্র পেটব্যথা
- অতিরিক্ত দুর্বলতা বা অস্থিরতা
এসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে। কারণ এগুলো গুরুতর ডেঙ্গুর লক্ষণ হতে পারে।
কখন ডেঙ্গু পরীক্ষা করাবেন?
চিকিৎসকদের পরামর্শ, বর্ষাকালে জ্বর হলে সময় নষ্ট না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
জ্বরের প্রথম কয়েক দিনের মধ্যেই এনএস১ (NS1) অ্যান্টিজেন পরীক্ষা করলে ডেঙ্গু শনাক্ত করা সম্ভব। প্রয়োজনে চিকিৎসক পিসিআর (PCR) পরীক্ষারও পরামর্শ দিতে পারেন।
অন্যদিকে, জ্বর কয়েক দিন ধরে থাকলে বা পরে পরীক্ষা করার প্রয়োজন হলে ডেঙ্গু অ্যান্টিবডি পরীক্ষা (IgM/IgG) করা হতে পারে। কোন পরীক্ষা কখন করা হবে, তা রোগীর অবস্থা বিবেচনা করে চিকিৎসকই নির্ধারণ করবেন।
ভাইরাল ফ্লু ও ডেঙ্গুর মধ্যে প্রধান পার্থক্য
| ভাইরাল ফ্লু | ডেঙ্গু |
|---|---|
| সাধারণত কয়েক দিনের মধ্যে উপসর্গ কমতে শুরু করে | উপসর্গ দ্রুত তীব্র হতে পারে |
| সর্দি, কাশি ও গলাব্যথা বেশি দেখা যায় | চোখের পেছনে ব্যথা ও র্যাশ বেশি দেখা যায় |
| রক্তক্ষরণের ঝুঁকি খুব কম | রক্তক্ষরণ ও প্লাটিলেট কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে |
| সাধারণ বিশ্রামে ভালো হওয়ার প্রবণতা | চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন হতে পারে |
জ্বর হলে কী করবেন?
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী—
- পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন।
- প্রচুর পানি ও তরল খাবার পান করুন।
- চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ খাবেন না।
- জ্বর ২-৩ দিনের বেশি থাকলে পরীক্ষা করান।
- রক্তক্ষরণ, তীব্র পেটব্যথা বা শ্বাসকষ্ট হলে জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে যান।
সচেতন থাকলেই ঝুঁকি কমবে
বর্ষাকালে জ্বরকে কখনোই হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। সাধারণ ভাইরাল সংক্রমণ ও ডেঙ্গুর শুরুতে উপসর্গ মিল থাকলেও ডেঙ্গু দ্রুত জটিল হয়ে উঠতে পারে। তাই জ্বরের সঙ্গে অস্বাভাবিক কোনো লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। সময়মতো পরীক্ষা, সঠিক চিকিৎসা এবং সচেতন থাকাই ডেঙ্গুর জটিলতা এড়ানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

























