ঢাকা ০৫:৫৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬, ১৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মা-বাবার বার্ধক্য কেন এত কষ্ট দেয়? জানালেন মনোবিদরা

মা-বাবার বয়স বাড়তে দেখা জীবনের সবচেয়ে নীরব, অথচ সবচেয়ে গভীর অনুভূতিগুলোর একটি।

মা-বাবার বয়স বাড়তে দেখলে অনেক সন্তানের মনেই অদ্ভুত এক কষ্ট, ভয় এবং শূন্যতার অনুভূতি তৈরি হয়। মনোবিদদের মতে, এটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক একটি মানসিক প্রতিক্রিয়া। কারণ ছোটবেলা থেকে যাঁদের সবচেয়ে শক্তিশালী, নির্ভরযোগ্য ও সাহসী মানুষ হিসেবে দেখে বড় হওয়া, তাঁদের ধীরে ধীরে বয়সের ভারে বদলে যেতে দেখা সহজ নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অনুভূতি দুর্বলতার নয়; বরং বাবা-মায়ের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও আবেগেরই বহিঃপ্রকাশ।

কেন এমন অনুভূতি হয়?

শৈশব থেকেই বাবা-মা সন্তানের জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয় হয়ে থাকেন। যেকোনো সমস্যায় তাঁদের উপস্থিতি নিরাপত্তার অনুভূতি দেয়। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যখন তাঁদের চলাফেরা ধীর হয়ে আসে, স্বাস্থ্যগত সমস্যা দেখা দেয় কিংবা তাঁরা সন্তানের সহায়তার ওপর নির্ভর করতে শুরু করেন, তখন সেই পরিচিত ছবিটি বদলে যায়।

এই পরিবর্তন অনেকের কাছেই সহজে মেনে নেওয়া সম্ভব হয় না। ফলে মন ভারী হয়ে যায় এবং এক ধরনের মানসিক অস্বস্তি তৈরি হয়।

মনোবিদদের ব্যাখ্যা কী?

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অনুভূতির একটি মনস্তাত্ত্বিক নাম রয়েছে—‘অস্পষ্ট হারানোর অনুভূতি’ (Ambiguous Loss)

এর অর্থ হলো—

  • মানুষটি এখনও আমাদের সঙ্গেই আছেন।
  • কিন্তু বয়সের কারণে তাঁর শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন ঘটছে।
  • আগের মতো সবকিছু করতে পারছেন না।
  • সম্পর্কের ভূমিকা ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে অনেকের মধ্যে একসঙ্গে কয়েকটি অনুভূতি কাজ করতে পারে।

যেমন—

  • দুঃখ
  • ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয়
  • অপরাধবোধ
  • অসহায়ত্ব
  • মানসিক শূন্যতা

মনোবিদরা বলছেন, এসব অনুভূতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক এবং অনেক সন্তানের মধ্যেই দেখা যায়।

কেন এই কষ্ট আরও গভীর হয়?

বাবা-মায়ের বয়স বাড়তে দেখা আমাদের একটি কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়—তাঁরা চিরদিন আমাদের সঙ্গে থাকবেন না।

এই উপলব্ধি থেকেই অনেকের মনে ছোটবেলার নানা স্মৃতি ফিরে আসে।

যেমন—

  • বাবার শাসন
  • মায়ের আদর
  • অসুস্থ হলে সারারাত জেগে থাকা
  • স্কুলে পৌঁছে দেওয়া
  • জীবনের প্রতিটি কঠিন সময়ে পাশে থাকা

এসব স্মৃতি নতুন করে আবেগপ্রবণ করে তোলে।

সম্পর্কের নতুন অধ্যায়

জীবনের নিয়মেই সময়ের সঙ্গে সম্পর্কের দায়িত্ব বদলে যায়।

একসময়—

  • বাবা-মা সন্তানের হাত ধরে হাঁটতে শেখান।
  • সন্তানের সব প্রয়োজন পূরণ করেন।
  • নিরাপত্তা ও সাহস জোগান।

আর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে—

  • সন্তানেরাই বাবা-মায়ের সবচেয়ে বড় ভরসা হয়ে ওঠেন।
  • তাঁদের চিকিৎসা, যত্ন ও মানসিক সঙ্গের দায়িত্ব নেন।
  • প্রয়োজনের সময় পাশে থাকেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এটিই জীবনের স্বাভাবিক ও সুন্দর একটি পরিবর্তন।

এই সময়ে কী করা উচিত?

মনোবিদরা বলছেন, বাবা-মায়ের সঙ্গে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত মূল্যবান। তাই যতটা সম্ভব তাঁদের সময় দেওয়া উচিত।

কিছু সহজ অভ্যাস সম্পর্ককে আরও সুন্দর করতে পারে—

  • প্রতিদিন কিছু সময় তাঁদের সঙ্গে গল্প করুন।
  • মন দিয়ে তাঁদের কথা শুনুন।
  • প্রয়োজন হলে চিকিৎসা ও দৈনন্দিন কাজে সহায়তা করুন।
  • ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে কার্পণ্য করবেন না।
  • পরিবারের সঙ্গে ছোট ছোট আনন্দের মুহূর্ত তৈরি করুন।

সময় থাকতেই ভালোবাসা প্রকাশ করুন

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাবা-মায়ের বার্ধক্য আমাদের জীবনের একটি স্বাভাবিক বাস্তবতা। এই পরিবর্তনকে ভয় না পেয়ে তাঁদের পাশে থাকা, সময় দেওয়া এবং ভালোবাসা প্রকাশ করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সময় একবার চলে গেলে তা আর ফিরে আসে না। জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতিগুলো তৈরি হয় প্রিয় মানুষদের সঙ্গে কাটানো এই ছোট ছোট মুহূর্ত থেকেই।

জনপ্রিয় সংবাদ

মা-বাবার বার্ধক্য কেন এত কষ্ট দেয়? জানালেন মনোবিদরা

Update Time : ০৩:৩৫:৩৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬

মা-বাবার বয়স বাড়তে দেখলে অনেক সন্তানের মনেই অদ্ভুত এক কষ্ট, ভয় এবং শূন্যতার অনুভূতি তৈরি হয়। মনোবিদদের মতে, এটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক একটি মানসিক প্রতিক্রিয়া। কারণ ছোটবেলা থেকে যাঁদের সবচেয়ে শক্তিশালী, নির্ভরযোগ্য ও সাহসী মানুষ হিসেবে দেখে বড় হওয়া, তাঁদের ধীরে ধীরে বয়সের ভারে বদলে যেতে দেখা সহজ নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অনুভূতি দুর্বলতার নয়; বরং বাবা-মায়ের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও আবেগেরই বহিঃপ্রকাশ।

কেন এমন অনুভূতি হয়?

শৈশব থেকেই বাবা-মা সন্তানের জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয় হয়ে থাকেন। যেকোনো সমস্যায় তাঁদের উপস্থিতি নিরাপত্তার অনুভূতি দেয়। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যখন তাঁদের চলাফেরা ধীর হয়ে আসে, স্বাস্থ্যগত সমস্যা দেখা দেয় কিংবা তাঁরা সন্তানের সহায়তার ওপর নির্ভর করতে শুরু করেন, তখন সেই পরিচিত ছবিটি বদলে যায়।

এই পরিবর্তন অনেকের কাছেই সহজে মেনে নেওয়া সম্ভব হয় না। ফলে মন ভারী হয়ে যায় এবং এক ধরনের মানসিক অস্বস্তি তৈরি হয়।

মনোবিদদের ব্যাখ্যা কী?

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অনুভূতির একটি মনস্তাত্ত্বিক নাম রয়েছে—‘অস্পষ্ট হারানোর অনুভূতি’ (Ambiguous Loss)

এর অর্থ হলো—

  • মানুষটি এখনও আমাদের সঙ্গেই আছেন।
  • কিন্তু বয়সের কারণে তাঁর শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন ঘটছে।
  • আগের মতো সবকিছু করতে পারছেন না।
  • সম্পর্কের ভূমিকা ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে অনেকের মধ্যে একসঙ্গে কয়েকটি অনুভূতি কাজ করতে পারে।

যেমন—

  • দুঃখ
  • ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয়
  • অপরাধবোধ
  • অসহায়ত্ব
  • মানসিক শূন্যতা

মনোবিদরা বলছেন, এসব অনুভূতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক এবং অনেক সন্তানের মধ্যেই দেখা যায়।

কেন এই কষ্ট আরও গভীর হয়?

বাবা-মায়ের বয়স বাড়তে দেখা আমাদের একটি কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়—তাঁরা চিরদিন আমাদের সঙ্গে থাকবেন না।

এই উপলব্ধি থেকেই অনেকের মনে ছোটবেলার নানা স্মৃতি ফিরে আসে।

যেমন—

  • বাবার শাসন
  • মায়ের আদর
  • অসুস্থ হলে সারারাত জেগে থাকা
  • স্কুলে পৌঁছে দেওয়া
  • জীবনের প্রতিটি কঠিন সময়ে পাশে থাকা

এসব স্মৃতি নতুন করে আবেগপ্রবণ করে তোলে।

সম্পর্কের নতুন অধ্যায়

জীবনের নিয়মেই সময়ের সঙ্গে সম্পর্কের দায়িত্ব বদলে যায়।

একসময়—

  • বাবা-মা সন্তানের হাত ধরে হাঁটতে শেখান।
  • সন্তানের সব প্রয়োজন পূরণ করেন।
  • নিরাপত্তা ও সাহস জোগান।

আর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে—

  • সন্তানেরাই বাবা-মায়ের সবচেয়ে বড় ভরসা হয়ে ওঠেন।
  • তাঁদের চিকিৎসা, যত্ন ও মানসিক সঙ্গের দায়িত্ব নেন।
  • প্রয়োজনের সময় পাশে থাকেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এটিই জীবনের স্বাভাবিক ও সুন্দর একটি পরিবর্তন।

এই সময়ে কী করা উচিত?

মনোবিদরা বলছেন, বাবা-মায়ের সঙ্গে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত মূল্যবান। তাই যতটা সম্ভব তাঁদের সময় দেওয়া উচিত।

কিছু সহজ অভ্যাস সম্পর্ককে আরও সুন্দর করতে পারে—

  • প্রতিদিন কিছু সময় তাঁদের সঙ্গে গল্প করুন।
  • মন দিয়ে তাঁদের কথা শুনুন।
  • প্রয়োজন হলে চিকিৎসা ও দৈনন্দিন কাজে সহায়তা করুন।
  • ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে কার্পণ্য করবেন না।
  • পরিবারের সঙ্গে ছোট ছোট আনন্দের মুহূর্ত তৈরি করুন।

সময় থাকতেই ভালোবাসা প্রকাশ করুন

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাবা-মায়ের বার্ধক্য আমাদের জীবনের একটি স্বাভাবিক বাস্তবতা। এই পরিবর্তনকে ভয় না পেয়ে তাঁদের পাশে থাকা, সময় দেওয়া এবং ভালোবাসা প্রকাশ করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সময় একবার চলে গেলে তা আর ফিরে আসে না। জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতিগুলো তৈরি হয় প্রিয় মানুষদের সঙ্গে কাটানো এই ছোট ছোট মুহূর্ত থেকেই।