রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলা ভেটেরিনারি হাসপাতালে দীর্ঘদিন ধরে চলছে চরম জনবল সংকট। অনুমোদিত ১১টি পদের মধ্যে ৬টি শূন্য থাকায় ব্যাহত হচ্ছে সরকারি পশু চিকিৎসাসেবা। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, হাসপাতালের ভেটেরিনারি সার্জনের পদটি প্রায় ছয় বছর ধরে খালি, ফলে প্রতিদিন চিকিৎসা নিতে আসা অসুস্থ গবাদিপশুর সেবা দিতে হচ্ছে একজন ভেটেরিনারি কম্পাউন্ডারকে।
এর ফলে উপজেলার হাজারো কৃষক ও খামারি কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বিশেষ করে জটিল রোগে আক্রান্ত গবাদিপশুর চিকিৎসা দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে হাসপাতালের সীমিত জনবলকে।
প্রতিদিন ৫০টির বেশি পশুর চিকিৎসা:
উপজেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, দৌলতদিয়া-খুলনা মহাসড়কের পাশে অবস্থিত এই হাসপাতালটি গোয়ালন্দ উপজেলার একমাত্র সরকারি পশু চিকিৎসাকেন্দ্র। প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৬০টি গরু, ছাগল, ভেড়া ও অন্যান্য গবাদিপশু এখানে চিকিৎসা নিতে আসে।
সাম্প্রতিক সময়ে অতিরিক্ত গরম, বর্ষাকালের আর্দ্রতা এবং ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগের প্রকোপ বাড়ায় রোগীর সংখ্যাও বেড়েছে। বিশেষ করে লাম্পি স্কিন ডিজিজ, নিউমোনিয়া, পাতলা পায়খানা, জ্বর, ক্ষুরা রোগ, চর্মরোগ ও পরজীবী সংক্রমণে আক্রান্ত পশুর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
গুরুত্বপূর্ণ ছয়টি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য:
প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্যমতে, হাসপাতালের অনুমোদিত ১১টি পদের মধ্যে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র পাঁচজন।
শূন্য থাকা পদগুলো হলো—
- ভেটেরিনারি সার্জন – ১টি
- উপজেলা লাইভস্টক অ্যাসিস্ট্যান্ট (ইউএলএ) – ১টি
- ফিল্ড অ্যাসিস্ট্যান্ট (এফএ) – ১টি
- অফিস সহায়ক – ১টি
- ভেটেরিনারি ফিল্ড অ্যাসিস্ট্যান্ট (ভিএফএ) – ৩টির মধ্যে ২টি
এ ছাড়া ড্রেসার পদে একজন নিয়োজিত থাকলেও তিনি দীর্ঘদিন ধরে প্রেষণে ঢাকার জাতীয় চিড়িয়াখানায় কর্মরত থাকায় গোয়ালন্দ হাসপাতালে কার্যত ওই পদটিও শূন্য রয়েছে।
কম্পাউন্ডারের ওপরই পুরো চিকিৎসা ব্যবস্থার চাপ:
হাসপাতালে ভেটেরিনারি সার্জন না থাকায় একজন ভেটেরিনারি কম্পাউন্ডারকে রোগ নির্ণয়, প্রাথমিক চিকিৎসা, ইনজেকশন দেওয়া, ওষুধ বিতরণ, টিকা কার্যক্রমে সহযোগিতা এবং খামারিদের পরামর্শ দেওয়ার মতো একাধিক দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।
যদিও তিনি অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন, তবে আইনগত ও পেশাগত সীমাবদ্ধতার কারণে জটিল রোগের চিকিৎসা কিংবা অস্ত্রোপচারের মতো সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
খামারিদের বাড়ছে দুর্ভোগ:
স্থানীয় খামারিরা জানান, সরকারি হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকায় অনেক সময় বাধ্য হয়ে ব্যক্তিগত ভেটেরিনারি চিকিৎসক ডেকে আনতে হয়। এতে কয়েক গুণ বেশি অর্থ ব্যয় হয়।
অনেক কৃষকের অভিযোগ, রাতে পশু অসুস্থ হলে সরকারি কোনো চিকিৎসক পাওয়া যায় না। ফলে সময়মতো চিকিৎসার অভাবে অনেক গাভীর দুধ উৎপাদন কমে যাচ্ছে, গর্ভবতী পশুর জটিলতা বাড়ছে এবং কিছু ক্ষেত্রে মূল্যবান পশু মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে।
একজন খামারি বলেন,
“সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসক থাকলে আমরা কম খরচে ভালো চিকিৎসা পেতাম। এখন কম্পাউন্ডার আন্তরিক হলেও সব ধরনের রোগের চিকিৎসা দেওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়।”
টিকাদান ও কৃত্রিম প্রজনন কার্যক্রমেও প্রভাব:
জনবল সংকটের কারণে শুধু হাসপাতালের চিকিৎসাসেবাই নয়, মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি, কৃত্রিম প্রজনন (এআই), খামার পরিদর্শন, রোগ প্রতিরোধ সচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং জরুরি সেবায়ও প্রভাব পড়ছে।
ফলে অনেক প্রত্যন্ত এলাকার খামারিকে সেবা পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
প্রাণিসম্পদ বিভাগের বক্তব্য:
উপজেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শূন্য পদগুলো পূরণের জন্য একাধিকবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখনো নতুন কোনো নিয়োগ হয়নি।
তাদের ভাষ্য, বর্তমান জনবল দিয়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হলেও ক্রমবর্ধমান রোগীর চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। দ্রুত ভেটেরিনারি সার্জনসহ অন্যান্য শূন্য পদে নিয়োগ দেওয়া হলে চিকিৎসাসেবার মান বাড়বে, মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমও গতিশীল হবে এবং কৃষক-খামারিরা কাঙ্ক্ষিত সরকারি সেবা নিশ্চিতভাবে পাবেন।
দ্রুত নিয়োগের দাবি:
স্থানীয় খামারি, কৃষক ও সচেতন নাগরিকরা বলছেন, গোয়ালন্দের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি উপজেলায় বছরের পর বছর ভেটেরিনারি সার্জনের পদ খালি থাকা গ্রহণযোগ্য নয়। প্রাণিসম্পদ খাত দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়ায় দ্রুত জনবল নিয়োগ দিয়ে হাসপাতালের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম চালু করার দাবি জানিয়েছেন তারা।




























