চোখ দিয়ে বারবার পানি পড়া, চুলকানি বা অস্বস্তি হওয়াকে অনেকেই সাধারণ সমস্যা মনে করেন। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব উপসর্গ অনেক সময় ‘ড্রাই আই’ বা শুষ্ক চোখের লক্ষণ হতে পারে। ভারতের গুড়গাঁওয়ের মারেনগো এশিয়া হাসপাতালের অপথালমোলজি বিভাগের ক্লিনিক্যাল ডিরেক্টর ডা. শিবাল ভরতিয়া জানিয়েছেন, চোখ থেকে অতিরিক্ত পানি পড়া সবসময় চোখে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা থাকার লক্ষণ নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রে এটি চোখের শুষ্কতার প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা দেয়।
বর্তমান সময়ে দীর্ঘক্ষণ কম্পিউটার, ল্যাপটপ ও স্মার্টফোন ব্যবহার, বায়ুদূষণ এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে বেশি সময় কাটানোর কারণে চোখের বিভিন্ন সমস্যা বেড়েছে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলের মানুষের মধ্যে ড্রাই আই ডিজিজ এখন একটি সাধারণ স্বাস্থ্যসমস্যা হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
কেন চোখ দিয়ে পানি পড়ে?
ডা. শিবাল ভরতিয়ার মতে, চোখের উপরিভাগে একটি বিশেষ স্তর থাকে, যাকে টিয়ার ফিল্ম বলা হয়। এটি শুধু পানি নয়, বরং তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান দিয়ে গঠিত—
- তেলের স্তর
- পানির স্তর
- মিউকাস বা শ্লেষ্মার স্তর
এই তিনটি স্তর একসঙ্গে চোখকে আর্দ্র, মসৃণ ও সুরক্ষিত রাখে। কোনো কারণে এই স্তরের ভারসাম্য নষ্ট হলে চোখ মস্তিষ্ককে সংকেত পাঠায়। তখন শরীর জরুরি প্রতিক্রিয়া হিসেবে অতিরিক্ত পানি তৈরি করে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘রিফ্লেক্স টিয়ারিং’ বলা হয়।
ফলে চোখ থেকে পানি ঝরলেও প্রকৃতপক্ষে চোখের শুষ্কতা দূর হয় না। এ কারণেই একজন ব্যক্তি একইসঙ্গে চোখের শুষ্কতা ও অতিরিক্ত পানি পড়ার সমস্যায় ভুগতে পারেন।
কেন বাড়ছে ড্রাই আইয়ের সমস্যা?
বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক জীবনযাত্রার পরিবর্তন এ সমস্যার অন্যতম কারণ।
ড্রাই আইয়ের ঝুঁকি বাড়ায় যেসব বিষয়—
- দীর্ঘ সময় মোবাইল বা কম্পিউটার স্ক্রিন ব্যবহার
- কম চোখের পলক ফেলা
- বায়ুদূষণ
- এসি পরিবেশে দীর্ঘক্ষণ থাকা
- ধুলাবালুর সংস্পর্শে থাকা
- দীর্ঘ যাতায়াত
চোখের পলক ফেলার মাধ্যমে চোখের তেলের স্তর সমানভাবে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকলে স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় তিনগুণ কম পলক ফেলা হয়। ফলে চোখ দ্রুত শুকিয়ে যায় এবং অস্বস্তি তৈরি হয়।
যেসব লক্ষণ অবহেলা করবেন না
চোখের কিছু উপসর্গ দীর্ঘদিন থাকলে তা ড্রাই আইয়ের ইঙ্গিত হতে পারে। যেমন—
- চোখ দিয়ে বারবার পানি পড়া
- চোখে চুলকানি বা জ্বালাপোড়া
- সুই ফোটার মতো অনুভূতি
- দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যাওয়া
- চোখের পলক ফেললে দৃষ্টি আবার পরিষ্কার হওয়া
- বাতাস বা এসির প্রতি অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা
- পর্যাপ্ত ঘুমের পরও চোখ ক্লান্ত লাগা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব লক্ষণ যদি দুই সপ্তাহের বেশি সময় স্থায়ী হয়, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
কী করবেন?
চোখের শুষ্কতা ও পানি পড়ার সমস্যা কমাতে কিছু সহজ অভ্যাস কার্যকর হতে পারে।
প্রতিকারের উপায়
- নিয়মিত চোখের পাতায় গরম সেঁক দিন
- স্ক্রিন ব্যবহারের সময় বিরতি নিন
- সচেতনভাবে বেশি বেশি চোখের পলক ফেলুন
- প্রয়োজন হলে ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ খাবার বা সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করুন
- চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রিজারভেটিভ-মুক্ত লুব্রিকেটিং ড্রপ ব্যবহার করুন
- ধুলাবালি ও দূষণ থেকে চোখকে সুরক্ষিত রাখুন
তবে দীর্ঘদিন সমস্যা থাকলে নিজে থেকে ওষুধ বা কৃত্রিম চোখের ড্রপ ব্যবহার না করে অবশ্যই চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে। প্রয়োজনে চোখের তেলের গ্রন্থির কার্যকারিতা পরীক্ষা করে বিশেষ চিকিৎসাও দেওয়া হতে পারে।
চিকিৎসকদের মতে, চোখ দিয়ে পানি পড়া বা চুলকানিকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। সময়মতো কারণ শনাক্ত করে সঠিক চিকিৎসা নিলে চোখের সুস্থতা দীর্ঘদিন বজায় রাখা সম্ভব।



























