কনসার্টের ভেন্যু সংকটে দেশে নিয়মিত বড় আকারের সংগীত আয়োজন ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। একসময় ঢাকার একাধিক মাঠে নিয়মিত ওপেন এয়ার কনসার্ট হলেও এখন সেসব জায়গার বেশির ভাগই আর ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ফলে শিল্পী, ব্যান্ড ও আয়োজকদের নির্ভর করতে হচ্ছে সীমিত কিছু জায়গার ওপর। তাঁদের মতে, ৫৫ বছরেও দেশে সংগীতের জন্য একটি স্থায়ী মঞ্চ না থাকা হতাশাজনক। সারা বছর কনসার্ট আয়োজন করা যায়—এমন ইনডোর ও আউটডোর ভেন্যু এখন সময়ের দাবি।
একসময় কমলাপুর স্টেডিয়াম, আর্মি স্টেডিয়াম, বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম, মিরপুরের শেরেবাংলা নগর স্টেডিয়াম, গুলশান ইয়ুথ ক্লাব, রাওয়া ক্লাব, ধানমন্ডি মহিলা ক্রীড়া কমপ্লেক্স, মোহাম্মদপুর শারীরিক শিক্ষা কলেজ ও কলাবাগান মাঠে নিয়মিত কনসার্ট হয়েছে। বর্তমানে এসব জায়গার অধিকাংশে বড় সংগীত আয়োজন করা হয় না। ঢাকার বাইরেও একই চিত্র দেখা যায়। চট্টগ্রামের এম এ আজিজ স্টেডিয়ামসহ বিভিন্ন স্থানে একসময় বড় আয়োজন হলেও এখন নিয়মিত কনসার্টের সুযোগ অনেক কম। ফলে বিভাগীয় শহরগুলোতেও স্থায়ী ভেন্যুর প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।
দুই বছর আগেও ঢাকার ৩০০ ফুটসংলগ্ন বসুন্ধরা এক্সপো জোন এবং ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় বড় কনসার্ট অনুষ্ঠিত হতো। কিন্তু ২০২৫ সাল থেকে এক্সপো জোনে আর কোনো কনসার্ট হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। অন্যদিকে, পূর্বাচল ও কিং মাদানী অ্যাভিনিউয়ের কিছু খোলা জায়গায় আয়োজন হলেও নিরাপত্তা নিয়ে আয়োজকদের উদ্বেগ রয়েছে। মাঠের ভাড়া, মঞ্চ, শব্দ ও আলোকসজ্জা, জেনারেটর, নিরাপত্তা এবং শিল্পীদের পারিশ্রমিক মিলিয়ে ব্যয়ও আগের তুলনায় বেড়েছে। এতে নিয়মিত কনসার্ট আয়োজন আর্থিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
মাইলসের সদস্য হামিন আহমেদের মতে, মাঠে কনসার্ট আয়োজন এখন বাংলাদেশের শিল্পীদের কাছে অনেকটা স্বপ্নের মতো হয়ে গেছে। বাংলাদেশ ব্যান্ড মিউজিক অ্যাসোসিয়েশন বা বামবা এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছে বলেও জানান তিনি। ওয়ারফেজের দলনেতা ও বামবার সাধারণ সম্পাদক মনিরুল আলম টিপুর ভাষ্য, পৃষ্ঠপোষক ও আয়োজকদের আগ্রহ থাকলেও পর্যাপ্ত ভেন্যু না থাকায় অনেক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা যায় না। তাঁর মতে, শুধু সংগীতের জন্য এক বা একাধিক স্থায়ী মঞ্চ থাকলে শিল্পী ও দর্শক উভয়ের জন্যই নিয়মিত আয়োজনের সুযোগ তৈরি হবে।
ভেন্যু সংকটের প্রভাব শুধু বড় কনসার্টে সীমাবদ্ধ নেই, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সংগীতচর্চা ও নতুন প্রজন্মের আগ্রহও। আয়োজকদের মতে, ঢাকার পাশাপাশি প্রতিটি বিভাগীয় শহরে অন্তত একটি ইনডোর ও একটি আউটডোর ভেন্যু থাকলে সারা বছর অনুষ্ঠান করা সম্ভব। পাঁচ থেকে সাত হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার ইনডোর এবং ১০ থেকে ২০ হাজার দর্শকের জন্য আউটডোর মঞ্চের প্রয়োজন রয়েছে। বসুন্ধরা এক্সপো জোনের মতো জায়গায় বর্তমানে কনসার্টের বদলে বিয়ে ও বাণিজ্যিক আয়োজন হচ্ছে। এতে সংগীতের জন্য বড় পরিসরের জায়গার সংকট আরও স্পষ্ট হয়েছে।
শিল্পী ও আয়োজকদের প্রস্তাব, শুরুতে ঢাকা ও চট্টগ্রামে স্থায়ী সংগীত ভেন্যু তৈরি করা যেতে পারে। পরে পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য বিভাগীয় শহরেও এমন অবকাঠামো গড়ে তোলা দরকার। এসব জায়গা শুধু কনসার্টের জন্য নয়, বছরজুড়ে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও বিনোদনমূলক আয়োজনের উপযোগী করে তৈরি করা হলে খরচও সামলানো সহজ হবে। হামিন আহমেদ মনে করেন, পাঁচ হাজার দর্শকের ইনডোর ও প্রায় ২০ হাজার দর্শকের আউটডোর মঞ্চ সংগীতাঙ্গনের জন্য কার্যকর হতে পারে। এমন ব্যবস্থা তৈরি হলে কনসার্ট বাড়ার পাশাপাশি নতুন শিল্পী তৈরির সুযোগ, সংগীতচর্চা এবং দেশের সাংস্কৃতিক পরিবেশও আরও সমৃদ্ধ হবে।























