কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে বদলে যাচ্ছে চাকরির বাজারও। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার আগে শিক্ষার্থীদের শুধু বর্তমানের চাহিদা নয়, ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রের কথাও ভাবতে হবে। কারণ আজ যে বিষয়ে পড়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, চার বছর পর স্নাতক শেষ করার সময় সেই বিষয়ের চাকরির বাজার একই রকম নাও থাকতে পারে। তাই ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে পড়ার বিষয় ও ক্যারিয়ার পরিকল্পনা করা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
উচ্চমাধ্যমিকের পর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সময় শিক্ষার্থীদের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন থাকে কোন বিষয়ে পড়বেন, কোন পেশাকে ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার হিসেবে বেছে নেবেন। অনেকের কাছেই মনে হয়, এই একটি সিদ্ধান্তই হয়তো জীবনের পুরো পথ ঠিক করে দেবে। কিন্তু প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের কারণে ক্যারিয়ার বেছে নেওয়ার বিষয়টি এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি ভাবনার হয়ে উঠেছে।
বিশেষ করে এআই মানুষের কাজের ধরন, শেখার পদ্ধতি এমনকি চিন্তাভাবনার ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন আনছে। আজকের অনেক কাজ আগামী দিনে প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে এমন কিছু নতুন পেশারও জন্ম হবে, যেগুলোর কথা এখনো আমরা খুব বেশি জানি না। তাই শুধু একটি নির্দিষ্ট চাকরির কথা মাথায় রেখে বিষয় বেছে নেওয়ার চেয়ে পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা তৈরি করাও জরুরি।
আজ যাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবেন, তাঁদের বেশির ভাগই স্নাতক শেষ করবেন প্রায় চার বছর পর। এই সময়ের মধ্যে কর্মক্ষেত্রে এআইয়ের ব্যবহার আরও বাড়তে পারে। ফলে এমন বিষয় ও দক্ষতার দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন, যেগুলোর ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা রয়েছে এবং প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে নতুনভাবে কাজে লাগানো যায়।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ‘ফিউচার অব জবস রিপোর্ট-২০২৫’ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে ১৭ কোটি নতুন চাকরি তৈরি হতে পারে। একই সময়ে প্রায় সাড়ে ৯ কোটি চাকরি বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অর্থাৎ কিছু প্রচলিত কাজ কমে গেলেও নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। তবে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে সময়ের সঙ্গে প্রয়োজনীয় দক্ষতাও অর্জন করতে হবে।
ইতিহাসবিদ ইউভাল নোয়া হারারি মনে করেন, ভবিষ্যতের চাকরির বাজার কেমন হবে, তা এখন থেকে নিশ্চিত করে বলা কঠিন। আগামী ২০ বা ৩০ বছর পর কোন ধরনের কাজের চাহিদা থাকবে, সেটিও নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। তাই শিক্ষার্থীদের একটি নির্দিষ্ট পেশার ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি রাখা দরকার।
ফিউচার অব জবস রিপোর্টে দ্রুত বাড়তে পারে এমন পেশাগুলোর তালিকাতেও প্রযুক্তিনির্ভর কাজের চাহিদা স্পষ্ট। এর মধ্যে বিগ ডেটা স্পেশালিস্টের চাহিদা ১১০ শতাংশ, ফিনটেক ইঞ্জিনিয়ারের ৯০ শতাংশ এবং এআই ও মেশিন লার্নিং স্পেশালিস্টের ৮২ শতাংশ বাড়তে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া সফটওয়্যার ও অ্যাপ্লিকেশন ডেভেলপার, সিকিউরিটি ম্যানেজমেন্ট স্পেশালিস্ট এবং ডেটা অ্যানালিস্ট ও সায়েন্টিস্টদের চাহিদাও বাড়তে পারে। অর্থাৎ প্রযুক্তি, ডেটা, সফটওয়্যার এবং সাইবার নিরাপত্তার মতো ক্ষেত্রগুলো আগামী দিনের চাকরির বাজারে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তবে শুধু প্রযুক্তিনির্ভর কোনো বিষয়ে পড়লেই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত হবে এমনটা ভাবার কারণ নেই। নিজের আগ্রহ ও সক্ষমতার পাশাপাশি যোগাযোগ, বিশ্লেষণ, সমস্যা সমাধান এবং নতুন কিছু শেখার দক্ষতাও গড়ে তুলতে হবে। কারণ ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রে প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি মানুষের সৃজনশীলতা ও নিজস্ব দক্ষতার গুরুত্বও থাকবে।
তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সময় শুধু ‘কোন বিষয়ে চাকরি বেশি?’এই প্রশ্নে আটকে না থেকে ভাবতে হবে, ‘কোন দক্ষতা আমাকে ভবিষ্যতের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে সাহায্য করবে?’ সময়ের সঙ্গে পেশা বদলাতে পারে, কাজের ধরন পাল্টাতে পারে, এমনকি নতুন পেশারও জন্ম হতে পারে। সেই বাস্তবতা মাথায় রেখে এখন থেকেই শেখার মানসিকতা ও বহুমুখী দক্ষতা গড়ে তোলাই হতে পারে ভবিষ্যতের চাকরির বাজারের জন্য সবচেয়ে ভালো প্রস্তুতি।


























