দুই-তিন বছর ধরে বিশ্বজুড়ে ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ‘স্লিপ ট্যুরিজম’ বা ঘুমকেন্দ্রিক পর্যটন। ভ্রমণে গিয়ে শুধু নতুন জায়গা দেখা নয়, এখন অনেকেই গুরুত্ব দিচ্ছেন ভালো ঘুম ও মানসিক প্রশান্তিকে। ব্যস্ত জীবনের চাপ থেকে কয়েক দিনের জন্য দূরে গিয়ে আরাম করে ঘুমানো ও বিশ্রাম নেওয়াই হয়ে উঠছে অনেকের ছুটির অন্যতম উদ্দেশ্য।
একসময় ভ্রমণে গিয়ে দিনের বেশির ভাগ সময় ঘুমিয়ে কাটানোকে সময় নষ্ট করা বলেই মনে করা হতো। সকাল হলেই বেরিয়ে পড়া, সারা দিন এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ঘোরা, আর রাতে হোটেলে ফিরে ঘুমানো এটাই ছিল সাধারণ ভ্রমণের চিত্র। তবে সময়ের সঙ্গে মানুষের ভ্রমণের অভ্যাস ও চাহিদাতেও এসেছে পরিবর্তন।
দিনভর কাজের চাপ, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার আর নানা ধরনের মানসিক ব্যস্ততায় অনেকেরই ঠিকমতো ঘুম হয় না। ফলে ছুটিতে গিয়ে নতুন নতুন জায়গা দেখার পাশাপাশি শরীর ও মনকে একটু স্বস্তি দেওয়ার ইচ্ছা তৈরি হচ্ছে। আর এই পরিবর্তিত চাহিদার হাত ধরেই জনপ্রিয় হচ্ছে স্লিপ ট্যুরিজম।
স্লিপ ট্যুরিজম মূলত এমন একধরনের ভ্রমণ, যেখানে ভালো ঘুম ও পর্যাপ্ত বিশ্রাম ভ্রমণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। এখানে শুধু দর্শনীয় স্থান ঘুরে বেড়ানোই মুখ্য নয়। বরং ঘুমের মান ভালো করা, মানসিক চাপ কমানো এবং কয়েক দিনের জন্য নিজেকে একটু সময় দেওয়াই থাকে মূল লক্ষ্য।
এ ধরনের ভ্রমণের জন্য অনেকেই এখন এমন হোটেল বা রিট্রিট বেছে নিচ্ছেন, যেখানে ঘুমানোর জন্য শান্ত ও আরামদায়ক পরিবেশ রয়েছে। নিরিবিলি কক্ষ, আরামদায়ক বিছানা, মৃদু আলো, শান্ত পরিবেশসহ নানা সুবিধার ব্যবস্থা থাকে এসব জায়গায়। ফলে ভ্রমণকারীরা বাইরের ব্যস্ততা থেকে দূরে গিয়ে সহজেই বিশ্রামের সুযোগ পান।
কিছু স্লিপ রিট্রিটে আবার ভালো ঘুমের জন্য নানা ধরনের কার্যক্রমের আয়োজন করা হয়। কোথাও মেডিটেশন, যোগব্যায়াম বা শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম থাকে, আবার কোথাও স্পা ও রিলাক্সেশন থেরাপির ব্যবস্থা করা হয়। এসব আয়োজনের উদ্দেশ্য হলো ছুটির সময়টাকে এমনভাবে কাটানো, যাতে ফিরে যাওয়ার সময় শরীর ও মন দুটোই কিছুটা সতেজ লাগে।
ভারতীয় বাজার গবেষণাপ্রতিষ্ঠান এইচটিএফ মার্কেট ইন্টেলিজেন্সের ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে স্লিপ ট্যুরিজমের বাজার ৬৯০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। ২০২৪ থেকে ২০২৮ সালের মধ্যে এই বাজারে আরও প্রায় ৪০০ বিলিয়ন ডলার যোগ হতে পারে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ব্রিটিশ ঘুম ও স্বপ্নবিষয়ক বিশেষজ্ঞ, লেখক ও শিক্ষক চার্লি মর্লের মতে, মানুষ অনেক দিন ধরেই খাবার ও শরীরের সুস্থতার দিকে নজর দিচ্ছেন। শরীরচর্চা ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের পর এখন সুস্থ থাকার ক্ষেত্রে ঘুমও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। আর সেই কারণেই পর্যটনশিল্পেও ঘুমকে ঘিরে নতুন ধরনের সেবা ও আয়োজন দেখা যাচ্ছে।
চার্লি মর্লে মেক্সিকোর তুলুমের নোমাদে হোটেল এবং লন্ডনের কিম্পটন ফিটজরয়সহ বেশ কয়েকটি হোটেলের সঙ্গে ঘুম ও স্বপ্নকেন্দ্রিক বিভিন্ন আয়োজন ও কর্মসূচিতে কাজ করেছেন। তাঁর মতে, হোটেলগুলোও বুঝতে পারছে যে মানুষ এখন ছুটির সময় শুধু ঘোরাঘুরি নয়, ভালোভাবে বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগও খুঁজছেন।
কাজের চাপ কিংবা সন্তানদের দায়িত্ব থেকে কয়েক দিনের জন্য দূরে থাকার সুযোগকে অনেকে এখন শুধু ঘোরাঘুলির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চান না। বরং এই সময়টাকে ভালোভাবে ঘুমানো, মানসিক চাপ কমানো এবং নিজের যত্ন নেওয়ার সুযোগ হিসেবেই দেখছেন। ফলে পর্যটনের জগতেও ‘ভালো ঘুম’ ধীরে ধীরে আলাদা একটি অভিজ্ঞতা হিসেবে জায়গা করে নিচ্ছে।
ভবিষ্যতে স্লিপ ট্যুরিজম আরও জনপ্রিয় হতে পারে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পর্যটকদের এই নতুন চাহিদার কথা মাথায় রেখে হোটেল ও রিসোর্টগুলোও ঘুমের উপযোগী পরিবেশ এবং ওয়েলনেস সেবা বাড়াচ্ছে। অর্থাৎ ভ্রমণ এখন শুধু নতুন জায়গা দেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় কয়েক দিনের ছুটিতে ভালোভাবে ঘুমিয়ে, বিশ্রাম নিয়ে এবং সতেজ হয়ে ফিরে আসাও হতে পারে ভ্রমণের বড় সাফল্য।


























