ঘুম থেকে উঠে হঠাৎ কোমরের ডান পাশে ব্যথা অনুভব করা, দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার পর অস্বস্তি কিংবা হাঁটার সময় ব্যথা—এ ধরনের সমস্যা অনেকেরই হয়ে থাকে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটি পেশিতে টান বা ভুল ভঙ্গিতে কাজ করার কারণে হলেও, কখনও কখনও কিডনির সমস্যা, অ্যাপেন্ডিসাইটিস, স্নায়ুর জটিলতা কিংবা অন্য কোনো গুরুতর রোগেরও ইঙ্গিত হতে পারে। তাই ব্যথাকে অবহেলা না করে এর কারণ, লক্ষণ এবং কখন চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে—এসব জানা জরুরি।
কোমরের ডান পাশের ব্যথা কেমন হতে পারে?
সব মানুষের ক্ষেত্রে ব্যথার ধরন এক রকম হয় না। কারও ব্যথা হালকা, আবার কারও ক্ষেত্রে তা তীব্র হতে পারে।
ব্যথার ধরন হতে পারে—
- মৃদু বা ভোঁতা ব্যথা
- তীক্ষ্ণ বা ছুরিকাঘাতের মতো ব্যথা
- জ্বালাপোড়া অনুভূতি
- খিঁচুনি বা টান ধরা
- মোচড় দেওয়ার মতো অনুভূতি
- ঝিনঝিনি বা অবশ লাগা
চিকিৎসকদের মতে, ব্যথার ধরন অনেক সময় রোগের সম্ভাব্য কারণ নির্ণয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কেন হয় কোমরের ডান পাশে ব্যথা?
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোমরের ডান পাশের ব্যথার পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। প্রধান কারণগুলো হলো—
১. পেশি ও মেরুদণ্ডের সমস্যা
এটাই সবচেয়ে সাধারণ কারণ।
সম্ভাব্য কারণগুলো হলো—
- পেশি বা লিগামেন্টে টান লাগা
- দীর্ঘক্ষণ ভুল ভঙ্গিতে বসে থাকা
- ভারী জিনিস তোলার ফলে আঘাত
- হার্নিয়েটেড ডিস্ক (ডিস্ক সরে যাওয়া)
- অস্টিওআর্থ্রাইটিস
- অস্টিওপোরোসিস
- স্যাক্রোইলিয়াক জয়েন্টের সমস্যা
- দুর্ঘটনা বা পড়ে গিয়ে মেরুদণ্ডে আঘাত
- গর্ভাবস্থায় শরীরের ভারসাম্য পরিবর্তন
- অতিরিক্ত ওজনের কারণে কোমরে চাপ বৃদ্ধি
২. স্নায়ুর সমস্যার কারণে
মেরুদণ্ডের স্নায়ুতে চাপ পড়লে ব্যথা কোমর থেকে পা পর্যন্ত ছড়িয়ে যেতে পারে।
এর মধ্যে রয়েছে—
- সায়াটিকা
- স্নায়ু চাপে যাওয়া
- স্পাইনাল স্টেনোসিস
- কডা ইকুইনা সিনড্রোম
- অ্যারাকনয়ডাইটিস
এ ধরনের সমস্যায় কোমরের ব্যথার পাশাপাশি পায়ে ঝিনঝিনি, অবশভাব কিংবা দুর্বলতাও দেখা দিতে পারে।
৩. দীর্ঘমেয়াদি বা জটিল রোগ
কিছু দীর্ঘস্থায়ী রোগও কোমরের ডান পাশে ব্যথার কারণ হতে পারে।
যেমন—
- অ্যানকাইলোজিং স্পন্ডিলাইটিস
- ফাইব্রোমায়ালজিয়া
- মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস
- শিংলস সংক্রমণ
- মেরুদণ্ডে সংক্রমণ
- স্কোলিওসিস বা কাইফোসিস
- টিউমার বা ক্যানসার
- জন্মগত মেরুদণ্ডের সমস্যা
৪. শরীরের অন্য অঙ্গের সমস্যাও হতে পারে কারণ
সব সময় ব্যথার উৎস কোমর নয়। শরীরের অন্য অঙ্গের সমস্যার কারণেও কোমরে ব্যথা অনুভূত হতে পারে। একে বলা হয় রেফার্ড পেইন।
কিডনির সমস্যা
কিডনিতে পাথর বা সংক্রমণ হলে কোমরের ডান পাশে ব্যথা হতে পারে।
সঙ্গে থাকতে পারে—
- প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া
- জ্বর
- প্রস্রাবে রক্ত
- বমি বমি ভাব
অ্যাপেন্ডিসাইটিস
অ্যাপেন্ডিক্সে প্রদাহ হলে প্রথমে তলপেটে ব্যথা শুরু হয়। পরে সেই ব্যথা কোমরের ডান পাশ বা পিঠেও ছড়িয়ে যেতে পারে।
পিত্তথলির প্রদাহ
পিত্তথলির সংক্রমণ বা প্রদাহের কারণে ডান পাশের পেটের পাশাপাশি কোমর বা পিঠেও ব্যথা হতে পারে।
অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহ
কিছু ক্ষেত্রে অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহও কোমরের দিকে ব্যথা ছড়িয়ে দিতে পারে।
ব্যথা কমাতে কী করবেন?
সাধারণ কারণে কোমরের ব্যথা হলে চিকিৎসকেরা সাধারণত নিচের পরামর্শ দিয়ে থাকেন—
- পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন।
- ব্যথার স্থানে বরফ বা গরম সেঁক দিন।
- চিকিৎসকের পরামর্শে প্রয়োজন হলে প্যারাসিটামল বা ব্যথানাশক ওষুধ সেবন করুন।
- হালকা স্ট্রেচিং ব্যায়াম করুন।
- দীর্ঘক্ষণ একই ভঙ্গিতে বসে থাকবেন না।
- ভারী জিনিস তোলা এড়িয়ে চলুন।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
নিচের লক্ষণগুলোর যেকোনো একটি থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত—
- ব্যথা এক সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হলে
- বিশ্রামের পরও ব্যথা না কমলে
- দৈনন্দিন কাজ করতে সমস্যা হলে
- জ্বর, বমি বা রাতের ঘামের সঙ্গে ব্যথা থাকলে
- প্রস্রাব বা পায়খানায় রক্ত দেখা গেলে
- কুঁচকিতে ব্যথা বা যৌনমিলনের সময় ব্যথা হলে
- পায়ে অবশভাব বা ঝিনঝিনি শুরু হলে
যেসব লক্ষণ জরুরি চিকিৎসার ইঙ্গিত
নিচের যেকোনো পরিস্থিতিতে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে—
- ব্যথা এত তীব্র যে হাঁটা বা নড়াচড়া করা যাচ্ছে না
- হঠাৎ তীব্র ডান তলপেটের ব্যথা
- এক বা দুই পায়ে দুর্বলতা বা অনুভূতি হারিয়ে যাওয়া
- প্রস্রাব বা পায়খানা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা
- হঠাৎ অসহনীয় ব্যথা শুরু হওয়া
কোমরের ডান পাশে ব্যথা মানেই ভয় পাওয়ার কারণ নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি পেশির টান, অতিরিক্ত পরিশ্রম বা ভুল ভঙ্গিতে বসে থাকার ফলেই হয় এবং কয়েক দিনের বিশ্রামে ভালো হয়ে যায়। তবে ব্যথা যদি বারবার ফিরে আসে, দীর্ঘদিন স্থায়ী হয় অথবা এর সঙ্গে জ্বর, প্রস্রাবের সমস্যা, পায়ে অবশভাব বা তীব্র পেটব্যথার মতো লক্ষণ দেখা দেয়, তাহলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়। সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নিলে গুরুতর জটিলতা এড়ানো সম্ভব।


























