সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্প্রতি একটি দাবি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে বলা হচ্ছে, মানুষের দিনে আট ঘণ্টা ঘুমানোর প্রয়োজন নেই এবং এই ধারণা নাকি ১৯৩৮ সালে একটি ম্যাট্রেস কোম্পানি নিজেদের ব্যবসা বাড়ানোর জন্য তৈরি করেছিল। পোস্টটিতে আরও বলা হয়েছে, মানুষ আগে দুই ধাপে ঘুমাত এবং আধুনিক সমাজ সেই স্বাভাবিক অভ্যাসকে বদলে দিয়েছে। তবে তথ্য যাচাই করে দেখা গেছে, দাবিগুলোর কিছু অংশ সত্য হলেও অধিকাংশই বিভ্রান্তিকর ও তথ্যভিত্তিহীন।
ভাইরাল পোস্টে দাবি করা হয়েছে, মানুষের স্বাভাবিক ঘুমের ধরন ছিল দুই ধাপে। রাতে চার ঘণ্টা ঘুমিয়ে মানুষ কিছু সময় জেগে থাকত এবং পরে আবার চার ঘণ্টা ঘুমাত। মাঝখানের সময়টিকে ‘গড আওয়ার্স’ বলা হতো এবং এ সময় নাকি সৃষ্টিশীল কাজের জন্য সবচেয়ে উপযোগী ছিল। পোস্টে আরও বলা হয়, আধুনিক শিল্পব্যবস্থা ও ব্যবসায়িক স্বার্থের কারণে এই ঘুমের অভ্যাস পরিবর্তন করা হয়েছে।
তথ্য অনুসন্ধানে দেখা যায়, আট ঘণ্টা ঘুমের ধারণার সঙ্গে কোনো ম্যাট্রেস কোম্পানির সরাসরি সম্পর্ক নেই। বরং এর শিকড় রয়েছে শিল্পবিপ্লব-পরবর্তী শ্রমিক অধিকার আন্দোলনের ইতিহাসে। উনিশ শতকের শুরুতে শ্রমিকদের দিনে ১০ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে বাধ্য করা হতো, যা ছিল অত্যন্ত অমানবিক।
১৮১৭ সালে ওয়েলশ সমাজসংস্কারক রবার্ট ওয়েন শ্রমিকদের জন্য একটি বিখ্যাত স্লোগান দেন—‘৮ ঘণ্টা কাজ, ৮ ঘণ্টা বিনোদন এবং ৮ ঘণ্টা বিশ্রাম’। এই দাবির মূল উদ্দেশ্য ছিল শ্রমিকদের জন্য মানবিক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা। পরবর্তীতে বিশ্রামের এই ধারণা ঘুমের সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত হয়ে ওঠে এবং ধীরে ধীরে আট ঘণ্টা ঘুম একটি আদর্শ স্বাস্থ্যপরামর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
অর্থাৎ আট ঘণ্টা ঘুমের ধারণা কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের বিপণন কৌশল নয়। এটি শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নের আন্দোলন থেকে উঠে আসা একটি সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত ধারণা। তাই ম্যাট্রেস কোম্পানির তৈরি ষড়যন্ত্র হিসেবে এটিকে উপস্থাপন করার কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি পাওয়া যায় না।
তবে ভাইরাল পোস্টের একটি অংশ ইতিহাসের সঙ্গে মিল পাওয়া যায়। গবেষকদের মতে, শিল্পবিপ্লবের আগে অনেক সমাজে মানুষ দুই ধাপে ঘুমানোর অভ্যাস অনুসরণ করত। ইতিহাসবিদ এ রজার একিরচ তাঁর গবেষণায় উল্লেখ করেছেন, বৈদ্যুতিক আলো আবিষ্কারের আগে মানুষের ঘুমের ধরন বর্তমান সময়ের তুলনায় ভিন্ন ছিল।
তখন মানুষ সাধারণত সূর্যাস্তের পর ঘুমিয়ে পড়ত। প্রথম ধাপের ঘুম শেষে মাঝরাতে কিছু সময়ের জন্য জেগে উঠত। এই সময় তারা প্রার্থনা, বই পড়া, পারিবারিক আলোচনা বা অন্যান্য কাজ করত। এরপর আবার দ্বিতীয় ধাপের ঘুমে যেত। ইতিহাসে এই পদ্ধতিকে ‘ফার্স্ট স্লিপ’ এবং ‘সেকেন্ড স্লিপ’ নামে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈদ্যুতিক বাতির ব্যবহার, শহুরে জীবনধারা এবং নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা চালুর ফলে মানুষের ঘুমের অভ্যাস ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়েছে। বর্তমানে অধিকাংশ মানুষ একটানা ঘুমানোর অভ্যাসে অভ্যস্ত। তবে দুই ধাপের ঘুমের ঐতিহাসিক অস্তিত্ব থাকলেও এটি প্রমাণ করে না যে আধুনিক ঘুমবিজ্ঞান ভুল।
ভাইরাল পোস্টে আরও দাবি করা হয়েছে যে উইলিয়াম শেক্সপিয়ার ও উলফগ্যাং আমাদেউস মোৎজার্ট তাঁদের সেরা কাজগুলো মাঝরাতের ওই সময়টাতে তৈরি করেছিলেন। কিন্তু ইতিহাসবিদ বা গবেষকদের কাছে এমন কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য বা দলিল পাওয়া যায় না যা এই দাবিকে সমর্থন করে।
ফলে এই অংশটিকে ঐতিহাসিক সত্যের পরিবর্তে অনুমাননির্ভর বা মনগড়া বক্তব্য বলেই বিবেচনা করা হয়। জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বদের নাম ব্যবহার করে তথ্যকে আকর্ষণীয় করে তোলার প্রবণতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই দেখা যায়। কিন্তু প্রমাণ ছাড়া এসব দাবিকে সত্য বলে গ্রহণ করা উচিত নয়।
সবচেয়ে বিতর্কিত দাবি করা হয়েছে ঘুমবিজ্ঞানী ড. নাথানিয়েল ক্লিটম্যানকে নিয়ে। পোস্টে বলা হয়েছে, তিনি নাকি ম্যাট্রেস কোম্পানির অর্থায়নে ভুয়া গবেষণা করেছিলেন। বাস্তবে এই দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই এবং এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন অভিযোগ।
ড. নাথানিয়েল ক্লিটম্যানকে আধুনিক ঘুম গবেষণার অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিনি দীর্ঘ সময় ধরে মানুষের ঘুম, জৈবিক ঘড়ি এবং সার্কেডিয়ান রিদম নিয়ে গবেষণা করেছেন। তাঁর গবেষণা আজও ঘুমবিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
১৯৩৮ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ম্যামথ গুহায় দীর্ঘ সময় অবস্থান করে মানুষের জৈবিক ঘড়ি নিয়ে একটি ঐতিহাসিক গবেষণা পরিচালনা করেন। পরবর্তীতে তাঁর গবেষণা আধুনিক ঘুমবিজ্ঞানের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই তাঁকে ভুয়া গবেষক হিসেবে উপস্থাপন করা তথ্যগতভাবে ভুল।
এ ছাড়া পোস্টে বলা হয়েছে, ইনসমনিয়া বা অনিদ্রা কোনো বাস্তব রোগ নয়। অথচ চিকিৎসাবিজ্ঞানে ইনসমনিয়া একটি স্বীকৃত স্বাস্থ্যসমস্যা। এটি এমন একটি অবস্থা যেখানে একজন ব্যক্তি ঘুমাতে সমস্যা অনুভব করেন অথবা পর্যাপ্ত ঘুমের পরও বিশ্রাম অনুভব করেন না।
মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যাওয়া সবসময় রোগের লক্ষণ নয়। অনেক সময় এটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারে। তবে যদি কেউ ঘুম ভাঙার পর দীর্ঘ সময় জেগে থাকেন এবং এর ফলে দৈনন্দিন জীবনে সমস্যা তৈরি হয়, তখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
ঘুমের অভাব মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে মনোযোগ কমে যেতে পারে, স্মৃতিশক্তি দুর্বল হতে পারে এবং হরমোনের ভারসাম্যেও পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে হৃদ্রোগ, স্থূলতা ও মানসিক চাপের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুম সাধারণত উপযোগী বলে বিবেচিত হয়। তবে সবার শরীর এক নয়। কারও সাত ঘণ্টা ঘুমেই পর্যাপ্ত বিশ্রাম হতে পারে, আবার কারও আট বা নয় ঘণ্টা প্রয়োজন হতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, আট ঘণ্টা ঘুমের ধারণা কোনো ম্যাট্রেস কোম্পানির তৈরি মিথ নয়। এটি শ্রমিক অধিকার আন্দোলনের ইতিহাস, আধুনিক স্বাস্থ্যবিজ্ঞান এবং দীর্ঘদিনের গবেষণার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি সুপ্রতিষ্ঠিত ধারণা। অন্যদিকে মানুষের দুই ধাপের ঘুমের ইতিহাস বাস্তব হলেও সেটিকে কেন্দ্র করে তৈরি অনেক ভাইরাল দাবি তথ্যভিত্তিক নয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত চটকদার তথ্য সবসময় সত্য নাও হতে পারে। তাই স্বাস্থ্যসংক্রান্ত যেকোনো তথ্য বিশ্বাস করার আগে নির্ভরযোগ্য গবেষণা, বিশেষজ্ঞ মতামত এবং প্রমাণভিত্তিক তথ্য যাচাই করা জরুরি। ঘুম মানুষের সুস্থ জীবনের অন্যতম ভিত্তি, তাই এ বিষয়ে সচেতন ও তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্ত নেওয়াই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।


























