ভুয়া চিকিৎসকের দৌরাত্ম্য যেন থামছেই না। চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা কিংবা বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) নিবন্ধন না থাকলেও দেশের বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসার নামে সেবা দেওয়ার অভিযোগ উঠছে। এতে সাধারণ মানুষ প্রতারণার পাশাপাশি ভুল চিকিৎসার ঝুঁকিতেও পড়ছেন। অনুসন্ধানে দেশে প্রায় ১০ হাজার এমন কথিত চিকিৎসকের তথ্য উঠে এসেছে বলে জানানো হয়েছে।
চিকিৎসা দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট শিক্ষাগত যোগ্যতা ও বিএমডিসির নিবন্ধন থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাস্তব চিত্রে অনেকেই সেই নিয়মের বাইরে গিয়ে নিজেদের চিকিৎসক হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন। কেউ কেউ নিজেদের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েও বিভ্রান্তিকর তথ্য দিচ্ছেন। এমনকি চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রয়োজনীয় পড়াশোনা না করেও বিভিন্ন ধরনের ডিগ্রি বা প্রশিক্ষণের পরিচয় ব্যবহার করে রোগী দেখার অভিযোগ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞ ও আইনজীবীদের বক্তব্য অনুযায়ী, আদালতের কিছু আদেশকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করেও সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছেন কেউ কেউ। বিএমডিসির ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার ডা. লিয়াকত হোসেন জানিয়েছেন, চিকিৎসক না হয়েও চিকিৎসকের পরিচয়ে সেবা দেওয়া গুরুতর অপরাধ। আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়াও মনে করেন, ভুয়া চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তাদের আইনগত ক্ষমতা আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে হবে।
তবে তদারকি প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে জনবল ও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কথা বলা হয়েছে। বিএমডিসির দাবি, দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনীয় লোকবল না থাকায় দেশজুড়ে কার্যকরভাবে নজরদারি করা কঠিন। স্বাস্থ্য অধিদফতরের কর্মকর্তারাও জানিয়েছেন, অভিযানের সময় অনেক অভিযুক্ত আদালতের বিভিন্ন আদেশের কথা তুলে ধরেন। ফলে অভিযান, গ্রেপ্তার ও জরিমানার মতো ব্যবস্থা নেওয়া হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়।
স্বাস্থ্য খাতের আরেকটি জটিলতা হলো এমবিবিএস চিকিৎসক ও মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুল বা MATS-সংশ্লিষ্টদের মধ্যে দীর্ঘদিনের পেশাগত বিরোধ। একই সঙ্গে বিকল্প চিকিৎসা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্তদের স্বীকৃতি ও মূলধারায় সম্পৃক্ততা নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বৈধ চিকিৎসক, স্বীকৃত বিকল্প চিকিৎসক এবং ভুয়া চিকিৎসকদের পৃথকভাবে চিহ্নিত করা গেলে রোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহজ হবে।
ভুয়া চিকিৎসকের দৌরাত্ম্য বন্ধে শুধু মাঝে মধ্যে অভিযান চালিয়ে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, বিএমডিসিকে আরও শক্তিশালী ও বিকেন্দ্রীভূত করার পাশাপাশি বিদ্যমান আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। স্বীকৃত ডিগ্রি ও চিকিৎসা প্রশিক্ষণের বিষয়েও স্পষ্ট কাঠামো প্রয়োজন। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, নিয়মিত তদারকি এবং দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে চিকিৎসার নামে প্রতারণা কমিয়ে মানুষের জন্য নিরাপদ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।


























