বহাওয়ার পূর্বাভাস প্রযুক্তিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে গুগল। এতদিন আবহাওয়ার পূর্বাভাস মূলত সরকারি আবহাওয়া সংস্থাগুলোর সুপারকম্পিউটারের ওপর নির্ভরশীল ছিল। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দ্রুত এই খাতেও বড় পরিবর্তন আনছে।
সেই ধারাবাহিকতায় গুগল ডিপমাইন্ড ও গুগল রিসার্চ যৌথভাবে তৈরি করেছে নতুন এআই মডেল ‘ওয়েদারনেক্সট ৩’। গুগলের দাবি, এটি আগের তুলনায় আরও ঘন ঘন এবং নির্ভুল আবহাওয়ার পূর্বাভাস দিতে সক্ষম।
ভবিষ্যতে গুগলের এই নতুন মডেলের পূর্বাভাস গুগল সার্চ, গুগল ম্যাপস ও জেমিনি প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করা হবে। পাশাপাশি গবেষক ও অন্যান্য ব্যবহারকারীরা গুগলের ক্লাউড সেবার মাধ্যমেও মডেলটি ব্যবহারের সুযোগ পাবেন।
প্রচলিত আবহাওয়া পূর্বাভাসে বিশাল সুপারকম্পিউটার ব্যবহার করে বায়ুমণ্ডলের জটিল পদার্থবৈজ্ঞানিক সমীকরণ বিশ্লেষণ করা হয়। এই পদ্ধতি বেশ কার্যকর হলেও এতে বিপুল কম্পিউটিং শক্তি ও সময়ের প্রয়োজন হয়।
অন্যদিকে, গুগলের এই এআই মডেল বিপুল পরিমাণ অতীতের আবহাওয়ার তথ্য বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন পরিস্থিতির ধরন ও পারস্পরিক সম্পর্ক খুব সহজেই শিখে নেয়। ফলে তুলনামূলক কম সময় ও কম কম্পিউটিং শক্তি ব্যবহার করেই এখন পূর্বাভাস তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে।
এআই-ভিত্তিক আবহাওয়া মডেলের একটি বড় সীমাবদ্ধতা ছিল পূর্বাভাসের ভৌগোলিক পরিসর। আগে অনেক মডেল ১৫ থেকে ২৫ বর্গকিলোমিটার এলাকার জন্য পূর্বাভাস দিত। তবে ‘ওয়েদারনেক্সট ৩’ মডেলটি এই সীমাবদ্ধতা অনেকটাই কাটিয়ে উঠেছে।
গুগলের গবেষকদের দাবি, গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি আবহাওয়াগত সূচকের ক্ষেত্রে নতুন মডেলটি ৫ কিলোমিটার পর্যন্ত রেজল্যুশনে অত্যন্ত সূক্ষ্ম পূর্বাভাস দিতে পারে। ফলে নির্দিষ্ট এলাকার আবহাওয়া সম্পর্কে আরও বিস্তারিত ও স্থানীয় পর্যায়ের তথ্য পাওয়া এখন আরও সহজ হবে।
সাধারণত বৃষ্টির পূর্বাভাস দেওয়া এআই মডেলগুলোর জন্য অন্যতম কঠিন একটি কাজ। তবে গুগলের দাবি, আগের ‘ওয়েদারনেক্সট ২’-এর তুলনায় নতুন সংস্করণটি বৃষ্টির পূর্বাভাসের নির্ভুলতা মূল্যায়নে প্রায় ৬০ শতাংশ উন্নতি করেছে।
এ ছাড়া পূর্বাভাসের সময়ের ব্যবধানেও বড় পরিবর্তন এসেছে। যেখানে অনেক প্রচলিত ব্যবস্থায় ছয় ঘণ্টা পরপর পূর্বাভাস হালনাগাদ করা হয়, সেখানে গুগলের ‘ওয়েদারনেক্সট ৩’ প্রতি ঘণ্টায় নতুন ও হালনাগাদ পূর্বাভাস দিতে সক্ষম।
এই আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার শুধু বৃষ্টি বা ঝড়ের সম্ভাবনা জানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। উন্নত আবহাওয়া পূর্বাভাস কৃষকদের ফসল উৎপাদন পরিকল্পনায় ব্যাপকভাবে সহায়তা করতে পারে।
বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে, যেখানে উন্নত আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ অবকাঠামো ও সুপারকম্পিউটারের ব্যয় অনেক বেশি, সেখানে এই এআই-ভিত্তিক পূর্বাভাস অত্যন্ত কার্যকর বিকল্প হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে বাতাস, মেঘ ও বৃষ্টিপাতের আরও নির্ভুল তথ্য পাওয়া গেলে সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প পরিচালনাও আরও নির্ভরযোগ্য হবে।
‘ওয়েদারনেক্সট ৩’-এর আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো, এটি প্রতি ঘণ্টায় সংগৃহীত আবহাওয়া স্যাটেলাইটের নগদ তথ্য সরাসরি বিশ্লেষণে ব্যবহার করতে পারে। গুগলের দাবি, বৈশ্বিক উচ্চ রেজল্যুশনের আবহাওয়া পূর্বাভাস তৈরিতে পর্যবেক্ষণ তথ্য সরাসরি যুক্ত করার ক্ষেত্রে এটিই প্রথম এআই মডেল।
অবশ্য গুগলের এই দাবির সঙ্গে সবাই একমত নয়। এআইভিত্তিক আবহাওয়া পূর্বাভাস প্রতিষ্ঠান উইন্ডবোর্ন জানিয়েছে, তাদের ‘ওয়েদারমেশ ৬’ মডেল ২০২৫ সালের শেষ দিক থেকেই আবহাওয়ার বেলুনসহ বিভিন্ন উৎসের পর্যবেক্ষণ তথ্য সরাসরি ব্যবহার করছে। যদিও গুগলের মতে, তাদের মডেলের বৈশ্বিক পূর্বাভাসের রেজল্যুশন তুলনামূলক বেশি উন্নত।
সব মিলিয়ে ‘ওয়েদারনেক্সট ৩’ মডেলটি সাধারণ মানুষের কাছে আরও দ্রুত, ঘন ঘন এবং স্থানীয় পর্যায়ের আবহাওয়ার তথ্য পৌঁছে দেওয়ার দারুণ সম্ভাবনা তৈরি করেছে। ফলে বৃষ্টি, ঝড় কিংবা দৈনন্দিন যাতায়াতের মতো ছোট-বড় নানা সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভবিষ্যতে এআইয়ের ভূমিকা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।



























