প্রায় দুই শতাব্দী পুরোনো ঐতিহাসিক স্থাপনা গৌরীপুর লজের বাহ্যিক দৃশ্য।
গৌরীপুর লজ এখন শুধু একটি পুরোনো ভবনের নাম নয়, এটি ময়মনসিংহের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং স্থাপত্য ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী। ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে দাঁড়িয়ে থাকা প্রায় দুই শতাব্দী পুরোনো এই ভবনটি একসময় জমিদারি সংস্কৃতি, সংগীতচর্চা এবং অভিজাত জীবনধারার প্রতীক ছিল। অথচ আজ সেই গৌরীপুর লজ ব্যবহৃত হচ্ছে গেস্ট হাউস ও রান্নাঘর হিসেবে। বিষয়টি নিয়ে ইতিহাসপ্রেমী, গবেষক এবং স্থানীয়দের মধ্যে তৈরি হয়েছে ব্যাপক আলোচনা।
ময়মনসিংহ শহরের জুবিলী রোড এলাকায় অবস্থিত গৌরীপুর লজ স্থাপত্যশৈলীর দিক থেকে অনন্য একটি নিদর্শন। কাঠ ও ঢেউটিন দিয়ে নির্মিত দোতলা ভবনটির দেয়াল, দরজা, জানালা এবং বারান্দার নকশায় রয়েছে বিশেষ কারুকাজ। চীনা কারিগরদের দক্ষতার ছাপ পাওয়া যায় ভবনটির বিভিন্ন অংশে। পাথর বসানো মেঝে, মজবুত স্তম্ভ এবং নান্দনিক খিলান আজও অতীতের ঐশ্বর্যের গল্প বলে।
ইতিহাসবিদদের তথ্য অনুযায়ী, গৌরীপুর জমিদার পরিবারের সদস্য ব্রজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী ১৮২৮ সালে এই ভবনটি নির্মাণ করেন। সেই সময় এটি শুধু একটি আবাসিক ভবন ছিল না; বরং শিল্প-সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবেও পরিচিত ছিল। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত বিশিষ্ট ব্যক্তিরা এখানে নিয়মিত আসতেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গৌরীপুর লজের সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক গুরুত্ব এর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে। জমিদার ব্রজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী ছিলেন শাস্ত্রীয় সংগীতের একজন বড় পৃষ্ঠপোষক। তার আমন্ত্রণে উপমহাদেশের বহু বিখ্যাত শিল্পী এখানে সংগীত পরিবেশন করেছেন। ওস্তাদ এনায়েত খান, ওস্তাদ ওয়াজির খান, ওস্তাদ হাফিজ আলী খান এবং আরও অনেক কিংবদন্তি শিল্পীর পদচারণায় মুখর ছিল এই ভবন।
দেশ বিভাগের পর গৌরীপুর লজের ব্যবহার পরিবর্তন হতে শুরু করে। ১৯৪৭ সালের পর ভবনটি ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের শাখা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পরে স্বাধীন বাংলাদেশে এটি সোনালী ব্যাংকের কার্যক্রম পরিচালনার কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত ব্যাংকের শাখা কার্যক্রম এখানে পরিচালিত হয়।
পরবর্তীতে নতুন ব্যাংক ভবন নির্মিত হলে গৌরীপুর লজের মূল কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। তবে ভবনটি পরিত্যক্ত না রেখে সোনালী ব্যাংক এটিকে গেস্ট হাউস হিসেবে ব্যবহার শুরু করে। বর্তমানে ভবনটির নিচতলার কয়েকটি কক্ষ গুদামঘর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। অন্যদিকে দোতলার কক্ষগুলো ব্যাংক কর্মকর্তাদের অস্থায়ী আবাসন হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
এখানেই শেষ নয়। প্রয়োজন হলে সেখানে রান্নার ব্যবস্থাও করা হয়। আর এই বিষয়টিই সবচেয়ে বেশি সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন, একটি ঐতিহাসিক স্থাপনাকে কীভাবে গেস্ট হাউস ও রান্নাঘর হিসেবে ব্যবহার করা হয়?
বিশিষ্ট সমাজকর্মী আলী ইউসুফ মনে করেন, এটি শুধু অনভিপ্রেত নয়, বরং ভবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণও। তার মতে, গৌরীপুর লজ একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সম্পদ। এর স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব রক্ষায় বিশেষ উদ্যোগ প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমান ব্যবহার ভবনটির দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ হলো, সাধারণ মানুষ ভবনটিতে সহজে প্রবেশ করতে পারেন না। অনেক গবেষক, ইতিহাস অনুরাগী এবং পর্যটক গৌরীপুর লজ দেখতে এসে হতাশ হয়ে ফিরে যান। কারণ এটি এখনো জনসাধারণের জন্য পুরোপুরি উন্মুক্ত নয়।
প্রত্নতত্ত্ব অনুরাগী সজল কোরাইশী বলেন, গৌরীপুর লজ শুধু একটি স্থাপনা নয়, এটি বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অংশ। এখানে বহু ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটেছে। তাই এর যথাযথ সংরক্ষণ জরুরি।
এদিকে পুরাকীর্তি সুরক্ষা কমিটি গৌরীপুর লজকে গেস্ট হাউস হিসেবে ব্যবহার বন্ধের দাবি জানিয়েছে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে সোনালী ব্যাংকের ময়মনসিংহ অঞ্চলের মহাব্যবস্থাপকের কাছে স্মারকলিপিও দেওয়া হয়েছে। তাদের দাবি, ভবনটি জনগণের জন্য উন্মুক্ত করতে হবে এবং প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিতে হবে।
তবে সোনালী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ভিন্ন মত পোষণ করছে। ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক মো. জসিম উদ্দিন দাবি করেছেন, গৌরীপুর লজ ব্যাংকের নিজস্ব সম্পত্তি এবং এটি যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। তার মতে, বর্তমানে যেভাবে ভবনটি ব্যবহার করা হচ্ছে তাতে কোনো ক্ষতির আশঙ্কা নেই।
তবুও বিতর্ক থামছে না। কারণ ভবনটি এখনো প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত নয়। যদিও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গৌরীপুর লজকে তালিকাভুক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে। ইতোমধ্যে জরিপ প্রতিবেদনে ভবনটির নাম অন্তর্ভুক্ত করে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে।
ইতিহাসবিদদের মতে, প্রত্নতাত্ত্বিক স্বীকৃতি পেলে গৌরীপুর লজের সংরক্ষণ ও উন্নয়ন আরও সহজ হবে। পাশাপাশি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবেও এটি বিকশিত হতে পারে।
ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসনও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। জেলা প্রশাসক জানিয়েছেন, গৌরীপুর লজের স্বার্থে প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হবে।
গৌরীপুর লজ আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। এটি কি কেবল একটি গেস্ট হাউস হিসেবেই ব্যবহৃত হবে, নাকি দেশের ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা হিসেবে নতুন পরিচয় পাবে? ইতিহাসপ্রেমী মানুষের প্রত্যাশা, ভবনটির ঐতিহাসিক মর্যাদা রক্ষা করা হবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করা হবে।
কারণ গৌরীপুর লজ শুধু একটি ভবন নয়; এটি বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও স্থাপত্য ঐতিহ্যের জীবন্ত দলিল।

























