পাগলির মেলা শুধু একটি গ্রামীণ মেলা নয়, এটি পঞ্চগড়ের মানুষের শত বছরের ঐতিহ্য, বিশ্বাস ও মিলনমেলার প্রতীক। প্রতি বছরের মতো এবারও মহররমের ১১ তারিখে সদর উপজেলার শেখপাড়া গ্রাম উৎসবের রঙে রঙিন হয়ে ওঠে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত হাজারো মানুষের পদচারণায় মুখর ছিল পুরো এলাকা।
কাঁচা সড়কের দুই পাশে সারিবদ্ধ দোকান, খেলনা বাঁশির শব্দ, নাগরদোলা আর শিশুদের হাসিতে প্রাণ ফিরে পায় পুরো গ্রাম। মাটির তৈজসপত্র, চুড়ি, ফিতা, মুড়ি-মুড়কি, গুড়ের জিলাপি ও নানা ধরনের দেশীয় খাবারের দোকানে ছিল উপচে পড়া ভিড়। শুধু স্থানীয় নয়, আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকেও মানুষ পরিবার নিয়ে এই মেলায় অংশ নেন।
স্থানীয়দের মুখে মুখে জানা যায়, প্রায় একশ বছর আগে আমিরন নামে এক মানসিক ভারসাম্যহীন নারী শেখপাড়া এলাকায় বসবাস শুরু করেন। আশুরার সময় তিনি মানুষের সামনে মহররমের গীত পরিবেশন করতেন। তাঁর মৃত্যুর পর গ্রামের মানুষ তাঁকে সড়কের পাশে দাফন করেন। পরে তাঁর কবরকে ঘিরে দোয়া ও ফাতেহা পাঠের প্রচলন শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে সেই স্থান ‘পাগলির মাজার’ নামে পরিচিতি পায় এবং সেখান থেকেই জন্ম নেয় পাগলির মেলা।
প্রবীণ ব্যবসায়ীরা জানান, কয়েক প্রজন্ম ধরে তাঁরা এই মেলায় দোকান বসিয়ে আসছেন। অনেকেই ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে এসেছেন, এখন নিজেরাই দোকান পরিচালনা করছেন। তাঁদের মতে, বছরের এই একটি দিনের অপেক্ষায় থাকেন বহু ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কারণ এদিন ভালো বেচাকেনা হয় এবং পুরোনো ক্রেতাদের সঙ্গে আবারও দেখা হয়।
মেলাকে ঘিরে শেখপাড়া গ্রামে যেন ঈদের আনন্দ নেমে আসে। প্রায় প্রতিটি বাড়িতে বিশেষ রান্না হয়, দূরদূরান্ত থেকে আত্মীয়-স্বজন বেড়াতে আসেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষায়, এটি শুধু একটি মেলা নয়; বরং গ্রামের সামাজিক বন্ধন আরও দৃঢ় করার উপলক্ষ। দর্শনার্থীদের অনেকেই পাগলির মাজার জিয়ারত করে দোয়া করেন, আবার অনেকে শুধুই ঐতিহ্যের টানে মেলায় ঘুরতে আসেন।
কোনো আনুষ্ঠানিক কমিটি ছাড়াই স্থানীয় মানুষের সহযোগিতায় প্রতিবছর এই আয়োজন সফলভাবে সম্পন্ন হয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা পাগলির মেলা এখন পঞ্চগড়ের অন্যতম পরিচিত লোকজ ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। ইতিহাস, ধর্মীয় আবহ, গ্রামীণ সংস্কৃতি এবং মানুষের আন্তরিক অংশগ্রহণ মিলিয়ে এই মেলা উত্তরাঞ্চলের একটি অনন্য সাংস্কৃতিক আয়োজন হিসেবে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান ধরে রেখেছে।




























