পুলিশের স্বতন্ত্র পে-স্কেল দাবি নিয়ে পুলিশ সপ্তাহ ২০২৬ এ প্রধানমন্ত্রীর কাছে নানা দাবি তুলে ধরা হয়েছে। ওভারটাইম ভাতা, মোটরসাইকেল ঋণ, পদোন্নতি ও আধুনিক হাসপাতাল সুবিধা নিয়েও আলোচনা হয়েছে।পুলিশের স্বতন্ত্র পে-স্কেল দাবি নিয়ে এবার নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। পুলিশ সপ্তাহ ২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত কল্যাণ প্যারেডে পুলিশ সদস্যরা সেনাবাহিনী ও বিচার বিভাগের মতো আলাদা বেতন কাঠামো চালুর দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ওভারটাইম ভাতা, মোটরসাইকেল ঋণ, উন্নত চিকিৎসাসেবা এবং অবসরের সময় পদোন্নতির দাবিও তোলা হয়েছে।
রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইনস মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। রুদ্ধদ্বার বৈঠকে পুলিশ সদস্যদের বিভিন্ন সমস্যা ও দীর্ঘদিনের দাবি নিয়ে আলোচনা হয়।
পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বর্তমানে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর মতো পুলিশ সদস্যদের জন্য আলাদা পে-স্কেল না থাকায় তারা অনেক ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হন। তাই একটি স্বতন্ত্র পে-স্কেল চালুর দাবি জোরালোভাবে তুলে ধরা হয়েছে। কর্মকর্তাদের মতে, পুলিশের দায়িত্ব ও কর্মঘণ্টা অন্যান্য অনেক সরকারি চাকরির তুলনায় বেশি হওয়ায় তাদের জন্য বিশেষ বেতন কাঠামো প্রয়োজন।এ সময় পুলিশের জন্য নতুন ভবন নির্মাণের কাজ পুনরায় চালুর দাবিও জানানো হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, কয়েকটি প্রকল্প দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। এসব ভবনের কাজ শেষ হলে আবাসন সংকট অনেকটাই কমবে।
এ ছাড়া মামলার তদন্ত ব্যয়ের বরাদ্দ বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। বর্তমানে একটি মামলার তদন্তে মাত্র পাঁচ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়, যা দিয়ে কার্যকর তদন্ত শেষ করা কঠিন বলে জানিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তারা। তাই বাস্তবতার সঙ্গে মিল রেখে এই বরাদ্দ বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।
উপপরিদর্শকদের (এসআই) জন্য সুদমুক্ত মোটরসাইকেল ঋণের দাবিও ছিল আলোচনায়। পুলিশের মাঠপর্যায়ের সদস্যদের দ্রুত চলাচল ও দায়িত্ব পালনে মোটরসাইকেল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ কারণে সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা চালুর অনুরোধ করা হয়।পুলিশ সদস্যদের অবসরের সময় এক ধাপ পদোন্নতি দেওয়ার দাবিও উত্থাপন করা হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, কনস্টেবলদের অনারারি এএসআই, এএসআইদের অনারারি এসআই এবং এসআইদের অনারারি ইন্সপেক্টর পদে উন্নীত করার দাবি জানানো হয়েছে। এতে দীর্ঘদিন চাকরি করা সদস্যদের সম্মান ও আর্থিক সুবিধা বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অনুষ্ঠানে ওভারটাইম ভাতার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। পুলিশ সদস্যরা প্রায়ই কর্মঘণ্টার বাইরে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা আলাদা পারিশ্রমিক পান না। তাই অতিরিক্ত সময় কাজের জন্য নির্দিষ্ট ভাতা চালুর দাবি জানানো হয়েছে।পুলিশ হাসপাতাল আধুনিকায়নের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। বিভাগীয় শহরগুলোর পুলিশ হাসপাতাল এবং ঢাকার কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা আরও উন্নত করার দাবি ওঠে। আধুনিক যন্ত্রপাতি, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও উন্নত সেবার মাধ্যমে পুলিশ সদস্য ও তাদের পরিবারের চিকিৎসা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়।

এ ছাড়া পুলিশ সদস্যদের সন্তানদের জন্য আলাদা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরির দাবিও এসেছে। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, পুলিশের নিজস্ব জায়গা ব্যবহার করে এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা যেতে পারে। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।কল্যাণ প্যারেড শেষে পুলিশের কর্মকর্তারা জানান, প্রধানমন্ত্রী মোটরসাইকেল কেনার জন্য সুদমুক্ত ঋণ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন। পাশাপাশি ওভারটাইম ভাতা এবং হাসপাতাল উন্নয়নের দাবিও ইতিবাচকভাবে দেখা হচ্ছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, পুলিশকে আরও আধুনিক ও জনবান্ধব বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার কাজ করছে। তিনি জানান, দীর্ঘদিন চাকরি করেও যারা পদোন্নতি পান না, তাদের জন্য বিশেষ নীতিমালা করা হতে পারে। অতিরিক্ত কর্মঘণ্টার জন্য ভাতা চালুর বিষয়েও সরকার চিন্তা করছে।তিনি আরও বলেন, পুলিশ হাসপাতালগুলোকে যুগোপযোগী ও আধুনিক করা হবে। প্রয়োজন হলে নতুন হাসপাতাল নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি আবাসন সমস্যা দূর করতে নতুন ভবন নির্মাণ প্রকল্পও এগিয়ে নেওয়া হবে।
এদিকে পুলিশ সপ্তাহের মধ্যেই পদক প্রদান নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন পদকের তালিকা নিয়ে আপত্তি ও অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় শেষ মুহূর্তে পদক প্রদান স্থগিত করা হয়। পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, যাচাই-বাছাই শেষে যোগ্যদের পদক দেওয়া হবে।প্রতিবছর সাহসিকতা, অপরাধ দমন ও গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য বাংলাদেশ পুলিশ পদক (বিপিএম) ও রাষ্ট্রপতি পুলিশ পদক (পিপিএম) দেওয়া হয়। তবে এবার তালিকা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হওয়ায় বিষয়টি নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পুলিশের স্বতন্ত্র পে-স্কেল দাবি বাস্তবায়ন হলে বাহিনীর মনোবল ও পেশাগত দক্ষতা আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে ওভারটাইম ভাতা, চিকিৎসা সুবিধা ও আবাসন সমস্যার সমাধান হলে সদস্যদের কর্মপরিবেশ উন্নত হবে। তবে এসব দাবি বাস্তবায়নে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, জননিরাপত্তা ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই বাহিনীর সদস্যদের কল্যাণ নিশ্চিত করা হলে তার ইতিবাচক প্রভাব দেশের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায়ও পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।





























