ঢাকা ১০:১৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬, ২ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
Logo বিশ্বকাপে হাইড্রেশন ব্রেক নিয়ে তুমুল বিতর্ক, বদলে যাচ্ছে ফুটবল? Logo পাঁচ বিশ্বকাপ, এবার পাঁচ সন্তানের বাবা হতে চলেছেন নেইমার Logo ইতিহাস কি ফিরছে? আলজেরিয়ার বিপক্ষে হারবে আর্জেন্টিনা! Logo উপজেলায় এমপির পরিদর্শন কক্ষ নির্মাণে বরাদ্দ ৬ লাখ টাকা Logo হঠাৎ পরিদর্শনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী, নোয়াখালী হাসপাতালে মিলল অব্যবস্থাপনার চিত্র Logo জন্মদিনে ট্রাম্পকে জার্সি উপহার জার্মান চ্যান্সেলরের Logo সিলেটে জাল দলিল দিয়ে জমি রেজিস্ট্রির চেষ্টা, দুই দালালের সাজা Logo নেত্রকোনায় গাঁজাসহ কারবারি আটক Logo খাগড়াছড়িতে মাদকবিরোধী মেন্টর তৈরিতে কর্মশালা Logo পদ্মা রেলসেতুর নিচ থেকে মাটি কেটে নেওয়ার ব্যাখ্যা দিলেন সেতুমন্ত্রী

বিশ্বকাপে হাইড্রেশন ব্রেক নিয়ে তুমুল বিতর্ক, বদলে যাচ্ছে ফুটবল?

বিশ্বকাপ হাইড্রেশন ব্রেক

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এ বাধ্যতামূলক হাইড্রেশন ব্রেক নতুন এক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। খেলোয়াড়দের নিরাপত্তার কথা বলে এই নিয়ম চালু করা হলেও অনেকেই এর পেছনে বাণিজ্যিক স্বার্থের উপস্থিতি দেখছেন। ফলে মাঠের খেলার পাশাপাশি এখন আলোচনা হচ্ছে ফুটবলের ভবিষ্যৎ নিয়েও।

যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডাজুড়ে অনুষ্ঠিত হওয়া এই বিশ্বকাপের আবহাওয়া বিবেচনায় রেখে নিয়মটি কার্যকর করা হয়েছে। ফিফার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতিটি ম্যাচে প্রতি অর্ধে একবার করে তিন মিনিটের হাইড্রেশন ব্রেক থাকবে। অর্থাৎ পুরো ম্যাচে দুইবার খেলা সাময়িকভাবে বন্ধ থাকবে।

ফিফা বলছে, উত্তর আমেরিকার গ্রীষ্মকালীন উচ্চ তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা খেলোয়াড়দের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। সেই কারণে তাদের শারীরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এই সিদ্ধান্তের মূল উদ্দেশ্য। সংস্থাটি জানিয়েছে, খেলোয়াড়দের সুস্থতা এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাচ্ছে।

তবে বিতর্কের বড় কারণ হলো, এই নিয়ম সব ম্যাচের জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আবহাওয়া ঠান্ডা হোক কিংবা স্টেডিয়াম শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত থাকুক, নিয়মটি সর্বত্র একইভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে। আর এতেই প্রশ্ন তুলেছেন অনেক ফুটবল বিশ্লেষক ও সাবেক খেলোয়াড়।

এর আগে ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপে প্রচণ্ড গরমের কারণে কিছু ম্যাচে ‘কুলিং ব্রেক’ দেওয়া হয়েছিল। তবে তখন সেটি নির্ভর করত রেফারির সিদ্ধান্ত এবং আবহাওয়ার পরিস্থিতির ওপর। এবার সেই ধারণাকেই নতুনভাবে ‘হাইড্রেশন ব্রেক’ নামে স্থায়ী রূপ দেওয়া হয়েছে।

সমালোচকদের মতে, ফুটবলের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো এর নিরবচ্ছিন্ন গতি। ৪৫ মিনিটের দুই অর্ধে বিরতিহীন লড়াই দর্শকদের আলাদা রোমাঞ্চ দেয়। বাধ্যতামূলক বিরতি সেই স্বাভাবিক প্রবাহে প্রভাব ফেলতে পারে বলে তারা মনে করছেন।

অনেকের আশঙ্কা, এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে ফুটবলকে আরও বেশি থেমে থেমে চলা খেলায় পরিণত করবে। বাস্কেটবল কিংবা আমেরিকান ফুটবলের মতো নিয়মিত বিরতির সংস্কৃতি ধীরে ধীরে ফুটবলেও ঢুকে পড়তে পারে। এতে খেলার মৌলিক বৈশিষ্ট্য বদলে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

বিতর্ক আরও বেড়েছে সম্প্রচার সংস্থাগুলোর ভূমিকা সামনে আসার পর। জানা গেছে, হাইড্রেশন ব্রেকের সময় বিজ্ঞাপন প্রচারের সুযোগ পাচ্ছে টেলিভিশন সম্প্রচারকারীরা। ফলে সমালোচকরা এটিকে শুধুমাত্র স্বাস্থ্যগত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখতে রাজি নন।

ব্রিটিশ সাংবাদিক হেনরি উইন্টার এই নিয়মের কড়া সমালোচনা করেছেন। তার মতে, ম্যাচকে চার ভাগে বিভক্ত করার মাধ্যমে ফুটবলের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট হচ্ছে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক স্বার্থ ক্রমেই খেলাটির ওপর প্রভাব বিস্তার করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

খেলোয়াড়দের মধ্যেও বিষয়টি নিয়ে একমত হওয়া যায়নি। নেদারল্যান্ডস অধিনায়ক ভার্জিল ভ্যান ডাইক মনে করেন, সব ম্যাচে একই নিয়ম প্রয়োগের যৌক্তিকতা নেই। বরং আবহাওয়া ও পরিবেশ বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

অন্যদিকে বেশ কয়েকজন কোচ এই নিয়মকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, এটি দলকে পুনর্গঠনের অতিরিক্ত সুযোগ দিচ্ছে। ম্যাচ চলাকালে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পরিবর্তন আনাও এখন অনেক সহজ হয়ে গেছে।

ফ্রান্সের কোচ দিদিয়ের দেশম বলেছেন, এখন ম্যাচ কার্যত চারটি ভাগে বিভক্ত হয়ে যাচ্ছে। এই বিরতিগুলো কোচদের জন্য ছোট আকারের কৌশলগত টাইমআউট হিসেবে কাজ করছে। ফলে ম্যাচের মাঝপথেই দলীয় পরিকল্পনা বদলে ফেলা সম্ভব হচ্ছে।

ফুটবল বিশ্লেষকরাও বলছেন, হাইড্রেশন ব্রেক ম্যাচের গতিপথ পরিবর্তন করতে সক্ষম। বিরতির আগে পিছিয়ে থাকা দল অনেক সময় নতুন কৌশল নিয়ে ফিরে আসছে। আবার এগিয়ে থাকা দলের ছন্দও অনেক ক্ষেত্রে ভেঙে যাচ্ছে।

তবে চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন। তারা মনে করছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে আরও বেশি তাপপ্রবাহ দেখা যাবে। সেই বাস্তবতায় খেলোয়াড়দের সুরক্ষায় এমন ব্যবস্থা অপরিহার্য হয়ে উঠতে পারে।

সব মিলিয়ে হাইড্রেশন ব্রেক এখন শুধুমাত্র পানি পানের বিরতি নয়। এটি ফুটবলের কৌশল, সম্প্রচার ব্যবসা, দর্শক অভিজ্ঞতা এবং খেলোয়াড়দের নিরাপত্তাকে একই জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, এটি আধুনিক ফুটবলের প্রয়োজনীয় বিবর্তন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়, নাকি খেলার ঐতিহ্য হারানোর সূচনা হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নেয়।

জনপ্রিয় সংবাদ

বিশ্বকাপে হাইড্রেশন ব্রেক নিয়ে তুমুল বিতর্ক, বদলে যাচ্ছে ফুটবল?

বিশ্বকাপে হাইড্রেশন ব্রেক নিয়ে তুমুল বিতর্ক, বদলে যাচ্ছে ফুটবল?

Update Time : ০৮:৩৭:০৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এ বাধ্যতামূলক হাইড্রেশন ব্রেক নতুন এক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। খেলোয়াড়দের নিরাপত্তার কথা বলে এই নিয়ম চালু করা হলেও অনেকেই এর পেছনে বাণিজ্যিক স্বার্থের উপস্থিতি দেখছেন। ফলে মাঠের খেলার পাশাপাশি এখন আলোচনা হচ্ছে ফুটবলের ভবিষ্যৎ নিয়েও।

যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডাজুড়ে অনুষ্ঠিত হওয়া এই বিশ্বকাপের আবহাওয়া বিবেচনায় রেখে নিয়মটি কার্যকর করা হয়েছে। ফিফার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতিটি ম্যাচে প্রতি অর্ধে একবার করে তিন মিনিটের হাইড্রেশন ব্রেক থাকবে। অর্থাৎ পুরো ম্যাচে দুইবার খেলা সাময়িকভাবে বন্ধ থাকবে।

ফিফা বলছে, উত্তর আমেরিকার গ্রীষ্মকালীন উচ্চ তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা খেলোয়াড়দের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। সেই কারণে তাদের শারীরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এই সিদ্ধান্তের মূল উদ্দেশ্য। সংস্থাটি জানিয়েছে, খেলোয়াড়দের সুস্থতা এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাচ্ছে।

তবে বিতর্কের বড় কারণ হলো, এই নিয়ম সব ম্যাচের জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আবহাওয়া ঠান্ডা হোক কিংবা স্টেডিয়াম শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত থাকুক, নিয়মটি সর্বত্র একইভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে। আর এতেই প্রশ্ন তুলেছেন অনেক ফুটবল বিশ্লেষক ও সাবেক খেলোয়াড়।

আরও পড়ুন  মোবাইলে বিশ্বকাপ দেখবেন যেভাবে, জেনে নিন লাইভ স্ট্রিমিং গাইড

এর আগে ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপে প্রচণ্ড গরমের কারণে কিছু ম্যাচে ‘কুলিং ব্রেক’ দেওয়া হয়েছিল। তবে তখন সেটি নির্ভর করত রেফারির সিদ্ধান্ত এবং আবহাওয়ার পরিস্থিতির ওপর। এবার সেই ধারণাকেই নতুনভাবে ‘হাইড্রেশন ব্রেক’ নামে স্থায়ী রূপ দেওয়া হয়েছে।

সমালোচকদের মতে, ফুটবলের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো এর নিরবচ্ছিন্ন গতি। ৪৫ মিনিটের দুই অর্ধে বিরতিহীন লড়াই দর্শকদের আলাদা রোমাঞ্চ দেয়। বাধ্যতামূলক বিরতি সেই স্বাভাবিক প্রবাহে প্রভাব ফেলতে পারে বলে তারা মনে করছেন।

অনেকের আশঙ্কা, এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে ফুটবলকে আরও বেশি থেমে থেমে চলা খেলায় পরিণত করবে। বাস্কেটবল কিংবা আমেরিকান ফুটবলের মতো নিয়মিত বিরতির সংস্কৃতি ধীরে ধীরে ফুটবলেও ঢুকে পড়তে পারে। এতে খেলার মৌলিক বৈশিষ্ট্য বদলে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

বিতর্ক আরও বেড়েছে সম্প্রচার সংস্থাগুলোর ভূমিকা সামনে আসার পর। জানা গেছে, হাইড্রেশন ব্রেকের সময় বিজ্ঞাপন প্রচারের সুযোগ পাচ্ছে টেলিভিশন সম্প্রচারকারীরা। ফলে সমালোচকরা এটিকে শুধুমাত্র স্বাস্থ্যগত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখতে রাজি নন।

আরও পড়ুন  ফুটবল বিশ্বকাপ: কোন দেশ কতবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে

ব্রিটিশ সাংবাদিক হেনরি উইন্টার এই নিয়মের কড়া সমালোচনা করেছেন। তার মতে, ম্যাচকে চার ভাগে বিভক্ত করার মাধ্যমে ফুটবলের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট হচ্ছে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক স্বার্থ ক্রমেই খেলাটির ওপর প্রভাব বিস্তার করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

খেলোয়াড়দের মধ্যেও বিষয়টি নিয়ে একমত হওয়া যায়নি। নেদারল্যান্ডস অধিনায়ক ভার্জিল ভ্যান ডাইক মনে করেন, সব ম্যাচে একই নিয়ম প্রয়োগের যৌক্তিকতা নেই। বরং আবহাওয়া ও পরিবেশ বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

অন্যদিকে বেশ কয়েকজন কোচ এই নিয়মকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, এটি দলকে পুনর্গঠনের অতিরিক্ত সুযোগ দিচ্ছে। ম্যাচ চলাকালে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পরিবর্তন আনাও এখন অনেক সহজ হয়ে গেছে।

ফ্রান্সের কোচ দিদিয়ের দেশম বলেছেন, এখন ম্যাচ কার্যত চারটি ভাগে বিভক্ত হয়ে যাচ্ছে। এই বিরতিগুলো কোচদের জন্য ছোট আকারের কৌশলগত টাইমআউট হিসেবে কাজ করছে। ফলে ম্যাচের মাঝপথেই দলীয় পরিকল্পনা বদলে ফেলা সম্ভব হচ্ছে।

আরও পড়ুন  ৪ এআই চ্যাটবটের একই ভবিষ্যদ্বাণী, ২০২৬ বিশ্বকাপ কি জিতবে স্পেন?

ফুটবল বিশ্লেষকরাও বলছেন, হাইড্রেশন ব্রেক ম্যাচের গতিপথ পরিবর্তন করতে সক্ষম। বিরতির আগে পিছিয়ে থাকা দল অনেক সময় নতুন কৌশল নিয়ে ফিরে আসছে। আবার এগিয়ে থাকা দলের ছন্দও অনেক ক্ষেত্রে ভেঙে যাচ্ছে।

তবে চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন। তারা মনে করছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে আরও বেশি তাপপ্রবাহ দেখা যাবে। সেই বাস্তবতায় খেলোয়াড়দের সুরক্ষায় এমন ব্যবস্থা অপরিহার্য হয়ে উঠতে পারে।

সব মিলিয়ে হাইড্রেশন ব্রেক এখন শুধুমাত্র পানি পানের বিরতি নয়। এটি ফুটবলের কৌশল, সম্প্রচার ব্যবসা, দর্শক অভিজ্ঞতা এবং খেলোয়াড়দের নিরাপত্তাকে একই জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, এটি আধুনিক ফুটবলের প্রয়োজনীয় বিবর্তন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়, নাকি খেলার ঐতিহ্য হারানোর সূচনা হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নেয়।