সিগারেট শুল্ক-কর থেকে সরকারের রাজস্ব আদায়ে চলতি অর্থবছরে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) জানিয়েছে, অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে এই খাতে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা কম রাজস্ব আদায় হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, অবৈধ সিগারেটের বাজার সম্প্রসারণ, চোরাচালান এবং বৈধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের বিক্রি কমে যাওয়াই এই পরিস্থিতির প্রধান কারণ। ফলে সরকারের অন্যতম বড় রাজস্ব খাত এখন চাপের মুখে পড়েছে।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত সিগারেট শুল্ক-কর বাবদ আদায় হয়েছে ৪০ হাজার ৯৬০ কোটি টাকা। অথচ এই সময়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪৫ হাজার ৬৯০ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি তৈরি হয়েছে। যদিও অর্থবছরের শুরুতে পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। শুধু জুলাই মাসেই এই খাতে শুল্ক-কর আদায়ের প্রবৃদ্ধি ছিল ৩৯৪ শতাংশ। পরবর্তী দুই মাসেও প্রবৃদ্ধি ছিল ১০০ শতাংশের বেশি। তবে বছরের শেষভাগে সেই প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১৬ শতাংশে।
এনবিআর কর্মকর্তাদের দাবি, বাজারে কর ফাঁকি দিয়ে আসা অবৈধ সিগারেটের সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় বৈধ কোম্পানিগুলোর বিক্রি কমেছে। এসব সিগারেটে শুল্ক ও ভ্যাট পরিশোধ না হওয়ায় বাজারে তুলনামূলক কম দামে বিক্রি হয়। ফলে অনেক ক্রেতা সেদিকেই ঝুঁকছেন। এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, মে মাস পর্যন্ত শুল্ক-কর পরিশোধ করে বাজারে আসা সিগারেটের পরিমাণও ২ শতাংশের বেশি কমেছে, যা রাজস্ব আদায়ে সরাসরি প্রভাব ফেলেছে।
এই প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে বড় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর। আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ সময়ে ৮ হাজার ৭২৫ কোটি টাকার সিগারেট বিক্রি করেছে। আগের বছরের একই সময়ে বিক্রির পরিমাণ ছিল ৯ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রতিষ্ঠানটির বিক্রি কমেছে ৮৭২ কোটি টাকা। এনবিআর সূত্র জানিয়েছে, শুধু এই প্রতিষ্ঠান নয়, অন্য উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর বিক্রিও কমেছে।
বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, বর্তমানে বাজারে থাকা সিগারেটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই অবৈধভাবে প্রবেশ করছে। অনেক ক্ষেত্রে নকল ব্যান্ডরোল ব্যবহার করেও সিগারেট বাজারজাত করা হচ্ছে। এনবিআরের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে ১০ অক্টোবর পর্যন্ত তিন মাসে অবৈধ দেশি-বিদেশি সিগারেটের বিরুদ্ধে ১৩ হাজারের বেশি অভিযান পরিচালনা করা হয়। এর মধ্যে সাড়ে চার হাজারের বেশি অভিযান সফল হয় এবং প্রায় ২০০ কোটি টাকার অবৈধ সিগারেট জব্দ করা হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, ওই সময় কঠোর অভিযানের কারণে অবৈধ সিগারেটের সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছিল।
তবে পরবর্তীতে অভিযান কমে যাওয়ার সুযোগে আবারও অবৈধ সিগারেটের সরবরাহ বেড়েছে বলে দাবি এনবিআরের। কর্মকর্তাদের মতে, এই পরিস্থিতি শুধু বৈধ ব্যবসা নয়, সরকারের রাজস্ব আহরণকেও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে ফেলছে। তাই সিগারেট শুল্ক-কর আদায় বাড়াতে অবৈধ সিগারেটের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান, নকল ব্যান্ডরোল বন্ধ এবং বাজার তদারকি আরও জোরদার করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


























