বর্তমান বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লেও স্বাস্থ্যকর ব্রেকফাস্ট করতে যে অনেক টাকা খরচ করতে হবে, এমন ধারণা সঠিক নয়। চিকিৎসকদের মতে, মাত্র ৫০ টাকার মধ্যেই এমন একটি পুষ্টিকর প্রাতরাশ করা সম্ভব, যা শরীরের প্রয়োজনীয় প্রোটিন, ভিটামিন, খনিজ, ফাইবার ও শক্তির বড় অংশই পূরণ করতে পারে। সঠিক খাবার নির্বাচন করলে কম খরচেও সুস্থ থাকা এবং দীর্ঘমেয়াদে ডায়াবেটিস, স্থূলতা ও হৃদরোগের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
সারারাত ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা না খেয়ে থাকার পর সকালের খাবারই শরীরকে নতুন করে শক্তি জোগায়। তাই দিনের শুরুটা স্বাস্থ্যকর ব্রেকফাস্ট দিয়ে করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, সকালের খাবার বাদ দিলে ক্লান্তি, মনোযোগের ঘাটতি, অতিরিক্ত ক্ষুধা এবং অস্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে।
কেন সকালের ব্রেকফাস্ট এত গুরুত্বপূর্ণ?
পুষ্টিবিদ ও চিকিৎসকদের মতে, একটি সুষম প্রাতরাশ—
- শরীরে প্রয়োজনীয় শক্তি জোগায়।
- দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখে।
- মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা ও মনোযোগ বাড়ায়।
- বিপাকক্রিয়া (মেটাবলিজম) সচল রাখে।
- অতিরিক্ত ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
- রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করে।
- সারাদিনের কর্মক্ষমতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।
মাত্র ৫০ টাকার মধ্যে যেসব ব্রেকফাস্ট হতে পারে
স্বল্প বাজেটেও সহজে তৈরি করা যায় এমন কয়েকটি স্বাস্থ্যকর খাবার হলো—
- রুটি ও মিশ্র সবজি
- দুটি সেদ্ধ ডিমের সঙ্গে পাউরুটি
- চিঁড়ার পোলাও
- ওটসের পায়েস বা ওটস খিচুড়ি
- মুড়ির সঙ্গে সেদ্ধ ডিম ও শশা
- সবজি খিচুড়ি
- কলা ও এক গ্লাস দুধ
- সেদ্ধ ছোলার সালাদ
এসব খাবারে কার্বোহাইড্রেট, উচ্চমানের প্রোটিন, স্বাস্থ্যকর ফ্যাট, ভিটামিন, মিনারেল ও ফাইবারের ভালো সমন্বয় থাকে। ফলে দীর্ঘ সময় ক্ষুধা কম লাগে এবং শরীর সতেজ থাকে।
প্রতিদিনের ব্রেকফাস্টে কী রাখবেন?
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিদিনের সকালের খাবারে কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করা উচিত।
- অন্তত একটি সেদ্ধ ডিম অথবা ডালজাতীয় খাবার।
- একটি মৌসুমি ফল, যেমন কলা, পেয়ারা বা পেঁপে।
- পর্যাপ্ত পরিমাণ সবজি।
- প্রয়োজন অনুযায়ী দুধ বা দই।
- পর্যাপ্ত পানি বা লেবু পানি।
এভাবে খাবার নির্বাচন করলে শরীর প্রয়োজনীয় পুষ্টি সহজেই পায়।
যেসব খাবার কম খাওয়াই ভালো
সুস্থ থাকতে কিছু খাবার যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
- অতিরিক্ত তেলে ভাজা খাবার।
- ঘি বা অতিরিক্ত মাখন।
- মিষ্টিজাতীয় খাবার।
- অতিরিক্ত চিনি দেওয়া চা বা কফি।
- অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত (প্রসেসড) খাবার।
এর পরিবর্তে কম তেলযুক্ত, সেদ্ধ বা হালকা রান্না করা খাবার বেছে নেওয়াই ভালো।
ডায়াবেটিস ও ওজন নিয়ন্ত্রণে বিশেষ পরামর্শ
ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে মুড়ির মতো উচ্চ কার্বোহাইড্রেটযুক্ত খাবার সীমিত পরিমাণে খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে প্রোটিন ও ফাইবারসমৃদ্ধ খাবার যোগ করলে রক্তে শর্করার ওঠানামা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয়।
অন্যদিকে যারা ওজন কমাতে চান, তারা সকালের খাবারে রাখতে পারেন—
- সেদ্ধ ছোলা
- ওটস
- সবজি
- ডিম
- কম চর্বিযুক্ত দুধ
এসব খাবার কম ক্যালোরিতে দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখে।
চিকিৎসক কী বলছেন?
এই বিষয়ে তথ্য দিয়েছেন ডাঃ অভিদীপ্ত হাজরা। তিনি পশ্চিমবঙ্গ স্বাস্থ্যবিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতাল (IPGMER-SSKM Annexe-2)-এ ইন্টার্ন চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত। ডায়াবেটিস ও রক্তাল্পতা নিয়ে তাঁর গবেষণাও জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃতি পেয়েছে।
তাঁর মতে, পুষ্টিকর ব্রেকফাস্ট শুধু ক্ষুধা মেটানোর জন্য নয়, বরং মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখা, মনোযোগ বৃদ্ধি, বিপাকক্রিয়া সচল রাখা এবং সারাদিন কর্মক্ষম থাকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই সীমিত বাজেটকে অজুহাত না করে সঠিক খাবার নির্বাচন করাই সবচেয়ে বড় বিষয়।
কম খরচেও সুস্থ থাকা সম্ভব
অনেকেই মনে করেন স্বাস্থ্যকর খাবার মানেই বেশি খরচ। কিন্তু বাস্তবে পরিকল্পনা করে বাজার করলে এবং সহজলভ্য খাবার বেছে নিলে মাত্র ৫০ টাকার মধ্যেই একটি সুষম ও পুষ্টিকর ব্রেকফাস্ট করা সম্ভব। ডিম, চিঁড়া, ছোলা, ওটস, মৌসুমি ফল ও সবজি—এসব সহজলভ্য খাবারের সমন্বয় শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টি পূরণে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিদিনের শুরু যদি স্বাস্থ্যকর ব্রেকফাস্ট দিয়ে হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে ডায়াবেটিস, স্থূলতা, হৃদরোগসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি সুস্থ জীবনযাপনও অনেক সহজ হয়ে ওঠে।






















