বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (ববি) ফাইন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের এক শিক্ষার্থী অ্যাসাইনমেন্টে শিক্ষিকার নামের বানানে ভুল করায় তাকে ৩০০ বার নাম লিখে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর নাম সাইদুল ইসলাম সাইদ। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের (দ্বিতীয় সেমিস্টার) শিক্ষার্থী। অভিযোগ অনুযায়ী, বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মরিয়ম হাসনা অ্যাসাইনমেন্টে নিজের নামের বানানে ভুল হওয়ায় তাকে ৩০০ বার নাম লিখে জমা দিতে বলেন।
সাইদুল ইসলাম সাইদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি পোস্টে পুরো ঘটনার বর্ণনা দেন। তিনি লেখেন,
“গত রাতটি আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের অন্যতম স্মরণীয় একটি অভিজ্ঞতা হয়ে থাকবে। একটি শব্দের বানানে মাত্র একটি অতিরিক্ত অক্ষর—’Morioum’-এর পরিবর্তে ‘Morium’—লেখার কারণে আমাকে পুরো নাম ৩০০ বার সংশোধন করতে হয়েছে।”
পোস্টের সঙ্গে তিনি হাতে লেখা ৩০০ বার নাম লেখার খাতার ছবিও প্রকাশ করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই ছবিটি সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর অনেক শিক্ষার্থী, সাবেক শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এমন শাস্তির যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। অনেকে এটিকে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনুপযুক্ত ও মানসিক চাপ সৃষ্টিকারী শাস্তি হিসেবে আখ্যা দেন।
বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী রেদোয়ান সরকার ফেসবুকে লিখেছেন,
“কত কত অযাচিত অ্যাসাইনমেন্ট করেছি তার হিসাব নেই। ক্রিয়েটিভিটি বলতে দেখে দেখে অ্যাসাইনমেন্টের এই ধরনের র্যাগিংই হয় এখানে।”
তার এই মন্তব্যেও অনেকেই একমত পোষণ করেন এবং বিভাগের শিক্ষাদান পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
একাধিক বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থী দাবি করেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাসাইনমেন্ট ও ক্লাস কার্যক্রমে অতিরিক্ত চাপ এবং কিছু ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক আচরণের অভিযোগ আগে থেকেও ছিল। তবে এবার ঘটনাটি সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ পাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের একটি অংশের মতে, বানান ভুল অবশ্যই সংশোধন করা উচিত, কিন্তু সেটির জন্য ৩০০ বার নাম লিখতে বাধ্য করা শিক্ষার্থীর আত্মসম্মান ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ঘটনাটি নিয়ে সহকারী অধ্যাপক মরিয়ম হাসনা এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত বক্তব্য দেননি। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সূত্র জানায়, তিনি শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলা ও সতর্কতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যেই এমন নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে দাবি করেছেন।
ঘটনাটি সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেওয়ার পর বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিষয়টি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, লিখিত অভিযোগ পেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত বিধি অনুযায়ী তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে পারস্পরিক সম্মান ও পেশাদার আচরণ বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষার্থীর ভুল সংশোধনের জন্য গঠনমূলক প্রতিক্রিয়া (Constructive Feedback) সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি। তারা বলেন, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শাস্তিমূলক পদ্ধতির পরিবর্তে ব্যাখ্যা, পরামর্শ এবং একাডেমিক নির্দেশনার মাধ্যমে ভুল সংশোধনের সংস্কৃতি গড়ে তোলা উচিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি বানান ভুলের জন্য শত শত বার লিখতে বাধ্য করা শিক্ষার চেয়ে ভীতি ও মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে, যা একটি আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।


















