ইউরোপিয়ান ফুটবলের নতুন মৌসুমের শুরুতেই আবারও ট্রফির স্বাদ পেল প্যারিস সেন্ট জার্মেই। রেড বুল অ্যারেনায় অ্যাস্টন ভিলাকে ২-১ গোলে হারিয়ে সুপার কাপ জিতেছে ফরাসি ক্লাবটি। গত মৌসুমে চ্যাম্পিয়নস লিগসহ পাঁচটি ট্রফি জেতার পর এবারও ট্রফি দিয়েই নতুন অভিযান শুরু করল পিএসজি। আর এই জয়ের সবচেয়ে বড় আলোচনার নাম লুইস এনরিকে। ছয়টি ইউরোপিয়ান ফাইনালে উঠে প্রতিবারই ট্রফি জেতার অসাধারণ রেকর্ড গড়েছেন স্প্যানিশ এই কোচ। ফলে পাঁচ ফাইনালে পাঁচ ট্রফি জেতা জিনেদিন জিদানকে ছাড়িয়ে গেছেন তিনি। পিএসজির এই সাফল্য তাই শুধু আরেকটি ট্রফি জয় নয়, এনরিকের কোচিং ক্যারিয়ারেরও বিশেষ এক মাইলফলক। ইউরোপিয়ান ফুটবলের আরও খবর পড়তে ফুটবল বিভাগে চোখ রাখতে পারেন।
ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে পিএসজি। ২০ মিনিটে খিচা কাভারাস্কাইয়ার দুর্দান্ত ফিনিশিংয়ে এগিয়ে যায় ফরাসি দল। তবে পিছিয়ে পড়েও ম্যাচে ফেরার সুযোগ তৈরি করে অ্যাস্টন ভিলা। প্রথমার্ধের একেবারে শেষ দিকে ১৭ বছর বয়সী ব্রায়ান মাদজো গোল করে ম্যাচে সমতা ফেরান। প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে ভিলার জার্সিতে এটিই ছিল তরুণ ইংলিশ ফরোয়ার্ডের অভিষেক। অভিষেকেই এমন বড় মঞ্চে গোল করে ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নেন মাদজো। সুপার কাপের ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সে গোল করার কৃতিত্বও এখন তাঁর। তরুণ এই ফরোয়ার্ডের গোল ম্যাচটিকে আরও জমিয়ে তোলে এবং দ্বিতীয়ার্ধে দুই দলের লড়াই হয়ে ওঠে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ।
দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে মরিয়া হয়ে ওঠে পিএসজি। ৬১ মিনিটে সেই প্রচেষ্টার ফলও পেয়ে যায় তারা। দেজিরে দুয়ের গোলে আবারও এগিয়ে যায় ফরাসি চ্যাম্পিয়নরা। এরপর অ্যাস্টন ভিলা গোল শোধের জন্য বেশ কিছু আক্রমণ করলেও পিএসজির রক্ষণভাগ আর ভুল করেনি। শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই নিশ্চিত হয় পিএসজির আরেকটি ইউরোপিয়ান ট্রফি। চ্যাম্পিয়নস লিগের শিরোপা জয়ের কয়েক মাস পরই আরেকটি বড় ট্রফি ঘরে তুলে এনরিকের দল প্রমাণ করেছে, গত মৌসুমের সাফল্য কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। বরং ইউরোপের শীর্ষ পর্যায়ে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করছে প্যারিসের ক্লাবটি। পিএসজির সাম্প্রতিক সাফল্য নিয়েও পাঠকের আগ্রহ থাকতে পারে।
এই জয়ের পর এনরিকে জানিয়েছেন, ম্যাচটি সহজ হবে বলে তাঁরা ভাবেননি। শারীরিকভাবে দল এখনও সেরা অবস্থায় পৌঁছাতে পারেনি, কিন্তু খেলোয়াড়েরা নিজেদের সামর্থ্য দিয়ে কঠিন পরিস্থিতি সামলে নিয়েছেন। তাঁর মতে, দলের মানসিকতা ও নিজেদের খেলার ধরনই আবারও জয় এনে দিয়েছে। এনরিকে বলেছেন, কঠিন লড়াইয়ের মধ্যেও খেলোয়াড়েরা নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন এবং দলের ‘ডিএনএ’ দেখিয়ে দিয়েছেন। পরপর দুটি টুর্নামেন্টে সাফল্য পাওয়া কঠিন হলেও এখন তাঁদের লক্ষ্য এই অর্জনকে কাজে লাগিয়ে আরও বড় ট্রফির জন্য লড়াই করা। আগামী রোববার ফ্রেঞ্চ সুপার কাপে লেঁসের বিপক্ষে ম্যাচেও তাই পিএসজির সামনে আরেকটি শিরোপা জয়ের সুযোগ থাকছে। ইউরোপিয়ান ফুটবলের জন্য এটি হতে পারে পিএসজির আরও বড় আধিপত্যের শুরু।
এনরিকের ব্যক্তিগত অর্জনও এই জয়ের পর নতুন মাত্রা পেয়েছে। ইউরোপিয়ান প্রতিযোগিতায় ছয়টি ট্রফি জিতেছেন তিনি। তাঁর পাশে আছেন অ্যালেক্স ফার্গুসন ও জিওভান্নি ত্রাপাত্তোনি, যাঁদেরও ছয়টি করে ইউরোপিয়ান ট্রফি রয়েছে। এই তালিকায় সবার ওপরে কার্লো আনচেলত্তি, যাঁর ঝুলিতে ১০টি ইউরোপিয়ান ট্রফি। সাতটি নিয়ে তাঁর পরেই পেপ গার্দিওলা। তবে এনরিকের রেকর্ডের বিশেষত্ব অন্য জায়গায়। ছয়টি ইউরোপিয়ান ফাইনালে অংশ নিয়ে ছয়বারই ট্রফি জিতেছেন তিনি। অর্থাৎ বড় মঞ্চে এখন পর্যন্ত তাঁর শতভাগ সাফল্য। এই জায়গাতেই জিদানকে ছাড়িয়ে গেছেন তিনি। রিয়াল মাদ্রিদের কিংবদন্তি কোচ পাঁচটি ইউরোপিয়ান ফাইনালে উঠে পাঁচবারই শিরোপা জিতেছিলেন। এনরিকে এবার সেই রেকর্ড ছাড়িয়ে নিজের জন্য তৈরি করেছেন এক অনন্য উচ্চতা।
অন্যদিকে, সুপার কাপের ফাইনাল হার উনাই এমেরির জন্য পুরোনো হতাশাকেই যেন ফিরিয়ে আনল। এই প্রতিযোগিতায় এর আগে তিনবার হেরেছিলেন স্প্যানিশ কোচ। ২০১৪ ও ২০১৫ সালে সেভিয়ার কোচ হিসেবে এবং ২০২১ সালে ভিয়ারিয়ালের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় হেরেছিলেন তিনি। এবার অ্যাস্টন ভিলার কোচ হিসেবে চতুর্থবারের মতো একই পরিণতি হলো তাঁর। ফলে এই টুর্নামেন্টে সবচেয়ে বেশি ফাইনাল হারা কোচও এখন এমেরি। বিপরীতে পিএসজির জন্য রাতটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। নতুন মৌসুমের শুরুতেই ট্রফি, এনরিকের রেকর্ড এবং দলের আত্মবিশ্বাস—সব মিলিয়ে প্যারিসের ক্লাবটি আবারও ইউরোপের ফুটবলমঞ্চে নিজেদের শক্তির জানান দিল।



























