ঢাকা ১২:২৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৫ মে ২০২৬, ২১ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কুড়িগ্রামে ট্রাক ও মাইক্রোবাসের সংঘর্ষে শিশুসহ নিহত ৩

  • Taslima Khanom
  • Update Time : ০৬:৫২:২৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬
  • ৫১৬

চিত্রঃ নাগেশ্বরী সড়ক দুর্ঘটনা চিত্র

কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলায় এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় শিশুসহ তিনজনের প্রাণহানি ঘটেছে। মঙ্গলবার দিবাগত রাত সাড়ে ১১টার দিকে নাগেশ্বরী পৌরসভার বাঁশেরতল নামক স্থানে এই দুর্ঘটনাটি ঘটে। ঘাতক ট্রাক ও যাত্রীবাহী মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ঘটনাস্থলেই দুজন প্রাণ হারান এবং হাসপাতালে একজন। এই মর্মান্তিক ঘটনায় পুরো এলাকায় গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে এবং স্থানীয়রা আতঙ্কিত। পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, ভুরুঙ্গামারীর বঙ্গসোনার হাট স্থলবন্দর থেকে পাথর বোঝাই একটি ট্রাক কুড়িগ্রাম অভিমুখে যাচ্ছিল। বিপরীত দিক থেকে অর্থাৎ রংপুর থেকে আসা একটি মাইক্রোবাস ভুরুঙ্গামারীর দিকে যাওয়ার সময় বাঁশেরতল এলাকায় পৌঁছালে সংঘর্ষ হয়।

ট্রাকের গতিবেগ অনেক বেশি থাকায় মাইক্রোবাসটি দুমড়ে-মুচড়ে যায় এবং ভেতরে থাকা যাত্রীরা আটকা পড়েন। বিকট শব্দ শুনে স্থানীয় লোকজন দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে এসে উদ্ধার কাজে হাত লাগান। নিহতদের পরিচয় শনাক্ত করেছে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ বিভাগ। নিহতরা হলেন ভুরুঙ্গামারী উপজেলার আসাদমোড় উত্তর তিলাই গ্রামের মনির হোসেনের মেয়ে ৮ বছর বয়সী শিশু সাদিয়া। অন্য দুজন হলেন জাহিদুল ইসলামের ছেলে নুরনবী (৩০) এবং ধলডাঙ্গা গ্রামের সাইফুর রহমানের ছেলে লিমন (২৮)। জানা গেছে, নিহত লিমন ওই মাইক্রোবাসটির চালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন এবং পেশাগত দায়িত্ব পালনকালেই তিনি মারা যান।

দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার সাথে সাথেই নাগেশ্বরী থানা পুলিশ এবং ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। তারা স্থানীয়দের সহায়তায় মাইক্রোবাসের ভেতর থেকে হতাহতদের উদ্ধার করে দ্রুত হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। উদ্ধার অভিযান চলাকালে ওই সড়কে কিছুক্ষণ যানবাহন চলাচল ব্যাহত হলেও পুলিশের তৎপরতায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া গাড়ির অংশ কেটে আটকে পড়াদের বের করে আনেন। আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য প্রথমে নাগেশ্বরী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক একজনের মৃত্যু নিশ্চিত করেন এবং বাকিদের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানান।

উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন হওয়ায় অন্তত ১১ জনকে কুড়িগ্রাম সদর হাসপাতাল ও রংপুর মেডিকেল কলেজে পাঠানো হয়েছে। আহতদের অনেকের অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন হওয়ায় নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। নাগেশ্বরী থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ হিল জামান এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, ঘাতক ট্রাকটিকে জব্দ করার চেষ্টা চলছে তবে চালক ও সহকারী ঘটনার পর পালিয়ে গেছে। পুলিশ নিহতদের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে এবং আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এই ঘটনায় একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করার প্রস্তুতি চলছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, বাঁশেরতল এলাকার ওই সড়কটিতে প্রায়শই দ্রুতগামী ট্রাকগুলো বেপরোয়াভাবে চলাচল করে থাকে। পাথর বোঝাই ট্রাকগুলো ওভারলোডিংয়ের কারণে অনেক সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে যা দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ। রাতের আঁধারে পর্যাপ্ত আলোর অভাব এবং চালকদের অসতর্কতা এই ধরণের প্রাণহানির ঘটনা বারবার ঘটাচ্ছে। এলাকাবাসী এই রুটে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আরও জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন। সড়ক দুর্ঘটনার এই সংবাদটি ছড়িয়ে পড়লে ভুরুঙ্গামারী উপজেলায় নিহতদের পরিবারে আহাজারি শুরু হয়। একই এলাকার তিনজনের মৃত্যুতে গ্রামজুড়ে শোকাতুর পরিবেশ বিরাজ করছে এবং স্বজনদের কান্নায় আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে।

প্রশাসন নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছে এবং আহতদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করার আশ্বাস প্রদান করেছে। নিরাপদ সড়কের দাবিতে আবারও সোচ্চার হয়ে উঠেছেন সচেতন নাগরিক সমাজ।বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে বিশেষ করে কুড়িগ্রামের মতো সীমান্ত এলাকাগুলোতে সড়ক নিরাপত্তা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। মালবাহী ভারী যানবাহনের আধিক্য এবং সরু রাস্তার কারণে এই ধরণের দুর্ঘটনাগুলো নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। দক্ষ চালকের অভাব এবং ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তায় নামানোও এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী বলে মনে করা হয়। এই ধরণের অকাল মৃত্যু রোধে কঠোর আইন প্রয়োগ ও জনসচেতনতা অত্যন্ত জরুরি।

পরিশেষে, কুড়িগ্রামের এই দুর্ঘটনা আমাদের সড়ক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকেই আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। একটি ভুলের কারণে তিনটি তাজা প্রাণ ঝরে গেল এবং অনেকগুলো পরিবার পঙ্গুত্বের অভিশাপ নিয়ে বেঁচে থাকবে। সরকার ও সংশ্লিষ্ট মহলের উচিত দ্রুত তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের শাস্তির আওতায় আনা। সেই সাথে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ প্রদানের মাধ্যমে তাদের পাশে দাঁড়ানো রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব।

জনপ্রিয় সংবাদ

কুড়িগ্রামে ট্রাক ও মাইক্রোবাসের সংঘর্ষে শিশুসহ নিহত ৩

Update Time : ০৬:৫২:২৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬

কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলায় এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় শিশুসহ তিনজনের প্রাণহানি ঘটেছে। মঙ্গলবার দিবাগত রাত সাড়ে ১১টার দিকে নাগেশ্বরী পৌরসভার বাঁশেরতল নামক স্থানে এই দুর্ঘটনাটি ঘটে। ঘাতক ট্রাক ও যাত্রীবাহী মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ঘটনাস্থলেই দুজন প্রাণ হারান এবং হাসপাতালে একজন। এই মর্মান্তিক ঘটনায় পুরো এলাকায় গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে এবং স্থানীয়রা আতঙ্কিত। পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, ভুরুঙ্গামারীর বঙ্গসোনার হাট স্থলবন্দর থেকে পাথর বোঝাই একটি ট্রাক কুড়িগ্রাম অভিমুখে যাচ্ছিল। বিপরীত দিক থেকে অর্থাৎ রংপুর থেকে আসা একটি মাইক্রোবাস ভুরুঙ্গামারীর দিকে যাওয়ার সময় বাঁশেরতল এলাকায় পৌঁছালে সংঘর্ষ হয়।

ট্রাকের গতিবেগ অনেক বেশি থাকায় মাইক্রোবাসটি দুমড়ে-মুচড়ে যায় এবং ভেতরে থাকা যাত্রীরা আটকা পড়েন। বিকট শব্দ শুনে স্থানীয় লোকজন দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে এসে উদ্ধার কাজে হাত লাগান। নিহতদের পরিচয় শনাক্ত করেছে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ বিভাগ। নিহতরা হলেন ভুরুঙ্গামারী উপজেলার আসাদমোড় উত্তর তিলাই গ্রামের মনির হোসেনের মেয়ে ৮ বছর বয়সী শিশু সাদিয়া। অন্য দুজন হলেন জাহিদুল ইসলামের ছেলে নুরনবী (৩০) এবং ধলডাঙ্গা গ্রামের সাইফুর রহমানের ছেলে লিমন (২৮)। জানা গেছে, নিহত লিমন ওই মাইক্রোবাসটির চালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন এবং পেশাগত দায়িত্ব পালনকালেই তিনি মারা যান।

আরও পড়ুন  সড়ক দুর্ঘটনায় কলেজছাত্রীর মর্মান্তিক প্রাণহানি, ট্রাকচালক আটক

দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার সাথে সাথেই নাগেশ্বরী থানা পুলিশ এবং ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। তারা স্থানীয়দের সহায়তায় মাইক্রোবাসের ভেতর থেকে হতাহতদের উদ্ধার করে দ্রুত হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। উদ্ধার অভিযান চলাকালে ওই সড়কে কিছুক্ষণ যানবাহন চলাচল ব্যাহত হলেও পুলিশের তৎপরতায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া গাড়ির অংশ কেটে আটকে পড়াদের বের করে আনেন। আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য প্রথমে নাগেশ্বরী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক একজনের মৃত্যু নিশ্চিত করেন এবং বাকিদের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানান।

উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন হওয়ায় অন্তত ১১ জনকে কুড়িগ্রাম সদর হাসপাতাল ও রংপুর মেডিকেল কলেজে পাঠানো হয়েছে। আহতদের অনেকের অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন হওয়ায় নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। নাগেশ্বরী থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ হিল জামান এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, ঘাতক ট্রাকটিকে জব্দ করার চেষ্টা চলছে তবে চালক ও সহকারী ঘটনার পর পালিয়ে গেছে। পুলিশ নিহতদের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে এবং আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এই ঘটনায় একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করার প্রস্তুতি চলছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

আরও পড়ুন  সকাল ৯টার মধ্যে ৮ জেলায় ৮০ কিমি বেগে কালবৈশাখীর আশঙ্কা

স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, বাঁশেরতল এলাকার ওই সড়কটিতে প্রায়শই দ্রুতগামী ট্রাকগুলো বেপরোয়াভাবে চলাচল করে থাকে। পাথর বোঝাই ট্রাকগুলো ওভারলোডিংয়ের কারণে অনেক সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে যা দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ। রাতের আঁধারে পর্যাপ্ত আলোর অভাব এবং চালকদের অসতর্কতা এই ধরণের প্রাণহানির ঘটনা বারবার ঘটাচ্ছে। এলাকাবাসী এই রুটে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আরও জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন। সড়ক দুর্ঘটনার এই সংবাদটি ছড়িয়ে পড়লে ভুরুঙ্গামারী উপজেলায় নিহতদের পরিবারে আহাজারি শুরু হয়। একই এলাকার তিনজনের মৃত্যুতে গ্রামজুড়ে শোকাতুর পরিবেশ বিরাজ করছে এবং স্বজনদের কান্নায় আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে।

আরও পড়ুন  বৃষ্টিবলয় ‘গর্জন’ আসছে: কালবৈশাখী ঝড়, বজ্রসহ বৃষ্টি ও শিলাবৃষ্টির শঙ্কা কয়েক বিভাগে

প্রশাসন নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছে এবং আহতদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করার আশ্বাস প্রদান করেছে। নিরাপদ সড়কের দাবিতে আবারও সোচ্চার হয়ে উঠেছেন সচেতন নাগরিক সমাজ।বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে বিশেষ করে কুড়িগ্রামের মতো সীমান্ত এলাকাগুলোতে সড়ক নিরাপত্তা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। মালবাহী ভারী যানবাহনের আধিক্য এবং সরু রাস্তার কারণে এই ধরণের দুর্ঘটনাগুলো নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। দক্ষ চালকের অভাব এবং ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তায় নামানোও এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী বলে মনে করা হয়। এই ধরণের অকাল মৃত্যু রোধে কঠোর আইন প্রয়োগ ও জনসচেতনতা অত্যন্ত জরুরি।

পরিশেষে, কুড়িগ্রামের এই দুর্ঘটনা আমাদের সড়ক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকেই আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। একটি ভুলের কারণে তিনটি তাজা প্রাণ ঝরে গেল এবং অনেকগুলো পরিবার পঙ্গুত্বের অভিশাপ নিয়ে বেঁচে থাকবে। সরকার ও সংশ্লিষ্ট মহলের উচিত দ্রুত তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের শাস্তির আওতায় আনা। সেই সাথে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ প্রদানের মাধ্যমে তাদের পাশে দাঁড়ানো রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব।