তাপপ্রবাহ ট্র্যাজেডি যেন মুহূর্তেই বদলে দিল একটি পরিবারের ভাগ্য। মাত্র ১১ দিনের ব্যবধানে স্ত্রী ও ছোট সন্তানকে হারানোর পর এবার প্রাণ হারালেন পরিবারের কর্তা সোবহান আহমদ। ভারতের উত্তর প্রদেশের মাহোবা জেলার চরখারি শহরে ঘটে যাওয়া এই ঘটনা স্থানীয়দের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
তাপপ্রবাহ ট্র্যাজেডির শুরু গত ২৫ মে। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়ে সোবহানের ছয় বছর বয়সী ছেলে হাসনাইন। শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হলে তাকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছিল। কিন্তু পথেই শিশুটির মৃত্যু হয়। পরিবারের জন্য সেটিই ছিল সবচেয়ে বড় ধাক্কা।
ছেলের মৃত্যুর খবর শুনে ভেঙে পড়েন মা রাজিয়া খাতুন। স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, সন্তানের মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার পর তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। কিছু সময়ের মধ্যেই তারও মৃত্যু হয়। একই দিনে মা ও ছেলেকে পাশাপাশি দাফন করা হয় স্থানীয় কবরস্থানে।
এক দিনের মধ্যে স্ত্রী ও সন্তানকে হারিয়ে গভীর মানসিক সংকটে পড়ে যান সোবহান আহমদ। স্বজনদের মতে, তিনি কারও সঙ্গে তেমন কথা বলতেন না। বেশিরভাগ সময় নীরব থাকতেন এবং বারবার স্ত্রী ও সন্তানের কথা স্মরণ করতেন। পরিবারের সদস্যরা তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করলেও তিনি শোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি।
গত শুক্রবার ভোরে সোবহান ঘর থেকে বের হন স্ত্রী ও সন্তানের কবর জিয়ারত করার উদ্দেশ্যে। পরিবারের সদস্যরা ধারণা করেছিলেন, কিছুক্ষণ পর তিনি ফিরে আসবেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। এতে উদ্বিগ্ন হয়ে স্বজনরা তাকে খুঁজতে শুরু করেন।
পরে স্থানীয় কবরস্থানে গিয়ে তারা এক হৃদয়স্পর্শী দৃশ্য দেখতে পান। স্ত্রী ও সন্তানের দুটি কবরের মাঝখানে অচেতন অবস্থায় পড়ে ছিলেন সোবহান। তার একটি হাত ছিল ছেলের কবরে, অন্য হাতটি ছিল স্ত্রীর কবরে। দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
স্বজনদের দাবি, সোবহানের পায়ে একটি ক্ষতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। ফলে ধারণা করা হচ্ছে, কবরস্থানে অবস্থানকালে কোনো বিষাক্ত পোকামাকড় বা সাপ তাকে দংশন করে থাকতে পারে। তবে অনেকের মতে, দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ, গভীর শোক কিংবা হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়াও মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
পরিবারের আত্মীয় মোহাম্মদ সেলিম বলেন, ছোট ছেলে হাসনাইনের মৃত্যুর পর থেকেই সোবহান সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিলেন। তিনি স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন করতে পারছিলেন না। প্রায় প্রতিদিনই তিনি স্ত্রী ও সন্তানের কথা বলতেন এবং তাদের কবরের কাছে যেতে চাইতেন।
আরেক আত্মীয় হালিম মোহাম্মদ জানান, কবরস্থানে সোবহানকে প্রার্থনার ভঙ্গিতে পড়ে থাকতে দেখা যায়। দৃশ্যটি এতটাই আবেগঘন ছিল যে উপস্থিত অনেকেই চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি।
স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, সোবহানের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে ময়নাতদন্তের রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা করা হচ্ছে। রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পরই নিশ্চিতভাবে বলা যাবে তার মৃত্যুর পেছনে কী কারণ কাজ করেছে।
তাপপ্রবাহ ট্র্যাজেডির এই ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, চরম আবহাওয়া শুধু শারীরিক নয়, মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। একটি পরিবারের তিন সদস্যকে হারানোর এই করুণ অধ্যায় এখন পুরো এলাকায় শোকের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
সোবহানের মৃত্যুর পর তার তিন সন্তান সাইফ, রোশনি ও আলিয়া এখন বাবা-মা এবং ছোট ভাইকে হারিয়ে সম্পূর্ণ অনাথ হয়ে পড়েছে। তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা। একের পর এক মৃত্যু যেন মুহূর্তেই বদলে দিয়েছে তাদের জীবনের পুরো গল্প।



























