মাঠে বল গড়াতে আর মাত্র দুই দিন বাকি। অথচ ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় আসর ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ শুরু হওয়ার আগেই নানা বিতর্ক ও অনিশ্চয়তায় ঘিরে পড়েছে। সর্বশেষ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে সোমালিয়ার রেফারি ওমর আরতানকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে না দেওয়ার ঘটনা, যা বিশ্বকাপ আয়োজন ও পরিচালনা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
বিশ্বকাপের জন্য নির্বাচিত হওয়া সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি পাননি আফ্রিকার অন্যতম সেরা রেফারি ওমর আরতান। মায়ামি বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর তাকে দীর্ঘ সময় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং শেষ পর্যন্ত দেশে ফেরত পাঠানো হয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক ফুটবল অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
আরতানের দাবি, তার সব ধরনের কাগজপত্র এবং বৈধ ভিসা ছিল। এরপরও মার্কিন ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা তাকে প্রায় ১১ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করেন। পরে আরও কয়েক ঘণ্টা আটকে রেখে সোমালিয়ায় ফেরত পাঠানো হয়। ফলে বিশ্বকাপে ম্যাচ পরিচালনার স্বপ্ন অধরাই থেকে গেল তার।
গত বছরটি আরতানের জন্য ছিল ক্যারিয়ারের সেরা সময়। ২০২৫ সালে তিনি প্রথম সোমালি রেফারি হিসেবে আফ্রিকান চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনাল পরিচালনা করেন। একই বছর চিলিতে অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপেও গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে দায়িত্ব পালন করে প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন।
আফ্রিকা কাপ অব নেশনসেও সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। বছরের শেষ দিকে আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশনের বর্ষসেরা পুরুষ রেফারির পুরস্কার জেতেন। এসব অর্জনের স্বীকৃতি হিসেবেই তাকে ২০২৬ বিশ্বকাপের জন্য নির্বাচিত করা হয়েছিল।
বিশ্বকাপে দায়িত্ব পাওয়ার খবর আরতানের জন্য ছিল জীবনের অন্যতম বড় অর্জন। কারণ, সোমালিয়ার কোনো রেফারি এর আগে বিশ্বকাপে ম্যাচ পরিচালনার সুযোগ পাননি। সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের অপেক্ষায় থাকলেও শেষ পর্যন্ত বাস্তবতা হয়ে দাঁড়ায় চরম হতাশার।
এক সাক্ষাৎকারে আরতান বলেন, প্রতিটি রেফারির স্বপ্ন থাকে বিশ্বকাপে কাজ করার। দীর্ঘ বছরের পরিশ্রম ও আত্মত্যাগের পর এমন সুযোগ আসে। কিন্তু বিমানবন্দরের একটি সিদ্ধান্ত তার সব স্বপ্ন ভেঙে দিয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এই ঘটনার পর মার্কিন প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। হোয়াইট হাউসের বিশ্বকাপ টাস্কফোর্সের প্রধান অ্যান্ড্রু গিলিয়ানি বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত না বললেও সীমান্ত কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানিয়েছেন। তার বক্তব্য নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
অনেকেই মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অভিবাসন নীতি বিশ্বকাপের মতো আন্তর্জাতিক আসরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। খেলাধুলার বৈশ্বিক উৎসব যেখানে সীমান্ত ও রাজনীতির ঊর্ধ্বে থাকার কথা, সেখানে প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা ও অতিরিক্ত কড়াকড়ি নতুন সংকট তৈরি করছে।
মানবাধিকারবিষয়ক সংগঠন ‘ফেয়ার’-এর নির্বাহী পরিচালক পিয়ারা পওয়ার এ ঘটনাকে নজিরবিহীন বলে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, বিশ্বকাপের জন্য নির্বাচিত একজন অফিসিয়াল রেফারিকে প্রবেশ করতে না দেওয়া আয়োজক দেশ ও ফিফা উভয়ের জন্যই বিব্রতকর।
সাবেক ইংল্যান্ড ও আর্সেনাল তারকা ইয়ান রাইটও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, প্রায় প্রতিদিনই নতুন কোনো বিতর্ক সামনে আসছে। কখনো দর্শক, কখনো কর্মকর্তা, আবার কখনো সাংবাদিকদের নিয়ে জটিলতা তৈরি হচ্ছে।
রাইটের মতে, বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগেই আয়োজকদের নানা সিদ্ধান্ত টুর্নামেন্টের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তার ভাষায়, এটি ধীরে ধীরে বিশৃঙ্খলার বিশ্বকাপে পরিণত হচ্ছে। এমন মন্তব্য বিশ্ব ফুটবল অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
অতীতের বিশ্বকাপগুলোর দিকে তাকালে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। ২০১৮ সালে রাশিয়া বিশেষ ফ্যান আইডি চালু করে বিদেশি সমর্থকদের সহজ প্রবেশ নিশ্চিত করেছিল। একইভাবে ২০২২ সালে কাতার ‘হায়া কার্ড’ ব্যবস্থার মাধ্যমে ভ্রমণ ও ম্যাচ উপভোগকে সহজ করেছিল।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এবারের বিশ্বকাপে পরিস্থিতি ভিন্ন। টিকিটের উচ্চমূল্য, আবাসন ব্যয় এবং পরিবহন খরচ নিয়ে সমালোচনা ছিল আগে থেকেই। এখন তার সঙ্গে যোগ হয়েছে অভিবাসনসংক্রান্ত উদ্বেগ।
বিশেষ করে মার্কিন ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট বা আইসিই-এর উপস্থিতি অনেক দর্শকের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করেছে। মানবাধিকারকর্মীদের মতে, কঠোর নজরদারি ও জিজ্ঞাসাবাদের কারণে অনেক বিদেশি সমর্থক যুক্তরাষ্ট্র সফর নিয়ে দ্বিধায় পড়েছেন।
ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর পূর্বের বক্তব্যও এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে। কয়েক বছর আগে তিনি বলেছিলেন, কোনো দল বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করলে তাদের খেলোয়াড়, কর্মকর্তা ও সমর্থকদের আয়োজক দেশে বাধাহীন প্রবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। সমালোচকদের দাবি, মার্কিন প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের সামনে ফিফা কার্যত অসহায়। ফলে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রভাব ও সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী কয়েকটি দেশের নাগরিকদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। সোমালিয়ার পাশাপাশি ইরান, হাইতি এবং ডিআর কঙ্গোর মতো দেশও এই তালিকায় রয়েছে। ফলে এসব দেশের খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের যাতায়াত নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে ইরান দলকে ঘিরে পরিস্থিতি বেশ জটিল। দেশটির অভিযোগ, তাদের বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ স্টাফ এখনো ভিসা পাননি। এমনকি প্রতিটি ম্যাচের জন্য সীমিত সময়ের প্রবেশ অনুমতির মতো কঠোর শর্তও আরোপ করা হয়েছে বলে দাবি করেছে তারা।
বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে যদি কোনো দল প্রশাসনিক জটিলতার কারণে নির্ধারিত ম্যাচে অংশ নিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে সেটি হবে ইতিহাসের অন্যতম বড় কেলেঙ্কারি। ফুটবল বিশ্লেষকরা বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন।
শুধু আরতান বা ইরান নয়, বিভিন্ন দেশের খেলোয়াড় ও কর্মকর্তারাও ভিসা এবং ইমিগ্রেশন জটিলতার অভিযোগ তুলেছেন। কেউ দীর্ঘ সময় জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হয়েছেন, আবার কেউ দেরিতে দলের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন।
এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বকাপের নিয়ন্ত্রণ আসলে কার হাতে—ফিফার নাকি আয়োজক দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের—সেই প্রশ্ন ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। ফুটবল মাঠে খেলা শুরু হওয়ার আগেই বিশ্বকাপের অন্যতম বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে অভিবাসন ও রাজনীতি।
ফিফা অবশ্য জানিয়েছে, ভিসা ও সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট দেশের দায়িত্ব। তবে সমালোচকদের প্রশ্ন, সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলো আগে থেকেই জানা থাকলে ফিফা কেন আরও কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি।
বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগে এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা, মাঠের খেলা যেন শেষ পর্যন্ত মাঠেই সীমাবদ্ধ থাকে। কারণ কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমী রাজনৈতিক বিতর্ক নয়, দেখতে চান বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়দের লড়াই। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি বলছে, ২০২৬ বিশ্বকাপের গল্পে ফুটবলের পাশাপাশি রাজনীতি ও অভিবাসন ইস্যুও সমান গুরুত্ব নিয়ে জায়গা করে নিয়েছে।





























