মোবাইল ফোন একসময় শুধু যোগাযোগের মাধ্যমই ছিল না, বরং ব্যক্তিত্ব প্রকাশেরও একটি উপায় ছিল। পছন্দের গান বা সুরকে রিংটোন হিসেবে ব্যবহার করা ছিল তরুণদের কাছে বেশ জনপ্রিয় একটি বিষয়। তবে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রবণতায় এসেছে বড় পরিবর্তন। সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, বর্তমান তরুণ প্রজন্মের বড় একটি অংশ মোবাইল ফোন সাইলেন্ট মোডে রাখতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে এবং রিংটোন ব্যবহারের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে।
যুক্তরাজ্যের মুঠোফোন অ্যাপ বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান সেন্সর টাওয়ার পরিচালিত ‘জেনারেশন মিউট’ নামের এক জরিপে এই চিত্র উঠে এসেছে। জরিপের জন্য ১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। গবেষণার ফলাফল বলছে, ডিজিটাল যোগাযোগের ধরন বদলে যাওয়ার কারণে রিংটোনের প্রয়োজনীয়তাও কমে যাচ্ছে।
জরিপ অনুযায়ী, রিংটোন ডাউনলোডের সংখ্যা গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০১৬ সালে তরুণদের মধ্যে রিংটোন ডাউনলোড হয়েছিল প্রায় ৪৬ লাখ বার। ২০২০ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৩৭ লাখে। অথচ ২০০৪ সালে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ৪ কোটি। এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে যে, নতুন প্রজন্মের কাছে রিংটোনের জনপ্রিয়তা আগের মতো নেই।
২০১৭ সালে পরিচালিত আরেকটি জরিপে দেখা গিয়েছিল, ১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে মাত্র ১৫ শতাংশ মনে করতেন যোগাযোগের জন্য রিংটোন প্রয়োজন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই হার আরও কমেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ বর্তমানে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হিসেবে ফোন কলের পরিবর্তে বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে।
তরুণদের মোবাইল সাইলেন্ট রাখার পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে—
- ই-মেইল ও মেসেজিং অ্যাপের ব্যবহার বৃদ্ধি।
- ফোন কলের তুলনায় টেক্সট মেসেজে বেশি যোগাযোগ।
- সবসময় ফোনের স্ক্রিনে নজর রাখার অভ্যাস।
- শব্দহীন ও ব্যক্তিগত যোগাযোগের প্রতি আগ্রহ।
- সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমনির্ভর জীবনযাপন।
বর্তমান সময়ে অধিকাংশ তরুণ যোগাযোগের জন্য ম্যাসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম কিংবা অন্যান্য মেসেজিং অ্যাপ ব্যবহার করে থাকে। এসব প্ল্যাটফর্মে দ্রুত এবং নীরবে বার্তা আদান-প্রদান করা যায়। ফলে ফোন বেজে ওঠার প্রয়োজনীয়তা আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। অনেকেই মনে করেন, উচ্চ শব্দের রিংটোন কর্মক্ষেত্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা সামাজিক পরিবেশে অস্বস্তির কারণ হতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বর্তমান প্রজন্ম দিনের বড় একটি সময় স্মার্টফোনের স্ক্রিনে কাটায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিও দেখা, অনলাইন ক্লাস, গেমিং কিংবা বিভিন্ন অ্যাপ ব্যবহারের কারণে তারা প্রায় সবসময়ই ফোনের কাছাকাছি থাকে। ফলে কোনো নোটিফিকেশন, কল বা বার্তা এলে তাৎক্ষণিকভাবে দেখে নেওয়া সম্ভব হয়। এ কারণে রিংটোনের ওপর নির্ভরশীলতা কমে যাচ্ছে।
প্রযুক্তিবিদদের মতে, স্মার্টফোন ব্যবহারের ধরণ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের যোগাযোগের অভ্যাসও বদলেছে। একসময় ফোন কল ছিল প্রধান যোগাযোগ মাধ্যম, কিন্তু এখন তা জায়গা ছেড়ে দিয়েছে তাৎক্ষণিক মেসেজিং সেবাকে। তরুণদের কাছে দ্রুত, সহজ এবং নীরব যোগাযোগই বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, প্রযুক্তির অগ্রগতি এবং ডিজিটাল যোগাযোগের বিস্তারের কারণে মোবাইল ফোনের রিংটোন ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারাচ্ছে। নতুন প্রজন্ম শব্দের পরিবর্তে নীরব যোগাযোগে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে। আর এ কারণেই তাদের অনেকের ফোনই দিনের বেশিরভাগ সময় সাইলেন্ট মোডে থাকে।





























