ঢাকা ০৭:৫৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬, ১০ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

এসএমই খাতকে চাঙ্গা করা সরকারের অগ্রাধিকার : শিল্পমন্ত্রী

নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে এসএমই খাত।। ছবি: সংগৃহীত

এসএমই খাতকে চাঙ্গা করা সরকারের অগ্রাধিকার : শিল্পমন্ত্রী

দেশের অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করা, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এসএমই (ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প) খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং অর্থনীতিতে গতি আনতে এসএমই খাতকে চাঙ্গা করা সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। ব্যবসা শুরু থেকে পণ্য আমদানি কিংবা রপ্তানি পর্যন্ত দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে আনতে সরকার ইতোমধ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে এবং ভবিষ্যতে আরও সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে।

বুধবার (২৪ জুন) রাজধানীতে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ)-এর সহযোগিতায় এবং এসএমই ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আয়োজিত ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭: এসএমই খাতের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

অনুষ্ঠানে শিল্পমন্ত্রী বলেন, একটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও শিল্পায়নের গতি অনেকাংশে নির্ভর করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতের সম্প্রসারণের ওপর। বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং স্থানীয় পর্যায়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বিস্তারে এসএমই খাতের অবদান তুলনামূলকভাবে বেশি।

তিনি বলেন, বর্তমানে ব্যবসা শুরু করা, প্রয়োজনীয় অনুমোদন গ্রহণ, কাঁচামাল আমদানি কিংবা উৎপাদিত পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের নানা ধরনের প্রশাসনিক জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়। এসব জটিলতা কমিয়ে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে সরকার কাজ করছে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান স্থাপন থেকে শুরু করে আমদানি-রপ্তানি প্রক্রিয়ার সময় ৩৫৫ দিন থেকে কমিয়ে মাত্র ১৪ দিনে নিয়ে আসার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

শিল্পমন্ত্রীর মতে, সময় ও ব্যয় কমাতে পারলে নতুন উদ্যোক্তারা আরও বেশি উৎসাহিত হবেন। একই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছেও বাংলাদেশ একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে বিবেচিত হবে। ফলে শিল্পায়নের গতি বাড়বে এবং অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ হবে।

তিনি আরও বলেন, শুধু নীতিগত সংস্কার করলেই হবে না, শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ উৎপাদনমুখী শিল্পে বিদ্যুতের ঘাটতি বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। সরকার এ বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে এবং শিল্পাঞ্চলগুলোতে বিরতিহীন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।

অনুষ্ঠানে শিল্পমন্ত্রী ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতের বর্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দেশের লাখো মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এসএমই খাতের সঙ্গে যুক্ত। এই খাত শুধু উৎপাদন বৃদ্ধি করে না, বরং নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করে, স্থানীয় সম্পদের ব্যবহার নিশ্চিত করে এবং আঞ্চলিক অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে।

তার মতে, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য এসএমই খাতকে আরও প্রতিযোগিতামূলক ও আধুনিক করে তুলতে হবে। এজন্য প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং সহজ অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণ জরুরি।

খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির জানান, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য নতুন করে আরও বিসিক শিল্পপার্ক স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব শিল্পপার্কে উদ্যোক্তারা আধুনিক অবকাঠামো সুবিধা, প্রয়োজনীয় সেবা এবং ব্যবসা পরিচালনার জন্য সহায়ক পরিবেশ পাবেন।

তিনি বলেন, সরকার আগামী কয়েক বছরে এসএমই খাতে প্রায় পাঁচ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে চায়। দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীকে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা এবং নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের মাধ্যমে এই লক্ষ্য অর্জনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

শিল্পমন্ত্রী অতীত সরকারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, বিগত সরকার স্বল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ ঋণ গ্রহণ করেছিল। কিন্তু সেই ঋণের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত না হওয়ায় অর্থনৈতিক উন্নয়নে তার প্রত্যাশিত প্রতিফলন দেখা যায়নি। ফলে বর্তমানে অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী ও টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে নতুন করে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা মনে করেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্য এসএমই খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। কারণ এই খাত তুলনামূলক কম বিনিয়োগে বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে সক্ষম। একই সঙ্গে গ্রামীণ ও শহুরে অর্থনীতির মধ্যে একটি কার্যকর সংযোগ তৈরি করে।

অনেক বক্তা বলেন, দেশের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো সহজ শর্তে ঋণপ্রাপ্তি। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে ঋণ নিতে গিয়ে অনেক সময় উদ্যোক্তারা জটিল প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হন। ফলে অনেক সম্ভাবনাময় উদ্যোগ শুরু হওয়ার আগেই থেমে যায়।

তারা মনে করেন, সহজ অর্থায়ন নিশ্চিত করা গেলে দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে নতুন বিনিয়োগ বাড়বে এবং কর্মসংস্থানও বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ সহায়তা কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করার আহ্বান জানানো হয়।

সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার হোসেন চৌধুরী এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদস্য ব্যারিস্টার মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী।

এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, দেশের অর্থনীতিতে এসএমই খাতের অবদান ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে উৎপাদন, সেবা এবং বাণিজ্য খাতে এই খাতের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে পৌঁছেছে। তবে সম্ভাবনার তুলনায় এখনও অনেক পথ এগিয়ে যেতে হবে।

তিনি বলেন, উদ্যোক্তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা উন্নয়ন এবং বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি করতে এসএমই ফাউন্ডেশন নিয়মিত কাজ করছে। দেশীয় উদ্যোক্তাদের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সক্ষমতা বাড়ানোর জন্যও বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদস্য ব্যারিস্টার মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী বলেন, কর ব্যবস্থাকে আরও ব্যবসাবান্ধব করতে সরকার কাজ করছে। রাজস্ব আদায়ের পাশাপাশি ব্যবসার বিকাশ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য কর কাঠামো সহজ করা এবং অনলাইনভিত্তিক সেবা সম্প্রসারণের বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এসএমই ফাউন্ডেশনের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন। তিনি বলেন, জাতীয় অর্থনীতিতে এসএমই খাতের অবদান আরও বাড়াতে হলে দীর্ঘমেয়াদি নীতি সহায়তা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রযুক্তি, উদ্ভাবন এবং বাজার সংযোগ বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে।

তিনি উল্লেখ করেন, বিশ্বব্যাপী ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতকে অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়। উন্নত ও উন্নয়নশীল উভয় ধরনের দেশেই কর্মসংস্থান এবং উৎপাদন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এসএমই খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন এসএমই ফাউন্ডেশনের উপ-মহাব্যবস্থাপক মুহাম্মদ মোরশেদ আলম। তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে হলে এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। নীতিগত সহায়তা, অর্থায়ন, প্রযুক্তি এবং প্রশিক্ষণের সমন্বিত উদ্যোগই এ খাতকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।

সভায় সভাপতিত্ব করেন ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি দৌলত আকতার মালা। তিনি বলেন, বাজেট প্রণয়নের সময় এসএমই উদ্যোক্তাদের বাস্তব সমস্যাগুলো বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। কারণ দেশের অর্থনীতির একটি বড় অংশ এই খাতের ওপর নির্ভরশীল।

মতবিনিময় সভায় অংশ নেওয়া বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিরা বলেন, অবকাঠামো উন্নয়ন, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, সহজ ঋণ এবং প্রশাসনিক জটিলতা হ্রাস করা গেলে এসএমই খাত আরও দ্রুত এগিয়ে যাবে।

তারা মনে করেন, দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে উদ্যোক্তা হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। এই সুযোগকে কাজে লাগাতে হলে উদ্যোক্তাদের জন্য প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি সহায়তা এবং বাজার ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে, এসএমই খাতকে চাঙ্গা করার বিষয়ে সরকারের অঙ্গীকার নতুন করে স্পষ্ট হয়েছে শিল্পমন্ত্রীর বক্তব্যে। ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি, প্রশাসনিক জটিলতা কমানো, বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা, নতুন শিল্পপার্ক স্থাপন এবং পাঁচ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির মতো পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাত নতুন গতি পাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতায় এসএমই খাতকে শক্তিশালী করা শুধু একটি খাতের উন্নয়ন নয়, বরং সামগ্রিক জাতীয় অর্থনীতিকে আরও টেকসই ও গতিশীল করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

এসএমই খাতকে চাঙ্গা করা সরকারের অগ্রাধিকার : শিল্পমন্ত্রী

Update Time : ০৬:৩০:১৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬

এসএমই খাতকে চাঙ্গা করা সরকারের অগ্রাধিকার : শিল্পমন্ত্রী

দেশের অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করা, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এসএমই (ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প) খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং অর্থনীতিতে গতি আনতে এসএমই খাতকে চাঙ্গা করা সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। ব্যবসা শুরু থেকে পণ্য আমদানি কিংবা রপ্তানি পর্যন্ত দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে আনতে সরকার ইতোমধ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে এবং ভবিষ্যতে আরও সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে।

বুধবার (২৪ জুন) রাজধানীতে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ)-এর সহযোগিতায় এবং এসএমই ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আয়োজিত ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭: এসএমই খাতের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

অনুষ্ঠানে শিল্পমন্ত্রী বলেন, একটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও শিল্পায়নের গতি অনেকাংশে নির্ভর করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতের সম্প্রসারণের ওপর। বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং স্থানীয় পর্যায়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বিস্তারে এসএমই খাতের অবদান তুলনামূলকভাবে বেশি।

তিনি বলেন, বর্তমানে ব্যবসা শুরু করা, প্রয়োজনীয় অনুমোদন গ্রহণ, কাঁচামাল আমদানি কিংবা উৎপাদিত পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের নানা ধরনের প্রশাসনিক জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়। এসব জটিলতা কমিয়ে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে সরকার কাজ করছে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান স্থাপন থেকে শুরু করে আমদানি-রপ্তানি প্রক্রিয়ার সময় ৩৫৫ দিন থেকে কমিয়ে মাত্র ১৪ দিনে নিয়ে আসার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

শিল্পমন্ত্রীর মতে, সময় ও ব্যয় কমাতে পারলে নতুন উদ্যোক্তারা আরও বেশি উৎসাহিত হবেন। একই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছেও বাংলাদেশ একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে বিবেচিত হবে। ফলে শিল্পায়নের গতি বাড়বে এবং অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ হবে।

তিনি আরও বলেন, শুধু নীতিগত সংস্কার করলেই হবে না, শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ উৎপাদনমুখী শিল্পে বিদ্যুতের ঘাটতি বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। সরকার এ বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে এবং শিল্পাঞ্চলগুলোতে বিরতিহীন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।

আরও পড়ুন  লাগামহীন বাজার দর : মাছ, মুরগি , সবজি ও তেলের দাম বাড়ায় দিশেহারা সাধারণ মানুষ।

অনুষ্ঠানে শিল্পমন্ত্রী ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতের বর্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দেশের লাখো মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এসএমই খাতের সঙ্গে যুক্ত। এই খাত শুধু উৎপাদন বৃদ্ধি করে না, বরং নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করে, স্থানীয় সম্পদের ব্যবহার নিশ্চিত করে এবং আঞ্চলিক অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে।

তার মতে, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য এসএমই খাতকে আরও প্রতিযোগিতামূলক ও আধুনিক করে তুলতে হবে। এজন্য প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং সহজ অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণ জরুরি।

খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির জানান, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য নতুন করে আরও বিসিক শিল্পপার্ক স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব শিল্পপার্কে উদ্যোক্তারা আধুনিক অবকাঠামো সুবিধা, প্রয়োজনীয় সেবা এবং ব্যবসা পরিচালনার জন্য সহায়ক পরিবেশ পাবেন।

তিনি বলেন, সরকার আগামী কয়েক বছরে এসএমই খাতে প্রায় পাঁচ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে চায়। দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীকে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা এবং নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের মাধ্যমে এই লক্ষ্য অর্জনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

শিল্পমন্ত্রী অতীত সরকারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, বিগত সরকার স্বল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ ঋণ গ্রহণ করেছিল। কিন্তু সেই ঋণের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত না হওয়ায় অর্থনৈতিক উন্নয়নে তার প্রত্যাশিত প্রতিফলন দেখা যায়নি। ফলে বর্তমানে অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী ও টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে নতুন করে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা মনে করেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্য এসএমই খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। কারণ এই খাত তুলনামূলক কম বিনিয়োগে বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে সক্ষম। একই সঙ্গে গ্রামীণ ও শহুরে অর্থনীতির মধ্যে একটি কার্যকর সংযোগ তৈরি করে।

আরও পড়ুন  এআই দিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগ, সিন্ডিকেট বন্ধের আশ্বাস বাণিজ্যমন্ত্রীর

অনেক বক্তা বলেন, দেশের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো সহজ শর্তে ঋণপ্রাপ্তি। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে ঋণ নিতে গিয়ে অনেক সময় উদ্যোক্তারা জটিল প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হন। ফলে অনেক সম্ভাবনাময় উদ্যোগ শুরু হওয়ার আগেই থেমে যায়।

তারা মনে করেন, সহজ অর্থায়ন নিশ্চিত করা গেলে দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে নতুন বিনিয়োগ বাড়বে এবং কর্মসংস্থানও বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ সহায়তা কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করার আহ্বান জানানো হয়।

সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার হোসেন চৌধুরী এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদস্য ব্যারিস্টার মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী।

এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, দেশের অর্থনীতিতে এসএমই খাতের অবদান ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে উৎপাদন, সেবা এবং বাণিজ্য খাতে এই খাতের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে পৌঁছেছে। তবে সম্ভাবনার তুলনায় এখনও অনেক পথ এগিয়ে যেতে হবে।

তিনি বলেন, উদ্যোক্তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা উন্নয়ন এবং বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি করতে এসএমই ফাউন্ডেশন নিয়মিত কাজ করছে। দেশীয় উদ্যোক্তাদের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সক্ষমতা বাড়ানোর জন্যও বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদস্য ব্যারিস্টার মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী বলেন, কর ব্যবস্থাকে আরও ব্যবসাবান্ধব করতে সরকার কাজ করছে। রাজস্ব আদায়ের পাশাপাশি ব্যবসার বিকাশ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য কর কাঠামো সহজ করা এবং অনলাইনভিত্তিক সেবা সম্প্রসারণের বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এসএমই ফাউন্ডেশনের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন। তিনি বলেন, জাতীয় অর্থনীতিতে এসএমই খাতের অবদান আরও বাড়াতে হলে দীর্ঘমেয়াদি নীতি সহায়তা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রযুক্তি, উদ্ভাবন এবং বাজার সংযোগ বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে।

আরও পড়ুন  ৬ সংস্থা বিলুপ্ত করে গঠন হচ্ছে নতুন ‘বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থা’

তিনি উল্লেখ করেন, বিশ্বব্যাপী ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতকে অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়। উন্নত ও উন্নয়নশীল উভয় ধরনের দেশেই কর্মসংস্থান এবং উৎপাদন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এসএমই খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন এসএমই ফাউন্ডেশনের উপ-মহাব্যবস্থাপক মুহাম্মদ মোরশেদ আলম। তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে হলে এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। নীতিগত সহায়তা, অর্থায়ন, প্রযুক্তি এবং প্রশিক্ষণের সমন্বিত উদ্যোগই এ খাতকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।

সভায় সভাপতিত্ব করেন ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি দৌলত আকতার মালা। তিনি বলেন, বাজেট প্রণয়নের সময় এসএমই উদ্যোক্তাদের বাস্তব সমস্যাগুলো বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। কারণ দেশের অর্থনীতির একটি বড় অংশ এই খাতের ওপর নির্ভরশীল।

মতবিনিময় সভায় অংশ নেওয়া বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিরা বলেন, অবকাঠামো উন্নয়ন, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, সহজ ঋণ এবং প্রশাসনিক জটিলতা হ্রাস করা গেলে এসএমই খাত আরও দ্রুত এগিয়ে যাবে।

তারা মনে করেন, দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে উদ্যোক্তা হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। এই সুযোগকে কাজে লাগাতে হলে উদ্যোক্তাদের জন্য প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি সহায়তা এবং বাজার ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে, এসএমই খাতকে চাঙ্গা করার বিষয়ে সরকারের অঙ্গীকার নতুন করে স্পষ্ট হয়েছে শিল্পমন্ত্রীর বক্তব্যে। ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি, প্রশাসনিক জটিলতা কমানো, বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা, নতুন শিল্পপার্ক স্থাপন এবং পাঁচ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির মতো পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাত নতুন গতি পাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতায় এসএমই খাতকে শক্তিশালী করা শুধু একটি খাতের উন্নয়ন নয়, বরং সামগ্রিক জাতীয় অর্থনীতিকে আরও টেকসই ও গতিশীল করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।