ডিম আগে না মুরগি – এই চিরচেনা প্রশ্নটি যুগ যুগ ধরে বিজ্ঞান ও দর্শনের জগতে এক অমীমাংসিত রহস্য হিসেবে আলোচিত হয়ে আসছে। আড্ডার ছলে হোক বা গুরুগম্ভীর তর্কে, এই একটি প্রশ্ন মানুষকে সবসময়ই ভাবিয়েছে। তবে দীর্ঘদিন ধরে চলা এই বিতর্কের অবসান ঘটাতে বিজ্ঞানীরা নিরলস চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। অবশেষে হয়তো এই জটিল ধাঁধার একটি গ্রহণযোগ্য ও বিজ্ঞানসম্মত সমাধান খুঁজে পেয়েছেন সুইজারল্যান্ডের জেনেভা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক।
সম্প্রতি পরিচালিত এই যুগান্তকারী গবেষণাটি করা হয়েছে ‘ক্রোমোসফেরা পারকিনস্কি’ নামের একটি প্রাচীন এককোষী জীবকে কেন্দ্র করে। এই বিশেষ এককোষী জীবটি ২০১৭ সালে হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের গভীর সমুদ্রতল থেকে প্রথমবারের মতো আবিষ্কৃত হয়েছিল। বিজ্ঞানীরা এই জীবটির জীবনচক্র ও গঠন বিশ্লেষণ করতে গিয়ে এমন কিছু চমকপ্রদ তথ্য পেয়েছেন, যা বিজ্ঞানীদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে এবং প্রাণের উৎপত্তি নিয়ে গবেষণায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
গবেষকদের মতে, পৃথিবীতে ১০০ কোটি বছরেরও বেশি সময় ধরে টিকে থাকা এই প্রাচীন জীবটি এমন কিছু বিশেষ কোষ তৈরি করতে সক্ষম, যা পুরোপুরি একটি ডিম বা ভ্রূণের মতো কাজ করে। এই বিস্ময়কর আবিষ্কার থেকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, প্রকৃতিতে ডিম তৈরির জটিল পদ্ধতিটি পৃথিবীতে বহুকোষী প্রাণীর উদ্ভবের অনেক আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল। অর্থাৎ, মুরগি নামক প্রাণীর অস্তিত্বের বহু আগেই ডিমের গঠন প্রকৃতিতে তৈরি হয়েছিল।
এই গবেষণাপত্রের অন্যতম সহলেখক ওমায়া দুদিন জানিয়েছেন যে, যদিও এটি একটি এককোষী জীব, তবুও এটি বহুকোষী প্রাণীর মতো জটিল গঠন তৈরিতে পুরোপুরি সক্ষম। গবেষণার আরেক গুরুত্বপূর্ণ সদস্য মারিন অলিভেটার মতে, এই অভাবনীয় আবিষ্কার পৃথিবীর প্রাচীন ইতিহাস ও প্রাণের উৎপত্তি সম্পর্কে আমাদের বিদ্যমান ধারণাকে আরও সমৃদ্ধ করছে। তাদের দীর্ঘ গবেষণার মাধ্যমেই জানা গেছে যে, প্রাচীন পৃথিবীতে এ ধরনের কোষ বিভাজনের মাধ্যমে ডিম ধীরে ধীরে গঠিত হতে শুরু করেছিল।
বিজ্ঞানের অন্যান্য গবেষণা থেকেও জানা যায় যে, মুরগির ডিমের মতো শক্ত খোলসবিশিষ্ট ডিমের অস্তিত্ব পৃথিবীতে প্রায় ৩০ কোটি বছর আগে থেকেই ছিল। সময়ের পরিক্রমায় সেই প্রাচীন ডিম্বাকার কোষগুলো বিবর্তিত হয়ে আজকের রূপ পেয়েছে। পরবর্তীতে মানুষ খাদ্যের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সহজলভ্য উৎস হিসেবে ডিমের বিশাল চাহিদা পূরণে হাজার হাজার বছর আগে বুনো মুরগিকে নিজেদের ঘরে পালন করা শুরু করে।
সুতরাং সব মিলিয়ে বিজ্ঞান এখন এই রায়ই দিচ্ছে যে, ডিম আগে না মুরগি বিতর্কে ডিমই আসলে বিজয়ী।




























