দেশে রেকর্ড লোডশেডিং এখন আর কেবল একটি শব্দ নয়, বরং সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের এক ভয়াবহ আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত কয়েকদিন ধরে হঠাৎ করেই তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করায় এই বিদ্যুৎ সংকট যেন আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। নির্দিষ্ট কোনো সময়সূচি ছাড়াই দিন বা রাত, যেকোনো সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ গায়েব হয়ে যাচ্ছে। ফলে তীব্র গরমে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শিশু ও বৃদ্ধদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে, যা জনজীবনকে পুরোপুরি বিপর্যস্ত করে তুলেছে।
দেশের বিভিন্ন প্রান্তের গ্রাহকদের অভিযোগ, কোথাও কোথাও ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ থাকছে না। এই ভয়াবহ পরিস্থিতির কারণে কেবল যে গৃহস্থালি কাজে ব্যাঘাত ঘটছে তা নয়, বরং থমকে যাচ্ছে গোটা দেশের অর্থনীতির চাকা। একদিকে যেমন কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি হাসপাতালগুলোতে বিঘ্নিত হচ্ছে জরুরি স্বাস্থ্যসেবা।
এই রেকর্ড লোডশেডিং এর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে প্রান্তিক আয়ের মানুষের ওপর, বিশেষ করে পোলট্রি খামারি এবং জেলেদের ওপর। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় খামারে ব্রয়লার ও লেয়ার মুরগি মারা গিয়ে খামারিদের পথে বসার উপক্রম হয়েছে। অন্যদিকে, বরফ কলগুলোতে উৎপাদন বন্ধ থাকায় মাছ সংরক্ষণের অভাবে জেলেরা সাগরে মাছ ধরতে যেতে পারছেন না। বিশেষ করে রংপুর, সিলেট, রাজশাহী, ময়মনসিংহ এবং বরিশাল অঞ্চলের পরিস্থিতি এখন সবচেয়ে বেশি শোচনীয়।
সরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোর ওয়েবসাইটের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শনিবার মধ্যরাত থেকে রোববার রাত ১০টা পর্যন্ত দেশের বেশিরভাগ জায়গায় তিন হাজার মেগাওয়াটের বেশি ঘাটতি ছিল। বিশেষ করে রোববার বিকেল ৩টায় যখন দেশের মোট বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৫১ মেগাওয়াট, ঠিক সেই মুহূর্তেই দেশে রেকর্ড লোডশেডিং করা হয় ৩ হাজার ৬৭১ মেগাওয়াট। এর আগে গত ৩ আগস্ট সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৫১২ মেগাওয়াট ঘাটতি ছিল, আর গত বছরের ২৭ জুন সর্বোচ্চ ঘাটতি রেকর্ড করা হয়েছিল ৩ হাজার ৪১৯ মেগাওয়াট।
হঠাৎ করে কেন এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ তুলে ধরেছেন। তারা জানাচ্ছেন, বর্তমানে দেশে তীব্র গ্যাস সংকট চলছে যা বিদ্যুৎ উৎপাদনে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। এর পাশাপাশি দেশের অন্যতম বড় পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিটের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে এবং ভারত থেকে আসা আদানি গ্রুপের বিদ্যুৎ সরবরাহও আগের তুলনায় বেশ কমে গেছে।
সব মিলিয়ে এই বহুমুখী সংকটের কারণেই মূলত দেশে এমন রেকর্ড লোডশেডিং পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। দ্রুত এই সমস্যার সমাধান না হলে সামনে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন।
























