ঢাকা ০৭:০৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ৪ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
Logo কান্না থামা, নাইলে মাইরা ফালামু’ বলে বাচ্চার মুখ চেপে ধরে হত্যার অভিযোগ Logo নারায়ণগঞ্জে পানির ট্যাংক পরিষ্কার করতে গিয়ে দুই শ্রমিকের মৃত্যু Logo রূপপুরে জ্বালানি লোডিংয়ের অনুমোদন, পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় অগ্রগতি Logo ঢাকা আসছেন মার্কিন বিশেষ দূত চার্লস জে. হার্ডার, গুরুত্ব পাবে শিশু কল্যাণ ও শিক্ষা Logo ইন্দোনেশিয়ায় হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় ৮ নিহত, দুর্গম জঙ্গলে বিধ্বস্ত Logo কক্সবাজারে বৃষ্টির ধাক্কা, কম দামে বিপাকে ৪২ হাজার লবণচাষি Logo ইন্দোনেশিয়ায় হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত, ৮ আরোহীর মর্মান্তিক মৃত্যু Logo শিশুর শরীরে কালো দাগ কেন হয়? অ্যাকাথোসিস নিগ্রিক্যানস ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি জানুন Logo আয়োকিগাহারা ফরেস্ট: জাপানের রহস্যময় ‘সুইসাইড ফরেস্ট’ এর অজানা সত্য Logo মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমার ইঙ্গিতে তেলের দামে নিম্নগতি

হাওরে বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকছে, ফসল রক্ষায় প্রাণপণ লড়াই

  • Taslima Khanom
  • Update Time : ০৩:৩৯:২২ অপরাহ্ন, শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২৬
  • ৫১৬

চিত্রঃ হাওরে বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকছে

সুনামগঞ্জের হাওরে আকস্মিক বাঁধ ভেঙে প্রবল বেগে পানি ঢুকে পড়ায় শত শত একর জমির আধাপাকা বোরো ধান মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েছে। এই ঘটনায় পুরো এলাকার কৃষকদের মধ্যে চরম উৎকণ্ঠা ও হতাশা বিরাজ করছে। হাওরের বিস্তীর্ণ জমি ধীরে ধীরে পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে। এতে বছরের পরিশ্রম হারানোর আশঙ্কায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকরা।

শনিবার দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, গুজাউনি বাঁধের একটি বড় অংশ ভেঙে গেছে। সেই ভাঙা অংশ দিয়ে দ্রুতগতিতে পানি প্রবেশ করছে দেখার হাওরে। প্রবল স্রোতের কারণে আশপাশের জমিগুলো দ্রুত প্লাবিত হচ্ছে। কৃষকরা অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য দেখছেন, যা তাদের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক। হাওরের পাড়ে দাঁড়িয়ে অনেক কৃষক কান্নাজড়িত কণ্ঠে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার করে দেশের মানুষের কাছে সাহায্যের আবেদন জানান। তারা বলছেন, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পুরো ফসলই পানির নিচে চলে যাবে। এমন পরিস্থিতিতে তাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন তারা। এই দৃশ্য পুরো এলাকায় আবেগঘন পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বাঁধের পাশের একটি বিলের ইজারাদার মাছ আহরণ শেষে বাঁধটি যথাযথভাবে সংস্কার করেননি। ফলে বাঁধটি দুর্বল অবস্থায় পড়ে ছিল দীর্ঘদিন ধরে। অতিরিক্ত পানির চাপ সৃষ্টি হলে সেই দুর্বল অংশই ভেঙে যায়। এতে করে হাওরে আকস্মিকভাবে পানি ঢুকে পড়ে এবং ফসলের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়। স্থানীয় কৃষক স্বপন মিয়া জানান, এই হাওরে কয়েক হাজার একর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করা হয়েছে। বাঁধটি যদি দ্রুত মেরামত করা না যায়, তাহলে পুরো ফসলই পানির নিচে তলিয়ে যাবে। তিনি বলেন, আমরা সারা বছর এই ফসলের জন্য পরিশ্রম করি। এখন যদি সব শেষ হয়ে যায়, তাহলে আমাদের বাঁচার উপায় থাকবে না।

তিনি আরও বলেন, উথারিয়া বাঁধ কেটে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা গেলে ক্ষতি অনেকটাই কমানো যেত। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেই ধরনের কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। দ্রুত সিদ্ধান্ত না নিলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। কৃষকদের এই উদ্বেগ দিন দিন আরও বাড়ছে। আরেক কৃষক মিজানুর রহমান বলেন, বিলের মালিক ঠিকমতো বাঁধ সংস্কার না করায় আজ এই দুর্ভোগের সৃষ্টি হয়েছে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, আগে থেকেই যদি বাঁধটি মজবুত করা হতো, তাহলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতো না। এখন সবাই মিলে চেষ্টা করলেও পুরো ক্ষতি ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়ছে।

এদিকে খবর পেয়ে স্থানীয় প্রশাসন এবং এলাকাবাসী একযোগে বাঁধ রক্ষার কাজে নেমে পড়েন। বাঁশ, বস্তা ও অন্যান্য উপকরণ ব্যবহার করে তারা ভাঙা অংশ বন্ধ করার চেষ্টা চালান। অনেকেই নিজের উদ্যোগে শ্রম দিয়ে এই কাজে অংশ নিচ্ছেন। জীবন-জীবিকার প্রশ্নে কৃষকরা নিজেদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী খায়রুল ইসলাম ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি জানান, জরুরি ভিত্তিতে বাঁধ রক্ষার কাজ শুরু করা হয়েছে। প্রায় একশ জিও ব্যাগ এবং বাঁশ ব্যবহার করে ভাঙা অংশ বন্ধ করার চেষ্টা চলছে। এতে আপাতত পানি ঢোকা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে।

তিনি আরও জানান, এখন পানি প্রবেশ বন্ধ রয়েছে এবং পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে। তবে সম্পূর্ণভাবে ঝুঁকি কাটেনি বলে সতর্ক থাকতে হবে। সংশ্লিষ্ট সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে এই সংকট মোকাবিলায়। আশা করা হচ্ছে, দ্রুত পদক্ষেপের ফলে বড় ধরনের ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন, এই বাঁধটি তাদের সরাসরি আওতাধীন নয়। তবুও কৃষকদের ফসল রক্ষার জন্য তারা উদ্যোগ নিয়েছেন। একটি দল ইতোমধ্যে এলাকায় কাজ শুরু করেছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছে। মানবিক দিক বিবেচনায় তারা এই পদক্ষেপ নিয়েছেন।

স্থানীয়দের মতে, হাওরের বাঁধগুলো নিয়মিত সংস্কার না করায় প্রতি বছরই এমন ঝুঁকি তৈরি হয়। যথাসময়ে সংস্কার কাজ সম্পন্ন হলে এই ধরনের বিপর্যয় অনেকটাই এড়ানো সম্ভব। তারা দাবি করেন, ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের ঘটনা না ঘটে, সে জন্য স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন। না হলে প্রতি মৌসুমেই কৃষকদের এমন দুর্ভোগ পোহাতে হবে।

এই পরিস্থিতিতে কৃষকরা সরকারের কাছে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন। তারা চান, ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য আর্থিক সহায়তা এবং বাঁধের স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করা হোক। অন্যথায় তাদের জীবিকা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। হাওরের এই সংকট এখন পুরো অঞ্চলের মানুষের জন্য বড় এক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

কান্না থামা, নাইলে মাইরা ফালামু’ বলে বাচ্চার মুখ চেপে ধরে হত্যার অভিযোগ

হাওরে বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকছে, ফসল রক্ষায় প্রাণপণ লড়াই

Update Time : ০৩:৩৯:২২ অপরাহ্ন, শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২৬

সুনামগঞ্জের হাওরে আকস্মিক বাঁধ ভেঙে প্রবল বেগে পানি ঢুকে পড়ায় শত শত একর জমির আধাপাকা বোরো ধান মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েছে। এই ঘটনায় পুরো এলাকার কৃষকদের মধ্যে চরম উৎকণ্ঠা ও হতাশা বিরাজ করছে। হাওরের বিস্তীর্ণ জমি ধীরে ধীরে পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে। এতে বছরের পরিশ্রম হারানোর আশঙ্কায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকরা।

শনিবার দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, গুজাউনি বাঁধের একটি বড় অংশ ভেঙে গেছে। সেই ভাঙা অংশ দিয়ে দ্রুতগতিতে পানি প্রবেশ করছে দেখার হাওরে। প্রবল স্রোতের কারণে আশপাশের জমিগুলো দ্রুত প্লাবিত হচ্ছে। কৃষকরা অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য দেখছেন, যা তাদের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক। হাওরের পাড়ে দাঁড়িয়ে অনেক কৃষক কান্নাজড়িত কণ্ঠে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার করে দেশের মানুষের কাছে সাহায্যের আবেদন জানান। তারা বলছেন, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পুরো ফসলই পানির নিচে চলে যাবে। এমন পরিস্থিতিতে তাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন তারা। এই দৃশ্য পুরো এলাকায় আবেগঘন পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বাঁধের পাশের একটি বিলের ইজারাদার মাছ আহরণ শেষে বাঁধটি যথাযথভাবে সংস্কার করেননি। ফলে বাঁধটি দুর্বল অবস্থায় পড়ে ছিল দীর্ঘদিন ধরে। অতিরিক্ত পানির চাপ সৃষ্টি হলে সেই দুর্বল অংশই ভেঙে যায়। এতে করে হাওরে আকস্মিকভাবে পানি ঢুকে পড়ে এবং ফসলের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়। স্থানীয় কৃষক স্বপন মিয়া জানান, এই হাওরে কয়েক হাজার একর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করা হয়েছে। বাঁধটি যদি দ্রুত মেরামত করা না যায়, তাহলে পুরো ফসলই পানির নিচে তলিয়ে যাবে। তিনি বলেন, আমরা সারা বছর এই ফসলের জন্য পরিশ্রম করি। এখন যদি সব শেষ হয়ে যায়, তাহলে আমাদের বাঁচার উপায় থাকবে না।

তিনি আরও বলেন, উথারিয়া বাঁধ কেটে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা গেলে ক্ষতি অনেকটাই কমানো যেত। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেই ধরনের কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। দ্রুত সিদ্ধান্ত না নিলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। কৃষকদের এই উদ্বেগ দিন দিন আরও বাড়ছে। আরেক কৃষক মিজানুর রহমান বলেন, বিলের মালিক ঠিকমতো বাঁধ সংস্কার না করায় আজ এই দুর্ভোগের সৃষ্টি হয়েছে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, আগে থেকেই যদি বাঁধটি মজবুত করা হতো, তাহলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতো না। এখন সবাই মিলে চেষ্টা করলেও পুরো ক্ষতি ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়ছে।

এদিকে খবর পেয়ে স্থানীয় প্রশাসন এবং এলাকাবাসী একযোগে বাঁধ রক্ষার কাজে নেমে পড়েন। বাঁশ, বস্তা ও অন্যান্য উপকরণ ব্যবহার করে তারা ভাঙা অংশ বন্ধ করার চেষ্টা চালান। অনেকেই নিজের উদ্যোগে শ্রম দিয়ে এই কাজে অংশ নিচ্ছেন। জীবন-জীবিকার প্রশ্নে কৃষকরা নিজেদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী খায়রুল ইসলাম ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি জানান, জরুরি ভিত্তিতে বাঁধ রক্ষার কাজ শুরু করা হয়েছে। প্রায় একশ জিও ব্যাগ এবং বাঁশ ব্যবহার করে ভাঙা অংশ বন্ধ করার চেষ্টা চলছে। এতে আপাতত পানি ঢোকা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে।

তিনি আরও জানান, এখন পানি প্রবেশ বন্ধ রয়েছে এবং পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে। তবে সম্পূর্ণভাবে ঝুঁকি কাটেনি বলে সতর্ক থাকতে হবে। সংশ্লিষ্ট সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে এই সংকট মোকাবিলায়। আশা করা হচ্ছে, দ্রুত পদক্ষেপের ফলে বড় ধরনের ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন, এই বাঁধটি তাদের সরাসরি আওতাধীন নয়। তবুও কৃষকদের ফসল রক্ষার জন্য তারা উদ্যোগ নিয়েছেন। একটি দল ইতোমধ্যে এলাকায় কাজ শুরু করেছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছে। মানবিক দিক বিবেচনায় তারা এই পদক্ষেপ নিয়েছেন।

স্থানীয়দের মতে, হাওরের বাঁধগুলো নিয়মিত সংস্কার না করায় প্রতি বছরই এমন ঝুঁকি তৈরি হয়। যথাসময়ে সংস্কার কাজ সম্পন্ন হলে এই ধরনের বিপর্যয় অনেকটাই এড়ানো সম্ভব। তারা দাবি করেন, ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের ঘটনা না ঘটে, সে জন্য স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন। না হলে প্রতি মৌসুমেই কৃষকদের এমন দুর্ভোগ পোহাতে হবে।

এই পরিস্থিতিতে কৃষকরা সরকারের কাছে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন। তারা চান, ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য আর্থিক সহায়তা এবং বাঁধের স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করা হোক। অন্যথায় তাদের জীবিকা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। হাওরের এই সংকট এখন পুরো অঞ্চলের মানুষের জন্য বড় এক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।