স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে প্রাণে বেঁচে গেলেই চিকিৎসা শেষ হয়ে যায় না। বরং এরপর শুরু হয় রোগীর সুস্থ জীবনে ফিরে আসার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়—পুনর্বাসন। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্ট্রোকের পর অধিকাংশ রোগী নানা ধরনের শারীরিক, মানসিক ও স্নায়বিক জটিলতায় ভোগেন। এসব জটিলতা কমিয়ে রোগীকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন পরিকল্পিত পুনর্বাসন এবং ফিজিক্যাল মেডিসিন ও পুনর্বাসন বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধান।
বিশ্বজুড়ে স্ট্রোক শারীরিক অক্ষমতার অন্যতম প্রধান কারণ। আধুনিক চিকিৎসার কারণে স্ট্রোকে মৃত্যুহার কমলেও, বেঁচে ফেরা রোগীদের বড় একটি অংশ দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার মুখোমুখি হন। তাই চিকিৎসার পাশাপাশি পুনর্বাসনকে সমান গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
স্ট্রোকের পর যেসব জটিলতা দেখা দিতে পারে
স্ট্রোকের কারণে শুধু শরীরের এক পাশে পক্ষাঘাতই নয়, আরও বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিতে পারে। যেমন—
- পেশি শক্ত হয়ে যাওয়া (স্প্যাস্টিসিটি)
- হাত-পা বাঁকা হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি
- কাঁধে ব্যথা ও প্রদাহ
- হাঁটা-চলা ও স্বাভাবিক নড়াচড়ায় সমস্যা
- রক্ত সঞ্চালন ব্যবস্থায় জটিলতা
- ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে গিয়ে হাড় ভাঙার ঝুঁকি
- দীর্ঘ সময় একই অবস্থানে থাকলে ত্বকে ক্ষত বা সংক্রমণ (বেডসোর)
- অচল পায়ের গভীর শিরায় রক্ত জমাট বাঁধা (ডিপ ভেইন থ্রম্বোসিস)
- সেই জমাট রক্ত ফুসফুসে পৌঁছালে পালমোনারি এম্বোলিজমের মতো প্রাণঘাতী জটিলতা
- খাবার বা লালা শ্বাসনালিতে চলে গিয়ে এসপিরেশন নিউমোনিয়া
- কফ বের করতে না পারার কারণে নিউমোনিয়া ও শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ
- মানসিক অবসাদ, খিঁচুনি ও মূত্রনালির সংক্রমণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব জটিলতা সময়মতো শনাক্ত ও চিকিৎসা করা না হলে রোগীর সুস্থ হওয়ার পথ আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
কেন পুনর্বাসন এত গুরুত্বপূর্ণ?
স্ট্রোকের পর মস্তিষ্কের ক্ষতিগ্রস্ত অংশের কার্যকারিতা পুরোপুরি ফিরিয়ে আনা সব সময় সম্ভব না হলেও নিয়মিত পুনর্বাসনের মাধ্যমে রোগীর দৈনন্দিন কাজ করার সক্ষমতা অনেকটাই বাড়ানো যায়।
পুনর্বাসনের মূল লক্ষ্য হলো—
- রোগীর চলাফেরার সক্ষমতা ফিরিয়ে আনা
- পেশির শক্তি ও নমনীয়তা বাড়ানো
- দৈনন্দিন কাজ নিজে করার দক্ষতা গড়ে তোলা
- কথা বলা ও গিলতে পারার সমস্যা কমানো
- মানসিকভাবে রোগীকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা
- দীর্ঘমেয়াদি জটিলতার ঝুঁকি কমানো
শুধু ফিজিওথেরাপিস্টই কি যথেষ্ট?
স্ট্রোক পুনর্বাসনে ফিজিওথেরাপিস্টের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যায়াম, গেইট ট্রেনিং, স্ট্রেচিং, মোবিলাইজেশন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বৈদ্যুতিক উদ্দীপনার মাধ্যমে রোগীর পেশির শক্তি ও নড়াচড়া উন্নত করতে তিনি কাজ করেন।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ফিজিওথেরাপিস্ট রোগ নির্ণয়, ওষুধ বা ইনজেকশন প্রেসক্রাইব কিংবা চিকিৎসার সামগ্রিক পরিকল্পনা করেন না। তাই স্ট্রোক-পরবর্তী পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসার জন্য একজন ফিজিক্যাল মেডিসিন ও পুনর্বাসন বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধান প্রয়োজন।
ফিজিক্যাল মেডিসিন বিশেষজ্ঞের ভূমিকা কী?
ফিজিক্যাল মেডিসিন বিশেষজ্ঞ রোগীর সামগ্রিক অবস্থা মূল্যায়ন করে ব্যক্তিকেন্দ্রিক পুনর্বাসন পরিকল্পনা তৈরি করেন।
প্রয়োজনে তিনি—
- স্নায়বিক কার্যকারিতা মূল্যায়ন করেন
- পেশির টান ও জোড়ার নড়াচড়া পরীক্ষা করেন
- গেলার সক্ষমতা যাচাই করেন
- মানসিক অবস্থার মূল্যায়ন করেন
- প্রয়োজন অনুযায়ী ইলেকট্রোমায়োগ্রাফি (EMG), সোয়ালো স্টাডি ও ডপলার আলট্রাসাউন্ডের মতো পরীক্ষা করার পরামর্শ দেন
এসব তথ্যের ভিত্তিতেই রোগীর জন্য উপযুক্ত পুনর্বাসন পরিকল্পনা নির্ধারণ করা হয়।
আদর্শ স্ট্রোক রিহ্যাব টিমে কারা থাকেন?
বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন স্ট্রোক রোগীর সফল পুনর্বাসনের জন্য বহুমুখী বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি দল প্রয়োজন। এই দলে সাধারণত থাকেন—
- ফিজিক্যাল মেডিসিন ও পুনর্বাসন বিশেষজ্ঞ
- ফিজিওথেরাপিস্ট
- অকুপেশনাল থেরাপিস্ট
- স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্ট
- নিউরোলজিস্ট বা মেডিসিন বিশেষজ্ঞ
- সাইকোলজিস্ট
- পুষ্টিবিদ
বিশেষজ্ঞের পরামর্শ
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব হেলথ সায়েন্স (বিআইএইচএস)-এর ফিজিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ডা. এইচ এন মাসুক রহমানের মতে, স্ট্রোকের পর শুধু ওষুধের ওপর নির্ভর না করে দ্রুত পুনর্বাসন শুরু করা উচিত। এতে রোগীর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সম্ভাবনা বাড়ে, পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা ও অক্ষমতার ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।





























