বেহেশতে কি পৃথিবীর স্বামী বা স্ত্রীই হবেন জীবনসঙ্গী? নাকি পরকালে মিলবে নতুন কোনো সঙ্গী? ইসলামে জান্নাতের জীবন নিয়ে এমন প্রশ্ন অনেকের মনেই আসে। ইসলামি বর্ণনা অনুযায়ী, জান্নাত হবে অনাবিল সুখ, শান্তি ও ভালোবাসার স্থান। সেখানে কোনো দুঃখ, অভিমান কিংবা অপূর্ণতা থাকবে না। তবে পরকালে নির্দিষ্টভাবে কে কার জীবনসঙ্গী হবেন, তা নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে কোরআন ও নির্ভরযোগ্য হাদিসের বক্তব্য জানা জরুরি।

ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, মহান আল্লাহ জান্নাতবাসীদের জন্য এমন নেয়ামতের ব্যবস্থা করবেন, যা তাদের আনন্দ ও তৃপ্তি দান করবে। পবিত্র কোরআনের সুরা জুখরুফের ৭০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তোমরা এবং তোমাদের জীবনসঙ্গীরা আনন্দচিত্তে জান্নাতে প্রবেশ করো।’ আয়াতটি জান্নাতবাসীদের জন্য দাম্পত্য সঙ্গ ও আনন্দের সুসংবাদ বহন করে। তবে এর বিস্তারিত ব্যাখ্যায় আলেমদের আলোচনা বিবেচনা করা প্রয়োজন।

ইসলামি ব্যাখ্যাগ্রন্থে জান্নাতে স্বামী-স্ত্রীর পুনর্মিলন নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা পাওয়া যায়। যেসব দম্পতি ঈমানের সঙ্গে জীবন অতিবাহিত করেছেন এবং জান্নাতের অধিকারী হবেন, তাঁদের একসঙ্গে থাকার বিষয়ে আশাবাদী হওয়ার অবকাশ রয়েছে। তবে পৃথিবীতে কাউকে ভালোবাসলেই পরকালে তাঁর সঙ্গে বিয়ে বা পুনর্মিলন নিশ্চিত, এমন সিদ্ধান্ত দেওয়ার জন্য নির্ভরযোগ্য দলিল প্রয়োজন। পরকালের সব বিষয় মানুষের জানা সম্ভব নয়।

জান্নাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, সেখানে মানুষের অন্তর থেকে বিদ্বেষ ও তিক্ততা দূর করে দেওয়া হবে। পবিত্র কোরআনের সুরা হিজরের ৪৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ জানিয়েছেন, তিনি জান্নাতবাসীদের অন্তর থেকে সব ধরনের বিদ্বেষ দূর করে দেবেন। ফলে পৃথিবীর জীবনে কারও সঙ্গে মনোমালিন্য বা সম্পর্কের টানাপোড়েন থাকলেও জান্নাতের পরিবেশ হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে মানুষের হৃদয় থাকবে শান্তি ও প্রশান্তিতে পরিপূর্ণ।

দাম্পত্য জীবন নিয়ে অনেকেই রসিকতা করে বলেন, পৃথিবীর জীবনসঙ্গীর সঙ্গেই যদি আবার থাকতে হয়, তাহলে জান্নাতের বিশেষত্ব কোথায়? ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, জান্নাতের জীবন পৃথিবীর জীবনের মতো হবে না। সেখানে কষ্ট, দুঃখ কিংবা অসন্তুষ্টি থাকবে না। তাই পৃথিবীর সম্পর্কের তিক্ততা দিয়ে জান্নাতের সম্পর্ককে বিচার করা ঠিক নয়। জান্নাতবাসীরা আল্লাহর অনুগ্রহে পরিপূর্ণ সুখ ও সন্তুষ্টি লাভ করবেন।

জান্নাতে নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্যই থাকবে সম্মান, আনন্দ ও পরিপূর্ণ তৃপ্তি। পবিত্র কোরআনে জান্নাতবাসীদের জন্য তাদের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী নেয়ামতের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। ফলে নারীদের প্রাপ্য সুখ বা জীবনসঙ্গী নিয়ে প্রশ্ন উঠলে মনে রাখতে হবে, জান্নাতে কারও প্রতি অবিচার করা হবে না। আল্লাহ প্রত্যেক জান্নাতবাসীকে সন্তুষ্ট করবেন। তবে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে কে কেমন সঙ্গী পাবেন, সে বিষয়ে নিশ্চিত দাবি করার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা জরুরি।

জান্নাতের সৌন্দর্য ও নেয়ামত সম্পর্কে বিভিন্ন হাদিসে বর্ণনা রয়েছে। ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, সেখানে মানুষের আনন্দ ও ভালোবাসা পৃথিবীর সীমাবদ্ধতার মধ্যে আটকে থাকবে না। জান্নাতের জীবন হবে চিরস্থায়ী, যেখানে বার্ধক্য, বিচ্ছেদ কিংবা মৃত্যুর ভয় থাকবে না। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং জান্নাত লাভের চেষ্টা করাই একজন মুমিনের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।

সব মিলিয়ে, বেহেশতে জীবনসঙ্গী কে হবেন, তার প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয়ে নিশ্চিত বক্তব্য দেওয়ার চেয়ে কোরআন ও নির্ভরযোগ্য হাদিসের প্রতিশ্রুতির ওপর বিশ্বাস রাখা গুরুত্বপূর্ণ। জান্নাত হবে এমন এক আবাস, যেখানে আল্লাহর অনুগ্রহে কোনো মুমিন বঞ্চিত বা অসন্তুষ্ট থাকবেন না। তাই পরকালে সুখী জীবনের প্রত্যাশার পাশাপাশি দুনিয়ার জীবনে ঈমান, সৎকর্ম ও উত্তম আচরণ বজায় রাখাই একজন মুসলমানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।