প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় পুষ্টিকর খাবার রাখতে চাইলে কাঠবাদাম হতে পারে ভালো একটি বিকল্প। এতে রয়েছে প্রোটিন, স্বাস্থ্যকর চর্বি, আঁশ, ভিটামিন ও বিভিন্ন খনিজ উপাদান। তাই স্বাস্থ্যকর স্ন্যাকস হিসেবে অনেকেই কাঠবাদাম বেছে নেন। তবে কাঠবাদাম খাওয়ার নিয়ম জানা থাকলে এর পুষ্টিগুণ আরও ভালোভাবে কাজে লাগানো সম্ভব।
পুষ্টিবিদদের মতে, প্রতিদিন এক মুঠ কাঠবাদাম খাওয়া যেতে পারে। সাধারণভাবে এক মুঠে প্রায় ৭ থেকে ৮টি কাঠবাদাম থাকে। তবে বয়স, শারীরিক অবস্থা, দৈনিক খাদ্যাভ্যাস ও ক্যালরির চাহিদা অনুযায়ী এই পরিমাণে কিছুটা পরিবর্তন হতে পারে। অতিরিক্ত কাঠবাদাম খেলে শরীরে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ক্যালরি ও চর্বি প্রবেশ করতে পারে। তাই পরিমিত পরিমাণে খাওয়াই ভালো।
কাঠবাদাম কাঁচা অবস্থায় খাওয়া যায়। আবার পানিতে বা দুধে ভিজিয়েও খেতে পারেন। অনেকে ভিজিয়ে খেলে হজমে সুবিধা হয় বলে মনে করেন। তবে কাঠবাদাম ভিজিয়ে খাওয়াই সবার জন্য বাধ্যতামূলক নয়। ব্যক্তিগত পছন্দ ও হজমের সুবিধা অনুযায়ী পদ্ধতি বেছে নেওয়া যেতে পারে।
তবে খালি পেটে কাঠবাদাম খেলেই যে সবার শরীরে বেশি পুষ্টি শোষিত হবে, এমনটি নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। বরং দিনের মোট খাদ্যাভ্যাস ও পুষ্টির ভারসাম্য বজায় রাখাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই কাঠবাদামকে একটি স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকার অংশ হিসেবে রাখাই ভালো।
শরীরচর্চার আগে হালকা ক্ষুধা লাগলে কয়েকটি কাঠবাদাম খাওয়া যেতে পারে। এতে থাকা স্বাস্থ্যকর চর্বি, প্রোটিন ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান শরীরকে কিছুটা শক্তি জোগাতে পারে। তবে দীর্ঘ সময়ের বা বেশি মাত্রার ব্যায়ামের আগে শুধু কাঠবাদামের ওপর নির্ভর করা ঠিক নয়। তখন শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী কার্বোহাইড্রেটসহ অন্যান্য খাবারও দরকার হতে পারে।
ব্যায়ামের পর কাঠবাদামের সঙ্গে দই বা গ্রিক ইয়োগার্টের মতো প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার রাখা যেতে পারে। এতে খাবারে প্রোটিন ও স্বাস্থ্যকর চর্বির সমন্বয় তৈরি হয়। যারা নিয়মিত শরীরচর্চা করেন, তাদের দৈনিক খাদ্যতালিকায় এ ধরনের ভারসাম্যপূর্ণ খাবার রাখা উপকারী।
কাঠবাদাম একা খাওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন খাবারের সঙ্গেও যুক্ত করা যায়। আপেল, কলা বা অন্যান্য ফলের সঙ্গে কয়েকটি কাঠবাদাম খেলে তৈরি হতে পারে পুষ্টিকর একটি নাশতা। ফল থেকে পাওয়া প্রাকৃতিক শর্করার সঙ্গে কাঠবাদামের প্রোটিন, আঁশ ও স্বাস্থ্যকর চর্বি খাবারটিকে আরও ভারসাম্যপূর্ণ করে।
টক দই বা দুধের সঙ্গেও কাঠবাদাম খাওয়া যায়। এতে খাবারে প্রোটিন ও ক্যালসিয়ামের পরিমাণ বাড়ে। আবার ওটমিল, চিড়া বা সুজির সঙ্গে কুচি করা কাঠবাদাম মিশিয়ে খেলে খাবারের স্বাদ ও পুষ্টি দুটোই বাড়তে পারে। চাইলে সামান্য দারুচিনি যোগ করেও খেতে পারেন।
কাঠবাদামে রয়েছে ভিটামিন ই, ম্যাগনেশিয়াম, ক্যালসিয়াম, আয়রন, প্রোটিন ও আঁশ। পাশাপাশি এতে থাকা অসম্পৃক্ত চর্বি শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যকর ফ্যাটের উৎস হিসেবে কাজ করে। কাঠবাদামের খোসাতেও বিভিন্ন অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে, যা শরীরকে অক্সিডেটিভ স্ট্রেসের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ কাঠবাদাম থেকে পাওয়া পুষ্টি ব্যক্তির সামগ্রিক খাদ্যতালিকার একটি অংশ পূরণ করতে পারে। তবে শুধু কাঠবাদাম খেলেই সব ধরনের পুষ্টির চাহিদা পূরণ হবে না। এর পাশাপাশি শাকসবজি, ফল, শস্য, ডাল, মাছ বা অন্যান্য প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবারও খাদ্যতালিকায় রাখা জরুরি।
ওজন কমানোর চেষ্টা করছেন এমন ব্যক্তিরা উচ্চ ক্যালরিযুক্ত অস্বাস্থ্যকর স্ন্যাকসের পরিবর্তে পরিমিত কাঠবাদাম খেতে পারেন। এতে থাকা আঁশ, প্রোটিন ও স্বাস্থ্যকর চর্বি কিছু সময় পর্যন্ত পেট ভরা রাখতে সহায়তা করতে পারে। ফলে ঘন ঘন খাবার খাওয়ার প্রবণতা কমতে পারে।
তবে কাঠবাদামকে ওজন কমানোর কোনো বিশেষ খাবার হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ এতে ক্যালরির পরিমাণও কম নয়। তাই একসঙ্গে অনেক কাঠবাদাম খেলে উল্টো অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণ হতে পারে। ওজন নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে পরিমাণের দিকে নজর দেওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
রাতেও কাঠবাদাম খাওয়া যেতে পারে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর ক্ষুধা লাগলে মিষ্টি বা ভাজাপোড়া খাবারের পরিবর্তে কয়েকটি কাঠবাদাম তুলনামূলক স্বাস্থ্যকর বিকল্প হতে পারে। এতে থাকা ম্যাগনেশিয়ামসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ভূমিকা রাখে।
তবে কাঠবাদাম খেলেই ঘুমের সমস্যা দূর হবে এমন দাবি করার সুযোগ নেই। ঘুম ভালো রাখতে নিয়মিত ঘুমের সময়সূচি, পর্যাপ্ত শারীরিক কার্যক্রম এবং রাতে অতিরিক্ত ক্যাফেইন ও ভারী খাবার এড়িয়ে চলাও গুরুত্বপূর্ণ।
কাঠবাদাম সাধারণভাবে পুষ্টিকর খাবার হলেও সবার জন্য একইভাবে উপযোগী নাও হতে পারে। যাদের বাদামে অ্যালার্জি রয়েছে, তাদের অবশ্যই কাঠবাদাম এড়িয়ে চলতে হবে। অ্যালার্জির ক্ষেত্রে গুরুতর প্রতিক্রিয়াও দেখা দিতে পারে।
এ ছাড়া যাদের নির্দিষ্ট স্বাস্থ্য সমস্যা রয়েছে বা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাবারে কোনো সীমাবদ্ধতা মেনে চলতে হয়, তারা নিয়মিত কাঠবাদাম খাওয়ার আগে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিতে পারেন। বিশেষ করে কিডনিতে পাথর বা অন্য কোনো কিডনি-সংক্রান্ত সমস্যা থাকলে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য পরিস্থিতি অনুযায়ী খাদ্য নির্বাচন করা জরুরি।
সব মিলিয়ে, কাঠবাদাম খাওয়ার নিয়ম খুব জটিল নয়। প্রতিদিন পরিমিত পরিমাণে কাঠবাদাম খাওয়া, অতিরিক্ত না খাওয়া এবং ফল, দই, দুধ বা ওটমিলের মতো পুষ্টিকর খাবারের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া যেতে পারে। তবে কোনো একটি খাবারের ওপর নির্ভর না করে বৈচিত্র্যপূর্ণ ও সুষম খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখাই সুস্থ থাকার সবচেয়ে ভালো উপায়।


মন্তব্য
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
একটি মন্তব্য লিখুন